ইসরায়েলের ভাগ্যনির্ধারণী নির্বাচন: নেতানিয়াহুর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী কারা

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে প্রথমবার জাতীয় নির্বাচনে যাচ্ছে ইসরায়েল। গাজা ও লেবাননে যুদ্ধ এবং ইরানে বিমান হামলার উত্তাপের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আগামী মঙ্গলবারের এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আসন হারানোর জোর সম্ভাবনা দেখা দিলেও তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের ক্ষমতা দখলের পথও সহজ নয়। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার এই নির্বাচনে দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটের আসন বন্টন হবে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে।

ইসরায়েলের রাজনীতি ও সমাজকে গভীরভাবে বিভক্ত করা এই নির্বাচনের মূল প্রার্থী ও রাজনৈতিক জোটগুলোর সংক্ষিপ্ত চিত্র:

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

১৯৯০-এর দশকে প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পর ২০০৯ সাল থেকে টানা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রয়েছেন ৭৭ বছর বয়সী নেতানিয়াহু। সমর্থকদের কাছে তিনি ‘কিং বিবি’, যিনি ইসরায়েলকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন। তবে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানা ও দেশে চলমান দুর্নীতি মামলার কারণে বর্তমানে তিনি নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছেন। ৭ অক্টোবরের গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও ধর্মীয় নীতিমালার কারণে তার জনপ্রিয়তা অনেকটাই কমেছে। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক কৌশলবিদ নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, জয়ী হলে তিনি জাতীয় সরকার গঠন করবেন, আর অচলাবস্থা তৈরি হলে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থেকে যেতে পারেন।

নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী

  • গাদি আইজেনকোট (৬৬): গাজায় ছেলেকে হারানো এই সাবেক সেনাপ্রধানের ক্লিন ইমেজ ও ত্যাগ নেতানিয়াহুর দীর্ঘকালীন শাসন ও দুর্নীতি মামলার বিপরীতে এক বড় শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি মধ্যপন্থি নতুন দল ইয়াশার (যার অর্থ সততা)-এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
  • নফতালি বেনেট (৫৪) ও ইয়ার লাপিদ: সাবেক ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী ও প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা নফতালি বেনেট হাত মিলিয়েছেন মধ্যপন্থি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদের সঙ্গে। তাদের নতুন দলের নাম ‘টুগেদার’। বিপরীত রাজনৈতিক মেরুর এই দুই নেতা এর আগেও ২০২১ সালের নির্বাচনে জোট বেঁধে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন।
  • অ্যাভিগডোর লিবারম্যান (৬৮): নেতানিয়াহুর সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও ২০১৮ সালে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুকে ‘নরম’ আখ্যা দিয়ে তিনি পদত্যাগ করেন। তার দল ইসরায়েল আওয়ার হোম মূলত সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আসা অভিবাসীদের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল।
  • ইয়াইর গোলান (৬৪): ৭ অক্টোবরের হামলায় উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে আলোচিত হওয়া এই সাবেক জেনারেল বর্তমানে দ্য ডেমোক্র্যাটস দলের নেতৃত্বে আছেন, যা ঐতিহাসিক লেবার পার্টি ও বামপন্থি দল নিয়ে গঠিত।

নেতানিয়াহুর কট্টর-ডানপন্থি মিত্র

  • বেজালেল স্মোটরিচ (৪৬): অর্থমন্ত্রী স্মোটরিচ পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি দ্রুত সম্প্রসারণের মূল কারিগর, যার মূল উদ্দেশ্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে বিলুপ্ত করা।
  • ইতামার বেন-গভির (৫০): ২০০৭ সালে আরববিরোধী বর্ণবাদী উসকানির দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত এই জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান, তাদের কারাদণ্ড কঠোর করা এবং ইসরায়েলিদের জন্য অস্ত্র আইন সহজ করার পক্ষে কাজ করছেন। এই দুজনই গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়ন ও সেখানে আবারও নতুন করে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের পক্ষপাতী।

 

কট্টর অর্থোডক্স জোট

ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম এবং শাস—এই দুই কট্টর অর্থোডক্স দলের ওপর দীর্ঘদিন নির্ভর করে আছেন নেতানিয়াহু। সামরিক সেবা থেকে তাদের সম্প্রদায়ের অব্যাহতি এবং রাষ্ট্রীয় ভাতার ওপর নির্ভরশীলতা চলমান যুদ্ধের সময়ে সাধারণ ইসরায়েলিদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে।

 

যারা ক্ষমতার নির্ণায়ক হতে পারেন

কোনও স্পষ্ট জোটে না থাকা দলগুলো নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে ‘কিংমেকার’-এর ভূমিকা পালন করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের ২০ শতাংশ আরব জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্বকারী দুটি দল ‘রাম’ ও ‘জয়েন্ট লিস্ট’। এছাড়া নতুন ডানপন্থি দল পিপল অব ইসরায়েল এবং মধ্য-ডানপন্থি দল দ্য রিজার্ভিস্টস-এর অবস্থানও জরিপে অমীমাংসিত রয়েছে, যা যে কোনও দিকে মোড় ঘোরাতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স