সৌদি আরব ও হুথিদের সংঘাত বাড়তে থাকার মধ্যে ১১ অক্টোবর ইয়েমেনি গোষ্ঠীটির দীর্ঘদিনের মিত্র ইরান দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছিল। ১১ দিন পরও কোনও পক্ষই ইরানের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি।
নিকট ভবিষ্যতে হুথি বা সৌদি আরব, কোনও পক্ষই আলোচনার টেবিলে ফিরতে প্রস্তুত, এমন ইঙ্গিত খুব কম। হুথিদের মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সোমবার আবারও বলেছেন, রিয়াদ ইয়েমেনি জনগণের ওপর আর্থিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ শেষ না করা পর্যন্ত সৌদি আরবে হামলা চলবে। গোষ্ঠীটির দাবি, প্রায় ১২ বছর ধরে ইয়েমেনের প্রবেশপথগুলোতে এ অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। সারি আরও বলেন, সৌদি আরব তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ না করা পর্যন্ত হামলা চলবে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, রিয়াদ সম্ভবত এসব দাবি মানতে নারাজ। ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ বাশা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ইয়েমেনের আকাশসীমা ও সমুদ্রপথের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণের হুথি দাবির কাছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার নতি স্বীকার করবে বলে আমি মনে করি না। তিনি আরও বলেন, এমন ছাড় কার্যত হুথিদের সামরিক, রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে পুরস্কৃত করবে, অথচ স্থায়ী শান্তির কোনও অর্থবহ নিশ্চয়তা মিলবে না।
এর মধ্যে হুথিরা হামলা বাড়াতে পারে, আর সৌদি আরব নিজের ভূখণ্ড রক্ষায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বকে কাজে লাগাবে। তাইজ ও মারিবসহ বেশ কয়েকটি রণাঙ্গনে হুথি ও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর লড়াই তীব্র হয়েছে। এতে স্থায়ী মীমাংসার সম্ভাবনা আরও জটিল হচ্ছে। সৌদি আরব ও হুথিরা আলোচনা শুরুর মতো যথেষ্ট অভিন্ন ভিত্তি খুঁজে পেলেও, যা অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে, সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি।
অ্যালেক্স জালিলি এমইইকে বলেন, বিমানবন্দর ও বন্দরের ওপর বিধিনিষেধ এবং অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণের বাইরেও হুথিদের দাবির মধ্যে আছে তেল ও গ্যাস রাজস্বে অংশীদারত্ব এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে রাজনৈতিক স্বীকৃতি। তিনি আরও বলেন, তাই আমি হামলার সাময়িক বিরতি, যা আলোচনা থেকে অবশ্যই আসতে পারে এবং আরও স্থায়ী মীমাংসার মধ্যে পার্থক্য করব।
উভয়ের ভিন্ন স্বার্থ
মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির এক বিবৃতি অনুযায়ী, তেহরানের মধ্যস্থতার প্রস্তাবে হুথি ও সৌদি আরব, কেউই এখনও সাড়া দেয়নি। রিয়াদের জন্য ইরানের মধ্যস্থতা গ্রহণের সিদ্ধান্তের প্রভাব হুথিদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সংঘাতের বাইরেও পড়বে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের মধ্যে হুথি ও তেহরানের সঙ্গে যুক্ত অন্য গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা প্রদর্শন রিয়াদের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। ২৯ জুলাই সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে ইরানের সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে যৌথ বিমান হামলা চালানোর সময় তা বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়েছিল।
একই সঙ্গে চলমান সংঘাত আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য নতুন করে সাজানোর সময় তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে মক্কা চুক্তি সই করার মাধ্যমেও উদীয়মান নিরাপত্তা কাঠামোয় নিজের অবস্থান দেখাতে চাইছে রিয়াদ। রিয়াদ যে হুথিদের ইরানের প্রক্সি বলে বর্ণনা করে, তাদের সঙ্গে সংঘাতে তেহরানের মধ্যস্থতা মেনে নিলে সম্ভবত এ দুটি লক্ষ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এর বাইরেও অন্য আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা হুথি-সৌদি আলোচনা সামলাতে পারে। জালিলি এমইইকে বলেন, ওমানসহ বিভিন্ন মাধ্যমে হুথিদের সঙ্গে রিয়াদের যোগাযোগের পথ আগে থেকেই আছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তেহরানকে মেনে নিলে এ ধারণাও জোরদার হতে পারে যে হুথিদের আচরণের চূড়ান্ত নিশ্চয়তাদাতা ইরান। এটিকে বৈধতা দেওয়ায় রিয়াদের আগ্রহ সামান্যই।
তবে ইরানের মধ্যস্থতা নিয়ে রিয়াদের অনীহাকে বৃহত্তর অর্থে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগে অনিচ্ছা হিসেবে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের জনকূটনীতিবিষয়ক উপমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন, রিয়াদ তেহরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখছে।
সৌদি আরবে আরও হামলা পরবর্তী আলোচনায় হুথিদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াবে বলেও তারা মনে করছে। জালিলি আরও বলেন, হুথিরা দেখিয়েছে, তারা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে হুমকি দিতে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত করতে এবং সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষার দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে পারে। এতে তাদের যে যথেষ্ট দর-কষাকষির ক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তা সামান্য ছাড়ের বিনিময়ে তারা ছেড়ে দেবে না। ফলে আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করার মতো যথেষ্ট সামরিক সাফল্য পেয়েছে বলে মনে না করা পর্যন্ত হুথিরা ইরানের মধ্যস্থতা মেনে নেবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের উদ্দেশ্য কী?
সৌদি আরব ও হুথিদের সংঘাতে মধ্যস্থতা করতে পারলে ইরান সম্ভবত যুদ্ধবিরতির শর্ত নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারবে এবং নতুন করে সংঘাতের পথও খোলা রাখতে পারবে। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র নন-রেসিডেন্ট ফেলো সিনা তুসি বলেন, ইয়েমেনের বন্দর, বিমানবন্দর, বেতন ও পুনর্গঠনসংক্রান্ত ব্যবস্থা এবং বিশ্বাসযোগ্য সৌদি নিরাপত্তা নিশ্চয়তাসহ ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির ওপর দাঁড়ানো একটি সামগ্রিক চুক্তি সম্ভবত ইরান পছন্দ করবে।
তবে সামগ্রিক চুক্তি যে স্থায়ী মীমাংসা আনবেই, এমন নয়। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের মধ্যে হুথিদের হামলা পুনরায় শুরুর সক্ষমতা বজায় রাখা একটি ভঙ্গুর সন্ধি শেষ পর্যন্ত তেহরানের কৌশলগত স্বার্থ আরও ভালোভাবে রক্ষা করতে পারে।
নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত রিয়াদের ওপর চাপ দেওয়ার আরেকটি উপায়ও তেহরানকে দিয়েছে। ২০ জুলাই সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি বিমান হামলা এবং ইয়েমেনের বিমানবন্দর ও বন্দরে বৃহত্তর অবরোধ বলে তাদের বর্ণনার জবাবে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করে হুথিরা।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের প্রতি ইরানের হুমকির সঙ্গে বাব আল-মান্দেবে হুথিদের হুমকি যুক্ত হওয়ায় আঞ্চলিক জ্বালানি রফতানির ওপর চাপ প্রয়োগের বাড়তি উপায় এখন তেহরানের হাতে।
রিয়াদ ও অন্য আঞ্চলিক রাজধানীগুলোর মতো যুদ্ধ-পরবর্তী ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক শৃঙ্খলা সাজাতে চেষ্টা করছে তেহরানও। ইয়েমেনে হুথিদের শক্ত অবস্থান যুদ্ধ আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার সময় তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাব টিকিয়ে রাখতেও সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পথ যেন বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত উসকে না দেয়, তাও নিশ্চিত করতে হবে ইরানকে।
এমন উত্তেজনা সম্ভবত সৌদি আরবের সঙ্গে তেহরানের আগে থেকেই টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ককে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বাস্তবে ২০২৩ সালের সম্পর্ক পুনঃস্থাপন চুক্তির অধীনে প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করে হুথিদের উত্তেজনা বাড়াতে তেহরান উৎসাহ জুগিয়েছে বলে ইতিমধ্যেই অভিযোগ করেছে রিয়াদ।
বর্তমান ইঙ্গিত অনুযায়ী সম্ভাবনা কম হলেও অনিয়ন্ত্রিত উত্তেজনার মধ্যে মক্কা চুক্তির স্বাক্ষরকারী তুরস্ক বা পাকিস্তানের হুথিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান, কিংবা সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষামূলক সহায়তার বাইরে গিয়ে যুক্তরাজ্যের সংঘাতে প্রবেশ থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে হুথিদের সঙ্গে কয়েক বছর ধরে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা ইরাকে ইরান-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোও সংঘাতে জড়াতে পারে। সংঘাতের এমন আঞ্চলিকীকরণ ঠেকাতে ব্যর্থ হলে কিছু উপসাগরীয় রাষ্ট্র তেহরানের বিরুদ্ধে আরও আগ্রাসী অবস্থান নিতে পারে, যা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
সূত্র: মিডেল ইস্ট আই