সৌদি আরবে ছয় মাসে ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

সৌদি আরবে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫৯ জনই বিদেশি নাগরিক, যা মোট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ৫৪ শতাংশ। এ তালিকায় বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন।

ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের (ইএসওএইচআর) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে মাদকসংক্রান্ত অপরাধের দায়ে ৭১ জনের, হত্যার দায়ে ২৫ জনের, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় ৯ জনের এবং অন্যান্য অপরাধে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবে বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসনামলে কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা ২ হাজারে পৌঁছেছে। সংস্থাটির দাবি, আগের শাসনামলগুলোর তুলনায় এটি রেকর্ড।

বেশি মৃত্যুদণ্ড মাদকসংক্রান্ত অপরাধে

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ৬৬ শতাংশই মাদকসংক্রান্ত অপরাধের কারণে। এ ধরনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ৭১ জনের মধ্যে ৪৯ জন বিদেশি নাগরিক। তাদের মধ্যে ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান ও ইয়েমেনের নাগরিক উল্লেখযোগ্য। সংস্থাটির মতে, মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নীতির প্রভাব অভিবাসী শ্রমিক ও অন্যান্য অভিবাসীদের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মাদকসংক্রান্ত মৃত্যুদণ্ডের অন্তত ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল গাঁজাসংক্রান্ত মামলায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের মামলায় আবারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর শুরু করেছে সৌদি আরব। ইএসওএইচআরের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে কার্যকর হওয়া ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৮৩টি বা ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ এমন অপরাধের জন্য, যেখানে ইচ্ছাকৃত হত্যার ঘটনা ছিল না। সংস্থাটি বলেছে, আন্তর্জাতিক আইনে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ ধারণার যে সীমিত ব্যাখ্যা রয়েছে, তার সঙ্গে এ চর্চা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এ ছাড়া কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের ৮৪টি বা ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল তাজিরভিত্তিক শাস্তি। ইসলামী আইনের এ ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য শাস্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিচারিক কর্তৃপক্ষের বিবেচনাধিকার থাকে।

রাজনৈতি-সংক্রান্ত মামলায় মৃত্যুদণ্ড

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরের প্রথমার্ধে সৌদি আরবের বিশেষায়িত ফৌজদারি আদালতে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এ ধরনের মামলা মোট মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ৮ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি সৌদ আল-ফারাজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর। ২০২৬ সালের জুনে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর আগে জাতিসংঘের নির্বিচার আটকবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ তার আটককে নির্বিচার বলে অভিহিত করেছিল।

এ ছাড়া ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল আলী আল-সুবাইতি নামের এক কিশোরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি কর্তৃপক্ষ। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মধ্যে ১২ বছর বয়সে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শৈশবে করা অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি

ইএসওএইচআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শৈশবে সংঘটিত বলে অভিযোগ করা অপরাধের জন্য অন্তত পাঁচজন এখনও মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তারা হলেন ইউসুফ আল-মানাসিফ, জাওয়াদ কুরেইরিস, হাসান জাকি আল-ফারাজ, মাহদি আল-মোহসেন ও আলী আল-মাবিউক। জাতিসংঘের নির্বিচার আটকবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ তাদের কয়েকজনের আটককে নির্বিচার বলে উল্লেখ করে মুক্তির আহ্বান জানিয়েছিল। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের জীবন রক্ষায় বা জাতিসংঘের সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনও পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ করেছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবে মতপ্রকাশের কারণে অভিযোগের মুখে থাকা ৪৯ জন বন্দি ও বিবেকের কারণে বন্দি ব্যক্তিও মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন শেখ সালমান আল-আওদা ও শেখ হাসান আল-মালিকি। ২০১৮ সাল থেকে তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করে আসছে সরকারি কৌঁসুলির দফতর। তবে তাদের বিচারপ্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি।

মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় বিদেশি বন্দিরা

ইএসওএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। এর মধ্যে খামিস মুশাইত কারাগারের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের ওয়ার্ডে রয়েছেন ইথিওপিয়ার ৫৮ জন নাগরিক। এ ছাড়া নাজরান কারাগারে ইথিওপিয়ার আরও পাঁচজন এবং সোমালিয়ার পাঁচজন নাগরিক রয়েছেন। তাবুক কারাগারে রয়েছেন মিসরের আটজন নাগরিক।

এসব মামলায় একাধিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে রয়েছে পেশাদার দোভাষীর ব্যবস্থা না থাকা, আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত করা, বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ না দেওয়া।

সংস্থাটির সঙ্গে কথা বলা বন্দিরা জানিয়েছেন, তাদের সব সময় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কার মধ্যে থাকতে হয়। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তারা কয়েকজন বন্দিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নিয়ে যেতে দেখেছেন। এর আগে ওই বন্দিদের অল্প সময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল এবং বাইরের জগতের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বন্ধ ছিল।

আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ

প্রতিবেদনের উপসংহারে ইএসওএইচআর বলেছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যান সৌদি আরবে দ্রুতগতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ধারাবাহিকতা তুলে ধরেছে। সংস্থাটির অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও প্রকাশ্যে ঘোষিত আইনি অঙ্গীকার সত্ত্বেও দেশটি এ চর্চা অব্যাহত রেখেছে। নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন এবং শিশু অধিকার সনদের অধীনে সৌদি আরবের দায়িত্বের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংস্থাটির মতে, অন্যায্য বিচার, নির্যাতন, বৈষম্য ও তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ ও সমালোচনা বাড়লেও সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রাখার পথে রয়েছে।

সূত্র: ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস