যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় স্ত্রী মামতা কাফলে ভাট্টের নিখোঁজ হওয়ার প্রায় দুই বছর পর আদালতে নতুন দাবি করেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নরেশ ভাট্ট। তার দাবি, স্ত্রী আত্মহত্যা করেছিলেন। তবে তার মরদেহ করাত দিয়ে টুকরা করার কথা স্বীকার করেছেন তিনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ডব্লিউইউএসএ এ তথ্য জানিয়েছে।
৩৯ বছর বয়সী নরেশ ভার্জিনিয়ার একটি আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বলেন, ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই রাতে তিনি স্ত্রীকে বিছানার পায়ের কাছে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তার চারপাশে বমি ছড়িয়ে ছিল এবং বিছানার পাশে খোলা অবস্থায় একটি কীটনাশকের প্যাকেট পড়ে ছিল।
মামতা কাফলে ভাট্ট ছিলেন ২৮ বছর বয়সী একজন নার্স ও এক সন্তানের মা। ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই থেকে তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে কর্তৃপক্ষ তাকে মৃত বলে ধরে নেয়। কয়েক সপ্তাহ পর স্ত্রীর প্রথম ডিগ্রির হত্যাকাণ্ড, মরদেহ গোপন এবং মরদেহের অবমাননার অভিযোগে নরেশের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
২০২৪ সালের পর এই প্রথম মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানতে পারল, ওই রাতের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে নরেশের নিজের দাবি কী। মামলার শুনানিতে নিজের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি এ বর্ণনা দেন।
ডব্লিউইউএসএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাক্ষ্য দেওয়ার দ্বিতীয় দিনে স্ত্রীর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে আগের বক্তব্য থেকে সরে এসে নরেশ বলেন, নিখোঁজ হওয়ার রাতে তিনি মামতাকে বিছানার পায়ের কাছে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছিলেন।
কেন জরুরি সেবা নম্বর ৯১১-এ ফোন করেননি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি ফোন করার চেষ্টা করেছিলাম। আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। নরেশের দাবি, ২৯ জুলাই রাতে তিনি সন্তানকে নিয়ে ঘুমাতে যান। মামতা কখন ওপরে এসেছিলেন, তা তিনি শুনতে পাননি। ভোর প্রায় ৪টার দিকে ঘুম থেকে উঠে স্ত্রীকে বিছানার পায়ের কাছে পড়ে থাকতে দেখেন। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তাকে উঠানোর করার চেষ্টা করেন। এরপর মরদেহ বাথরুমে নিয়ে যান।
পরে করাত দিয়ে মরদেহ টুকরা করার কথা স্বীকার করেন নরেশ। এ সময় নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন বলে জানান তিনি। সেদিনের ঘটনা মনে করতে পারছেন কি না, আইনজীবীর এমন প্রশ্নের জবাবে নরেশ বলেন, ক্যানের মধ্যে যাতে রাখা যায়, সে জন্য ছোট করার চেষ্টা করছিলাম। পা আলাদা করার চেষ্টা করছিলাম...নিচের অংশ আলাদা করছিলাম।
তিনি আরও বলেন, আমার হাত কাজ করছিল না। আমি জানি না তখন কী অনুভব করছিলাম, তবে খুব অদ্ভুত লাগছিল। কিছুই করতে পারছিলাম না। আমার হাতও কাজ করছিল না, শরীরও কাজ করছিল না...এরপর মরদেহটি আবর্জনার পাত্রে রাখি। মরদেহ দেখার পর কী করেছিলেন, আইনজীবীর এমন প্রশ্নে নরেশ বলেন, আবর্জনার পাত্রে রেখেছিলাম। আমার কাছে করাত ছিল। সেটি ব্যবহার করেছি।
ফেয়ারফ্যাক্স কাউন্টি পুলিশের সাবেক নিয়োগপ্রার্থী এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর রিজার্ভে স্বয়ংক্রিয় লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করা নরেশের বিরুদ্ধে প্রথম ডিগ্রির হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার খবর পুলিশকে জানান নরেশ। শুরুতে তিনি পুলিশকে বলেছিলেন, মামতা নিউইয়র্ক বা টেক্সাসে আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে থাকতে পারেন। তবে পরে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, ওই দুই অঙ্গরাজ্যে মামতার কোনও আত্মীয় ছিলেন না। তার ফোন ১ আগস্ট পর্যন্ত সক্রিয় ছিল।
মামতাকে সর্বশেষ ২৭ জুলাই মানাসাসের ইউভিএ হেলথ প্রিন্স উইলিয়াম মেডিকেল সেন্টারে দেখা গিয়েছিল। সেখানে তিনি মেডিকেল-সার্জিক্যাল ইউনিটে কাজ করতেন। পরে কর্তৃপক্ষ তাকে খুঁজে না পাওয়ায় মৃত বলে ধরে নেয়। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, হত্যাকাণ্ডের পর ৩০ জুলাই নরেশ ছুরি ও পরিষ্কারের সামগ্রী কিনেছিলেন। এতে অপরাধের আলামত মুছে ফেলার চেষ্টার সন্দেহ তৈরি হয়।
এ ছাড়া মামতার শয়নকক্ষ থেকে রক্তের ছিটের মতো দাগ এবং বাথরুমে রক্তের পুকুরের মতো চিহ্ন পাওয়া যায়। মেঝের ওপর দিয়ে কোনও কিছু টেনে নেওয়া হয়েছে, এমন আলামতও ছিল বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।
ভার্জিনিয়া পুলিশ জানায়, মামতার শয়নকক্ষ থেকে পাওয়া রক্তের ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে, সেটি তারই। প্রমাণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। ২২ আগস্ট নরেশকে গ্রেফতার করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি মরদেহের অবমাননাসহ আরও কয়েকটি অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস