রানি এলিজাবেথের শাসন: স্বর্ণযুগ, নাকি বিগত দিনের শেষ অঙ্গার?

রেকর্ড ভাঙা সময় রাজত্বের সময় বৃহস্পতিবার মৃত্যু হয়েছে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের। ৭০ বছরের রাজত্বকালে তিনি ব্রিটিশ রাজের প্রতীক হয়ে ওঠেন। যদিও তার শাসনামলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবসান এবং সামাজিক পরিবর্তন ঘটেছে।

কিছু বিশ্লেষক তার শাসনামলকে ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। তাদের মতে, তিনি প্রথম এলিজাবেথের কথা মনে করিয়ে দেন। প্রথম এলিজাবেথ ৪০০ বছর আগে ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের সময়কালে ইংল্যান্ডকে শাসন করেছেন।

সাবেক রাজনীতিক ও প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে রাজশাসন দ্বারা ‘অর্ডার অব দ্য গার্টার’ নিয়োগ পাওয়া ভ্যালেরি আমোস বলেন, আমি মনে করি আমরা আংশিকভাবে রানির প্রিজম দিয়ে দেখি: তিনি যে ধারাবাহিকতা, বিজ্ঞতা তিনি দেখিয়েছেন তাতে মানুষ ব্রিটেনকে যেভাবে দেখে তার সবটাই স্পষ্ট হয়েছে।

অন্যরা বলছেন, জাতির ওপর তার প্রভাবের ব্যাপ্তি বা গভীরতা পূর্বসূরীদের তুলনায় কম ছিল। প্রথম এলিজাবেথ যুগ থেকেই মুকুটধারীদের ক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে।

কিছু সমালোচকের মতে, সমতাবাদী বিশ্বের আকাঙ্ক্ষার জন্য একটি অনুপযুক্ত প্রতিষ্ঠান, অযৌক্তিক সামাজিক মিডিয়া মন্তব্য এবং সার্বক্ষণিক মিডিয়ার নজরে থাকা ছাড়া তিনি কোনও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেননি।

তবু তার উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের মধ্যে রয়েছে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে রাজত্ব টিকিয়ে রাখা।

মাত্র ২৫ বছর বয়সে ১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রানির সিংহাসনে বসেন এলিজাবেথ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন যখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে তখন তার বাবা ষষ্ঠ জর্জের মৃত্যুর পর রাজদণ্ড হাতে নেন। তখনও রেশন চালু রয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বে ছিলেন উইনস্টন চার্চিল।

এরপর থেকে প্রেসিডেন্ট, পোপ ও প্রধানমন্ত্রী এসেছেন এবং চলেও গেছেন, ভেঙে গেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেনের সাম্রাজ্যের অবসান হয়েছে, স্থান করে নিয়েছে ৫৬ দেশের কমনওয়েলথ। এর পেছনে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

ব্রিটেনের সাংবিধানিক ইতিহাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ভারনন বগড্যানোর বলেন, কোনও সাম্রাজ্যিক শক্তি এমনটি অর্জন করতে পারেনি। ব্রিটেনে ব্যাপক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ ও সম্মতিক্রমে। এটি খুবই উল্লেখযোগ্য।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে রানি এলিজাবেথের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন মানুষ। ছবি: এপি

 

দ্বিতীয় এলিজাবেথীয় যুগ?

১৬ শতকে সিংহাসনে ৪৪ বছর ছিলেন প্রথম এলিজাবেথ। ওই সময় ইংল্যান্ডের স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত। তখন দেশটির অর্থনীতির বিকাশ হয়, প্রভাব বিস্তৃত হয় এবং উইলিয়াম শেক্সপিয়ার তার নাটক লিখেছিলেন। যা এখনও বিশ্বের বিভিন্নস্থানে মঞ্চস্থ হয়।  

১৯৫৩ সালে বড়দিনের সম্প্রচারে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ বলেছিলেন, কিছু মানুষ প্রত্যাশা করেছিলেন যে আমার শাসন নতুন একটি এলিজাবেথীয় যুগের সূচনা করবে। সত্যি বলতে কী আমি নিজেকে আমার মহান পূর্বসূরীদের মতো মনে করি না।

রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ কখনও সাক্ষাৎকার দেননি বা রাজনৈতিক ইস্যুতে প্রকাশ্যে ব্যক্তিগত মতপ্রকাশ করেননি। এমনকি নিজের শাসনামলের কোনও মূল্যায়ন করেননি। এক সিনিয়র রাজসহকারী বলেছেন, বিষয়টি তিনি অন্যদের বিচারের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।

সাংবিধানিক ইতিহাসবিদ ডেভিড স্টার্কি বলেছেন, রানি তার ভূমিকাকে একটি ঐতিহাসিক সময়ের মূর্তকরণ হিসেবে বিবেচনা করেননি, নিছক দায়িত্ব পালন হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

২০১৫ সালে স্টার্কি বলেন, রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ এমন কিছু করেননি ও বলেননি যা মানুষ মনে রাখবে। সমালোচনা হিসেবে আমি এমনটি বলছি না, এটি সত্যের একটি বিবৃতি। এমনকি এটি এক ধরনের প্রশংসা। আমি ধারণা করি রানিও এটিকে প্রশংসা হিসেবেই নেবেন। তিনি একটি কাজ করার জন্য সিংহাসনে বসেছিলেন, আর তা হলো রাজপরিবারের প্রদর্শন জারি রাখা।

অপর ইতিহাসবিদ ও জীবনী লেখকরা মনে করেন স্টার্কির এমন দৃষ্টিভঙ্গি রানি সময়ের সঙ্গে যেসব ভূমিকা রেখেছেন সেগুলোর প্রতি অবিচার।

প্রিন্সেস ডায়ানার জীবনী লেখক অ্যান্ড্রিউ মর্টন বলেন, ক্রমবর্ধমান একটি বিশৃঙ্খল বিশ্বে তিনি স্থিতিশীলতার অনুভূতি দিয়েছেন।

২০১২ সালে এক তথ্যচিত্রে নাতি প্রিন্স উইলিয়াম বলেছিলেন, রানি যা করতে পেরেছেন তা হলো ২১ শতকে রাজত্বকে টিকিয়ে রেখেছেন। যে কোনও প্রতিষ্ঠানকে সময়ে সময়ে নিজের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। রাজতন্ত্র হলো ক্রমাগত পরিবর্তশীল একটি যন্ত্র। আমি মনে করি সমাজের প্রতিফলন হতে চায়, এটি সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যেতে চায় এবং গুরুত্বপূর্ণ হলো এটির নিজের টিকে থাকা।

সূত্র: রয়টার্স