হেপাটাইটিস সি আক্রান্তের সংখ্যায় বিশ্বে শীর্ষ দশে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে হেপাটাইটিস প্রতিরোধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবায় মানুষের প্রবেশাধিকার বাড়াতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটি বলেছে, এখনও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে লাখো মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে সোমবার দেওয়া এক বার্তায় ডব্লিউএইচও জানায়, বিশ্বে হেপাটাইটিস সি-তে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষ ১০ দেশের একটি বাংলাদেশ।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি ভাইরাল হেপাটাইটিস বিশ্বে সংক্রামক রোগে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতি বছর এ রোগে আনুমানিক ১৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, যার বেশিরভাগই লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের কারণে।

ডব্লিউএইচও জানায়, ভাইরাল হেপাটাইটিসে মৃত্যুর প্রায় ৯৫ শতাংশের জন্য দায়ী হেপাটাইটিস বি ও সি। নীরবে ছড়িয়ে পড়া এই দুই ধরনের সংক্রমণে বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার মানুষ নতুন করে আক্রান্ত হন এবং প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।

সংস্থাটির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে আনুমানিক ৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত। ২০২৪ সালে এই অঞ্চলে হেপাটাইটিস বি ও সি-র আনুমানিক ২ লাখ ৬৬ হাজার নতুন সংক্রমণ এবং ২ লাখ হেপাটাইটিস-সম্পর্কিত মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

ডব্লিউএইচওর মতে, বাংলাদেশের সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সক্রিয় হেপাটাইটিস সি সংক্রমণের হার আনুমানিক ০ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ ঝুঁকিপূর্ণ ও সেবাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ রোগের বোঝা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

এছাড়া হেপাটাইটিস বি এর উচ্চ সংক্রমণের বোঝাও বহন করছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিস বি-জনিত মোট মৃত্যুর ৬৯ শতাংশের জন্য দায়ী ১০টি দেশের একটি ছিল বাংলাদেশ।

ডব্লিউএইচওর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশিদ মোহাম্মদ বলেন, হেপাটাইটিস প্রতিরোধযোগ্য, চিকিৎসাযোগ্য এবং হেপাটাইটিস সি-র ক্ষেত্রে নিরাময়যোগ্য। তবু অনেক মানুষ খুব দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া বা সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবা না পাওয়ার কারণে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

তিনি বলেন, বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসে ডব্লিউএইচও জীবনরক্ষাকারী হেপাটাইটিস প্রতিরোধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবায় মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।

ডব্লিউএইচও জানায়, জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা (২০২০-২০৩০) প্রণয়ন, জন্মের পরপরই হেপাটাইটিস বি টিকা কার্যক্রম জোরদার, পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণ এবং নীতিনির্ধারণে প্রমাণভিত্তিক তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলে বাংলাদেশের অঙ্গীকার দৃশ্যমান হয়েছে।

তবে ডব্লিউএইচও বলছে, জনসচেতনতার অভাব, দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া, সাশ্রয়ী মূল্যে পরীক্ষা ও চিকিৎসার সীমিত সুযোগ, সামাজিক কলঙ্ক ও বৈষম্য এবং বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ও সেবাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য অসম স্বাস্থ্যসেবা- এসব কারণে এখনও বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে।

চার অগ্রাধিকার ক্ষেত্র

এই বাধা দূর করতে চারটি অগ্রাধিকার খাতে সমন্বিত ও ধারাবাহিক পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছে ডব্লিউএইচও।

  • সময়মতো জন্ম-পরবর্তী হেপাটাইটিস বি টিকাসহ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন ও ইনজেকশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
  • প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃস্বাস্থ্য, রক্তসেবা, এইচআইভি ও যক্ষ্মা কর্মসূচির সঙ্গে হেপাটাইটিস পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবা যুক্ত করে সবার জন্য সহজলভ্য করা।
  • বিশেষায়িত হাসপাতালের বাইরে সহজতর হেপাটাইটিস সি চিকিৎসা সম্প্রসারণ এবং সাশ্রয়ী মূল্যে পরীক্ষা ও ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।
  • হেপাটাইটিস পরীক্ষা, নিশ্চিত সংক্রমণ, চিকিৎসার ফলাফল, লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসার সম্পর্কিত তথ্য নিয়মিত সংরক্ষণ ও নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।

ডা. আহমেদ জামশিদ মোহাম্মদ বলেন, ভাইরাল হেপাটাইটিস মোকাবিলায় বাংলাদেশ দৃঢ় অঙ্গীকার দেখিয়েছে এবং নির্মূলের লক্ষ্যে অগ্রগতি আরও ত্বরান্বিত করার উপযুক্ত অবস্থানে রয়েছে।

তিনি বলেন, ডব্লিউএইচও সরকারের প্রচেষ্টায় কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে এবং প্রতিরোধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবার বিস্তার, স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং কাউকে পেছনে ফেলে না রাখার লক্ষ্যে এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

ডব্লিউএইচওর মতে, বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্যের হুমকি হিসেবে নির্মূল করার সুযোগ আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি। প্রতিরোধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবার বিস্তারের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রাণহানি কমাতে, লিভারের রোগের বোঝা হ্রাস করতে এবং ২০৩০ সালের নির্মূল লক্ষ্যের দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে।

সূত্র: ইউএনবি