মরণোত্তর অঙ্গদানের হার বৃদ্ধিতে যুক্তরাজ্যের নতুন পরিকল্পনা

দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূতসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের ব্রিটিশ নাগরিকদের মধ্যে অঙ্গ ও টিস্যু দানের হার বৃদ্ধির জন্য নতুন আইনের প্রস্তাব করেছে যুক্তরাজ্য। আইনটি ২০২০ সালে কার্যকর হবে। দেশটিতে বর্তমানে বিপুল সংখ্যক কালো, এশীয় ও সংখ্যালঘু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অসুস্থ ব্যক্তি দান করা অঙ্গ পেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার আশায় রয়েছেন। কিন্তু ওই সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে অঙ্গদানের প্রবণতা খুবই কম। অঙ্গদানের অনুমতি সংক্রান্ত নতুন আইন অনুযায়ী, যারা অঙ্গ দান করতে ইচ্ছুক নয়, তাদেরকেই ‘ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসেসের’ (এনএইচএস) ‘অর্গান ডোনার রেজিস্টারে (ওডিআর) গিয়ে অনিচ্ছার কথা জানিয়ে নথিভুক্ত হতে হবে।FPR4ET_trans_NvBQzQNjv4BqRQSYshNMi5jQhKAvOcPkgbkoqxwcRP1Qzr8w2tfJPTk

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জ্যাকি প্রাইস ডয়েল বলেছেন, ‘অঙ্গদান খুবই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। এ বিষয়ে  ধর্মবিশ্বাস অনেকের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। সবার জন্য অঙ্গদান প্রক্রিয়াটি আমরা  এমন করতে চাই যাতে অঙ্গদানে ইচ্ছুক ব্যক্তি তার সিদ্ধান্তের কথা বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, ও এনএইচএসের কর্মকর্তাদের সহজে জানাতে পারেন। এতে তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। যে কেউ অঙ্গদান না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে সেই সিদ্ধান্তই কার্যকর হবে।’

এনএইচএসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাজ্যে অঙ্গদান করা ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র সাত শতাংশ বিএইএমের (ব্ল্যাক, এশিয়ান অ্যান্ড মাইনরিটি এথেনিক) অন্তর্ভুক্ত  সম্প্রদায়গুলোর থেকে এসেছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের মধ্য থেকে মাত্র ০.১ শতাংশ ব্যক্তি অঙ্গদান করেছেন। এনএইচএস ওডিআরের হিসেব মতে গত বছর প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অঙ্গ না পেয়ে যত মানুষ মারা গেছেন তাদের মধ্যে ২১ শতাংশ বিএইএমভুক্ত সম্প্রদায়গুলোর সদস্য। এক দশক আগে এই হার ছিল ১৫ শতাংশ। এনএইচএসের মতে পরিবারের অসম্মতি এশীয় পরিবারগুলোর সদস্যদের অঙ্গদান বাধাগ্রস্ত হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ।

প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অঙ্গ না পেয়ে কালো, এশীয় ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্রিটিশ নাগরিকদের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় এনএইচএসকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে গবেষণা  প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছিল। 

উইনস্টন চার্চিল মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উদ্যোগে প্রকাশিত ‘দ্য অর্গান ডোনেশন: ব্রেকিং ট্যাবুস অ্যামংস্ট ব্রিটিশ বিএইএম কমিউনিটিস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিএইএমভুক্ত সম্প্রদায়গুলোর মানুষদের মধ্যে অঙ্গদানের নিম্ন হারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। এই সম্প্রদায়গুলোতে অঙ্গদানের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস চালু রয়েছে।

প্রতিবেদনের লেখক ‘চার্চিল ফেলো’ নিশথা চুঘ বলেছেন, ‘সরকারের নতুন উদ্যোগটি ভালো। কিন্তু তা কতটা সফল হবে তা নির্ভর করছে ওই সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে বোঝাপড়া ফলপ্রসূ হওয়ার ওপর। মৃত্যু দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতিগুলোতে খুবই স্পর্শকাতর একটি বিষয়। এটা অঙ্গদানের পথে থাকা বাধাগুলোর একটি। নতুন উদ্যোগ যদি  বিশ্বাস ও সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় বিষয়গুলোর সমাধানে ভূমিকা রাখতে এবং অঙ্গদানের বিষয়ে পরিবারের বাকি সদস্যদের সঙ্গে আগে থেকে আলোচনা করে সব ঠিক করে রাখার বিষয়টি উৎসাহিত করতে না পারে তাহলে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান থেকে যাওয়া পরিবারগুলোকে অঙ্গদানের ক্ষেত্রে  উৎসাহিত করার সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না।’

চুঘ একাধিক দেশে থেকে উদাহরণ উপস্থাপন করে তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, অঙ্গদানের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের বাধাকে অতিক্রম করা সম্ভব। গবেষণায় ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, কাতার এবং ইসরায়েলেকে বেছে নেওয়া হয়েছিল এবং দেখা গেছে এই দেশগুলোতে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে শেষকৃত্য নিয়ে যে গভীর ট্যাবু কার্যকর রয়েছে তাকে অতিক্রমের ক্ষেত্রে দৃষ্টিগ্রাহ্য উন্নতি ঘটেছে। অঙ্গদানের বিষয়টি প্রচার করা ও অঙ্গদানে সম্মতি প্রদানের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এইসব অর্জন ও অগ্রগতিতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে শিক্ষাব্যবস্থায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা এবং  তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা।

সরকারকে নিছক ‘অপ্ট-আউট’ প্রক্রিয়ায় আটকে না থাকার পরামর্শ দিয়ে চুঘে আরও বলেছেন, ‘এটা কোনও জাদু নয় যে সব কিছু সম্ভব করে তুলবে। অন্য পথ নিয়েও ভেবে দেখা দরকার। অঙ্গদানের ক্ষেত্রে প্রণোদনামূলক কিছু করা যায় কি না সেটা ভেবে দেখা যেতে পারে।’ ‘অপ্ট-আউট’ মডেল বলতে বোঝায়, প্রত্যক্ষ তালিকাভুক্তি ব্যতিরেকেই সবার জন্য অঙ্গদানকে প্রযোজ্য হিসেবে ঘোষণা করা। এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে ধরে নেওয়া হবে  মৃত ব্যক্তি মরণোত্তর অঙ্গদানে সম্মত ছিলেন। কেউ যদি অঙ্গদান না করতে চায় তাহলে তাকে জীবিত অবস্থাতেই এনএইচএসে গিয়ে অঙ্গদানে অনিচ্ছার কথা জানাতে হবে। যুক্তরাজ্যে বর্তমানে ‘অপ্ট-ইন’ প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে, মৃত ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় অঙ্গদানের কথা লিখিতভাবে জানিয়ে না গেলে তার অঙ্গ পাওয়া না পাওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের সিদ্ধান্ত বিবেচ্য।

যুক্তরাজ্য ‘অপ্ট-আউট’ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে প্রতিস্থাপনের জন্য প্রাপ্য অংজ্ঞের প্রাপ্যতা বৃদ্ধির জন্য। কিন্তু ওয়েলসে ওই আইন বাস্তবায়নের পরও অঙ্গদানের হার বৃদ্ধি পায়নি। সেখানে ২০১৫ সালে ‘অপ্ট-আউট’ ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে।

‘অপ্ট-আউট’ ব্যবস্থা কার্যকরের প্রস্তাব গত বছরের জুলাইতে যুক্তরাজ্যের সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। এ বছর তা আবার হাউজ অফ কমনসে আলোচিত হওয়ার কথা। সরকার আশা করছে, আইনটি পাস হলে বছরে ৭০০ মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে।

কালো, এশীয় ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য এমন ব্রিটিশ নাগরিকরা শ্বেতাঙ্গ দাতাদের কাছ থেকে প্রতিস্থাপনের জন্য অঙ্গ পান। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো অঙ্গ পাওয়া সম্ভব তাদের নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সদস্য অপর একজন মানুষের কাছ থেকেই।