মডেল বিমান বানিয়ে পেছনের জানালা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার সেই ঘর, প্রথম বিমান উড্ডয়নের সেই স্বপ্ন বোনার স্থান- চাঁদে পা রাখা প্রথম মানব নীল আর্মস্ট্রংয়ের শৈশবের ঐতিহাসিক বাড়িটি বিক্রি হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ওয়াপাকোনেটা শহরের ‘৬০১ ডব্লিউ. বেনটন স্ট্রিটে’ অবস্থিত এই দুই তলা বাড়িটি প্রায় ৪০ বছর পর প্রথমবারের মতো বাজারে বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে। তবে বাড়িটির ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত ইতিহাস শিক্ষক কারেন মাইকসেল ১৯৮৮ সালে যখন বাড়িটি কেনেন, তখন তিনি জানতেনই না এখানে একসময় কে বাস করতেন। পরে আরেকজন শিক্ষকের মাধ্যমে আর্মস্ট্রংয়ের স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়ির ইতিহাস জানতে পেরে এটি সংরক্ষণের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। বর্তমানে ৮২ বছর বয়সী মাইকসেল জানান, এটি এমন কারো কাছে বিক্রি করা উচিত যিনি আর্মস্ট্রংয়ের মতো করে এর ইতিহাস রক্ষা করবেন। ৪ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলারে তালিকাভুক্ত বাড়িটি কিনে কোনও ক্রেতা আর্মস্ট্রং এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামকে দান করবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। তবে মিউজিয়ামের মুখপাত্র লোগান রেক্স জানিয়েছেন, প্রপার্টিটি কেনার মতো পর্যাপ্ত তহবিল তাদের নেই।
১৯৪৪ সালে আর্মস্ট্রংয়ের পরিবার বাড়িটি কেনে। এখানেই তরুণ বয়সে ডাইনিং টেবিলে কাঠ ও আঠা দিয়ে বিমান বানাতেন এবং বেসমেন্টে বাতাস চলাচলের পথ তৈরি করে মডেল বিমানের পরীক্ষা চালাতেন আর্মস্ট্রং। কিশোর বয়সে বাইকেল চালিয়ে পাশের এয়ারস্ট্রিপে গিয়ে উড্ডয়ন শেখা শুরু করেন তিনি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি প্রথম একাই বিমান উড্ডয়ন করেন এবং পাইলটের লাইসেন্স পান। এর ঠিক ২০ বছর পর তিনি প্রথমবারের মতো মহাকাশে পাড়ি জমান এবং ১৯৬৯ সালে চাঁদে ইতিহাস গড়ে ফিরে এসে সিনসিনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।
যদিও বাড়িটি সাধারণ দর্শনার্থীদের ট্যুরের জন্য উন্মুক্ত নয়, তবুও যুগে যুগে বহু নভোচারী এই বাড়িটি পরিদর্শনে এসেছেন। মাইকসেল এখন পর্যন্ত আর্মস্ট্রংয়ের সহযাত্রী বাজ অলড্রিনসহ নয়জন নভোচারীকে নিজ বাড়িতে স্বাগত জানিয়েছেন। ২০১২ সালে আর্মস্ট্রং মারা যাওয়ার কয়েক বছর পর বাজ অলড্রিন এই বাড়ির দোতলার ঘরে ঢুকে কেঁদে ফেলেছিলেন বলে স্মৃতিচারণ করেন মাইকসেল। নভোচারীরা তাকে আর্মস্ট্রংয়ের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে অটোগ্রাফসহ ছবি এবং অ্যাপোলো ১১ ক্যাপসুল রিকভারিতে ব্যবহৃত সোনালী ফয়েলের টুকরো উপহার দিয়েছেন।
১৯০৮ সালে তৈরি এই ঐতিহাসিক বাড়িটির সামনের অংশ এখনও আগের মতোই রয়েছে। আর্মস্ট্রং এবং তার বাবা কাঠের টুকরো দিয়ে পেছনের যে গ্যারেজটি বানিয়েছিলেন, সেটি এখনও টিকে আছে। দোতলায় আর্মস্ট্রংয়ের পুরানো ঘরটি এখন চাঁদে অবতরণের নানা ছবি ও চিত্রকর্ম দিয়ে সাজানো। ছাদ থেকে ঝুলছে রাইট ব্রাদার্সের তৈরি প্রথম বাণিজ্যিক বিমানের একটি মডেল, যারা আর্মস্ট্রংয়ের প্রেরণা ছিলেন।
১৯৬০ এর দশকের মাঝামাঝি আর্মস্ট্রং পরিবার বাড়িটি বিক্রি করে দেওয়ার পর হাতে গোনা কয়েকজন এটি কেনেন। মাইকসেল বাড়িটি কেনার পর এর মূল রূপ ফিরিয়ে আনেন। তিনি আর্মস্ট্রংয়ের বাবা-মা, ভাইবোন ও সন্তানদের সাথেও বাড়িটি নিয়ে কথা বলেছেন। বর্তমানে কোনও আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও নতুন মালিকেরা এই বাড়ির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বজায় রাখবেন বলেই বিশ্বাস করেন মাইকসেল।
সূত্র: এপি