রাশিয়ার বিজয় দিবসে আনুষ্ঠানিক ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করবেন পুতিন?

আবারও হোঁচট খেয়েছে রাশিয়া। ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলে রাশিয়ার দ্বিতীয় ধাপের আক্রমণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৃহত্তম ট্যাংক যুদ্ধ হতে ব্যর্থ হয়েছে। কিয়েভ দখলের মতোই রুশ সেনারা রণক্ষেত্রে অদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে, এখন পর্যন্ত কোথাও বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি শুক্রবার বলেছিলেন, দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ও গ্রামগুলো হলো সেই জায়গা যেখানে এই যুদ্ধের গতিপথ এবং আমাদের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, ৯মে বিজয় দিবস– ১৯৪৫ সালে রাশিয়ার কাছে নাৎসি জার্মানির আত্মসমর্পণের দিন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য পরের নির্ধারক মাইলস্টোন হতে পারে। তারা বলছেন, ওই তারিখে একপ্রকার জয় এবং যুদ্ধবিরতি ঘোষণার উপায় খুঁজবে রাশিয়া, অথবা ৯ মে রাশিয়ার ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’কে ‘যুদ্ধে’ রূপান্তরের ট্রিগার হিসেবে কাজ করবে। এরপর রাশিয়া ইউক্রেনকে হারাতে জাতীয় পর্যায়ে সেনা সমাবেশের উদ্যোগ নিতে পারে এবং মস্কোর পক্ষ থেকে হুমকি বাড়বে।

রণক্ষেত্রে যদিও এখন পুতিনের সেনারা অতিপ্রসারিত, ক্লান্ত এবং উজ্জীবিত হওয়ার কোনও বাস্তব ইঙ্গিত দিতে পারছে না। মার্কিন সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা বলছেন, উত্তরাঞ্চলে বড় আক্রমণগুলো ইতোমধ্যে অচলাবস্থায় পৌঁছে গেছে: কোনও পক্ষই পুরোপুরি জয়ী হতে পারেনি।

ইউক্রেনে রাশিয়ার দ্বিতীয় ধাপের আক্রমণের দ্বিতীয় সপ্তাহে রুশ সেনারা নিজেদের ডনবাস ঘিরে উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে অবস্থানে পাচ্ছে। এখনও লড়াই করছে মারিউপোলে এবং একই সঙ্গে ২৫০ মাইলের বেশি বিস্তৃত দক্ষিণাঞ্চলীয় ফ্রন্টেও মোতায়েন আছে। ৯ মে বিজয় ঘোষণার জন্য পুতিন হয়ত আগামী দুই সপ্তাহে ডনবাসে কিছুটা অগ্রগতি অর্জন করতে পারবেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি তাদের জন্য দুর্দশাপূর্ণ। এতে করে যুদ্ধ ঘোষণা এবং জাতীয় পর্যায়ে সেনা সমাবেশের পথ থাকবে রুশ প্রেসিডেন্টের সামনে। দ্বিতীয়টি বিকল্পটি ৯ মে রাশিয়ার জাতীয় দিবসের গুরুত্বের সঙ্গে খাপ খায়।

প্রায় অচলাবস্থার দিকে গড়ানো যুদ্ধে প্রাণহানির চিত্র ভয়াবহ। মাত্র দুই মাসে যত সংখ্যক রুশ সেনা নিহত হয়েছে তা ১৯৮০ দশকে আফগানিস্তানে দীর্ঘ যুদ্ধের চেয়ে বেশি। মস্কো যতই অভ্যন্তরীণ বিতর্ক ও খবর চেপে যাক, দেশে এর একটা প্রভাব পড়বেই।

মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইএ)-এর এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, আমাদের কাছে বেশ কিছু প্রমাণ রয়েছে যেগুলোতে দেখা যাচ্ছে এত সেনার মৃত্যুতে রুশ জনগণ অসন্তুষ্ট। এই পর্যায়ে এসব মৃত্যুর কথা ঢেকে রাখা সম্ভব না।

ডিআইএ কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিচ্ছেন সাধারণ মানুষের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাবের বিষয়ে। তিনি বলেন, দৃশ্যত সোভিয়েত আমলের দিন ফিরে আসছে, সবকিছুতে দুর্ভোগ ও চরম খাদ্য ঘাটতি। নতুন নিয়োগ পাওয়া লাখো সেনাদের মোতায়েন করা এমনিতেই জটিল। এর সঙ্গে থাকবে বড় আকারের যুদ্ধের প্রতি রুশ জনগণের অনিচ্ছা। সবমিলিয়ে পুতিনকে হয়ত কোনঠাসা অবস্থায় পাওয়া যাবে।

লড়াই যখন অব্যাহত রয়েছে এবং রাশিয়া দূরপাল্লার হামলা অব্যাহত রেখেছে, ইউক্রেনের সামরিক হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, নিহত ইউক্রেনীয় সেনাদের সংখ্যা প্রায় রাশিয়ার সমান (২০ হাজার) হতে পারে। রণক্ষেত্রে মুখোমুখি অবস্থায়ও আছে প্রায় সম সংখ্যক সেনা। ট্র্যাজেডি হলো ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু। জাতিসংঘ বলছে, লড়াই শুরুর পর এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত হওয়া গেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত সপ্তাহে ঘোষণা করেছেন, পুতিন কখনও পুরো ইউক্রেন দখল করতে সক্ষম হবেন না। কিন্তু ডিআইএ কর্মকর্তা বলছেন, মার্কিন রাজনীতিকরা হয়ত মাস বা বছরের কথা বলছেন। যদিও রণক্ষেত্রে এই পর্যালোচনা পাগলামি।

গত সপ্তাহে লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউটের বিশেষজ্ঞ জ্যাক ওয়াটলিং ও নিক রেইমন্ডস বলেছেন, দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে ৯ মে বিজয় ঘোষণার বদলে রুশ সরকার দিনটিকে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ থেকে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারে।

নিউজইউক অবলম্বনে।