রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে: ফারাহ কবির

সামনেই বর্ষাকাল। এ অবস্থায় কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে বসবাসকারীদের নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, এই মৌসুমে বন্যা ও ভূমিধসের মুখে পড়তে পারেন তারা। বাড়তে পারে রোগবালাই।

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতার মাত্রা বাড়ায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন তারা। আর তাদের সহায়তায় বাংলাদেশ সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। এমনই একটি সংস্থা অ্যাকশন এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির গত সপ্তাহে বাংলাদেশ থেকে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানেই তার সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের।

অ্যাকশন এইডের বাংলাদেশ প্রধান ফারাহ কবির

 প্রশ্ন: আপনি এখানে কার কার সঙ্গে দেখা করেছেন এবং কী ধরনের কথা শুনেছেন?

ফারাহ কবির: বিভিন্ন ধরনের মানুষ ও গোষ্ঠীর সঙ্গে আমি দেখা করেছি। রোহিঙ্গাদের প্রতি তারা সহানুভূতিশীল এবং তাদের সম্মান ও অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যও তারা কাজ করতে আগ্রহী। তবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনার সুরটি ভিন্ন। আমি বলবো, আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব ও রাজনীতিবিদরা সত্যিকার অর্থে তাদের প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেননি। সবকিছুই খুব ধীরগতিতে চলছে।

সেপ্টেম্বরের পর থেকে আমরা অনেককেই বাংলাদেশে যেতে দেখেছি। তার সবাই বাংলাদেশের বন্ধু। কিন্তু তারা যথাযথ পদক্ষেপ নেননি, যথেষ্ট সাহসও দেখাননি। মূল বিষয় হলো—মিয়ানমারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য কত টাকা সহায়তা করছেন, সেটা বড় বিষয় নয়। বরং মিয়ানমারকে তাদের কৃতকর্মের জন্য দায়ী করতে হবে, সেটাই মূল বিষয়।

প্রশ্ন: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক লিসা কার্টিস সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেছেন। তিনি ফিরে যাওয়ার পর হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প রোহিঙ্গা ইস্যুতে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি এই সংকটের সমাধান চান। আপনি এই মার্কিন প্রশাসনের কাছ থেকে কী ধরনের ইঙ্গিত পাচ্ছেন।

ফারাহ কবির: একটি গ্রুপ এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এর সঙ্গে কার্যত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির যোগ নেই। বাংলাদেশ থেকে এসে সেই প্রতিশ্রুতির বিষয়টি বোঝা আরও কঠিন। এখান থেকে শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর কথা বলা হয়, সীমান্তে দেয়াল তোলার কথা বলা হয়। রোহিঙ্গা ইস্যুর সঙ্গে এসব বিষয় সাংঘর্ষিক। ফলে প্রশ্ন ওঠে—ট্রাম্প প্রশাসন হঠাৎ করে কেন রোহিঙ্গাদের ওপর সহানুভূতি দেখাতে শুরু করলো?

রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর থাকবেই। কিন্তু এই সময়টি কথা বলার নয়, কাজের। আমরা সেই কাজই এখন দেখতে চাই। মিয়ানমারের ওপর যে চাপ প্রয়োগের কথা ছিল, সেই চাপ কোথায়? রোহিঙ্গাদের ওপর যে গণহত্যা চালানো হয়েছে, তার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর কতটুকু চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেটাই আমার কাছে তাদের সেই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পরিমাপের সূচক।

প্রশ্ন: এই মুহূর্তে রোহিঙ্গা শিবিরের কী অবস্থা?

ফারাহ কবির: যেখান থেকে তারা পালিয়ে এসেছে, তারচেয়ে অবশ্যই ভালো অবস্থায় আছে তারা। এখানে নিরাপদ বোধ করে, রাতে ঘুমাতে পারে। তারা খাদ্য পাচ্ছে, তাদের সন্তানেরা খেলাধুলা করতে পারছে। তারা যে নির্যাতনের মধ্যে ছিল তার চেয়ে অনেক ভালো আছে। কিন্তু এটা জীবন হতে পারে না। শরণার্থী শিবিরে থাকাটা কোনও গ্রহণযোগ্য বিকল্প হতে পারে না, এটা শেষ একটি অবলম্বন মাত্র।

গত আগস্ট মাসের পর থেকে এক লাখেরও বেশি শিশু জন্ম নিয়েছে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবিরগুলোতে। এদের নাগরিকত্ব কী হবে? তাদের শিক্ষার কী ব্যবস্থা হবে? কেউ কেউ বলতে পারেন, তারা তো মিয়ানমারে থাকলেও শিক্ষা পেতো না। ফলে এটা নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। কিন্তু তারা তো এখন মিয়ানমারে নেই, তারা আছে বাংলাদেশে। আমরা তাদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে কথা বলছি, কাজ করছি। তাই এটা ঠিক করতে হবে, এসব রোহিঙ্গা শিশুর পড়ালেখা কীভাবে চলবে।

 

রোহিঙ্গা শিবিরে অ্যাকশন এইডের প্রধান

প্রশ্ন: আপনাদের এই প্রশ্ন কাদের কাছে?

ফারাহ কবির: এই প্রশ্নগুলো আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের কাছে। এই দায়িত্ব বাংলাদেশের একার হতে পারে না। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এর জন্য মিয়ানমারকে দায়ী করতে হবে। বাংলাদেশ তার সাধ্যমতো রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য যতটুকু সম্ভব করবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে হবে। তা না করতে পারলে একটি গোটা প্রজন্ম হারিয়ে যাবে। আমরা কি তাদের ভুলে যেতে পারি?

প্রশ্ন: কোন বিষয়টির ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন আপনি?

ফারাহ কবির: আমরা আসন্ন বর্ষাকাল নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। বাংলা নতুন বছর শুরুর সময়টিতে কালবৈশাখী ঝড়ও হয়। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে একেকটি ঘরে আকৃতি ৬-৭ ফুট। বাঁশের কাঠামোতে পলিথিদের বেড়া তুলে বানানো এসব ঘর, ছাউনিতে তারপুলিন। একেকটি রোহিঙ্গা পরিবারের সদস্য ৬-৭ জন। পাহাড় কেটে এই বাড়িগুলো বানানো হলেও পরিকল্পনামাফিক এগুলো তৈরি হয়নি। কারণ, এটি অভিবাসন ছিল না। প্রাণে বাঁচতে আচমকা রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে চলে আসতে শুরু করলে তাড়াহুড়ো করে তৈরি করতে হয়েছে এসব আশ্রয় শিবির। চার-পাঁচদিনের টানা বৃষ্টিতে এখানে ভূমিধস হতে পারে। তাছাড়া, এখানে সামান্য একটু স্থানে বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস। এটা ভয়াবহ বিপর্যয় বা মহামারির জন্য আদর্শ একটি পরিস্থিতি। আমরা ধারণাও করতে পারছি না, এমন কিছু ঘটলে কী হতে পারে। তাই ব্যবস্থা যা নেওয়ার এখনই নিতে হবে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ সরকার কি এই চাপ নিতে পারবে?

ফারাহ কবির: না। আর এই চাপ বাংলাদেশ একা কেন নেবে? আমরা এজন্যই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। অবকাঠামোগত অনেক কাজ রয়েছে, সেগুলো করতে হবে। রোহিঙ্গাদের অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। সেই কাজও করতে হবে। কিছু একটা বিপর্যয় ঘটে গেলে পরে কাজ করা নয়, আমাদের আগে থেকেই সতর্ক ব্যবস্থা নিতে হবে।