এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)-এর প্রক্টর ডা. মো. হাবিবুর রহমান দুলাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি ও ই রয়েছে। এর মধ্যে এ এবং ই এর ধরন প্রায় একই। এটি খাদ্য ও পানির মাধ্যমে ছড়ায় এবং এগুলো প্রতিরোধযোগ্য। এরমধ্যে বি এবং সি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই দুটোতে আক্রান্ত হলে লিভার সিরোসিস হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।’
এ বিষয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার এএসএম আলমগীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হেপাটাইটিস এ এবং ই খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। চট্টগ্রামের হালিশহরের বাসিন্দাদের হেপাটাইটিস ই’তে আক্রান্ত হওয়ার খবর পেয়ে আমরা বিষয়টি তদন্ত করি। গত মে মাসের শুরুতে আমাদের তদন্ত দল সেখানে গিয়ে এই খবরের সত্যতা পায়। তখন কারও মৃত্যুর সংবাদ শোনা যায়নি। পরবর্তীতে এই সপ্তাহে দু’জনের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হলে আমাদের চার সদস্যের তদন্ত দল সেখানে গেছে।’
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মো. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দু’জন রোগী হেপাটাইটিস ই’তে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন কিনা বিষয়টি আমরা তদন্ত করছি। আমাদের সিটি করপোরেশনের দল আছে, ঢাকা থেকে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত দল এসেছে, তারা তদন্ত করছে। এই দলে আছেন আইইডিসিআর-এর ডা. পারভেজ আহমেদ, ডা. আব্দুল্লাহ হিল মারুফ ফারুকী ও ডা. হাবিবুর রহমান। তারা তদন্ত শেষ করলে জানা যাবে যে রোগী ঠিক কোন রোগে মারা গেছে।’
ডেথ সার্টিফিকেটে রোগীর হেপাটাইটিস ই’তে মৃত্যুর কথা লেখা থাকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকরা এটি লিখেছে, কিন্তু বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কারণ অন্য রোগও থাকতে পারে। শুনেছি একটি স্ট্রোকের সমস্যা ছিল, উচ্চরক্তচাপ ছিল। আর একজনের ডায়াবেটিস ছিল, কিডনি ডিজিজ ছিল। এখন একজন লোক যদি চারটি রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, তাহলে কোন রোগে মারা গেছে এটা তদন্ত ছাড়া বোঝা যাবে না।’
দূষিত পানির মাধ্যমে এই রোগ ছড়াচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বলেছি যে, রোগটি পানিবাহিত রোগ। এই এলাকার পানি তিনভাবে দূষিত হয়। ওয়াসার পানি সম্পর্কে জনগণের অভিযোগ যে- এই পানিতে দোষ আছে। যদিও ওয়াসা সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছে যে, ওরা পরীক্ষা করে দেখেছে এই পানিতে জীবাণু নাই। আর আমার ডিপার্টমেন্ট থেকে বলেছে, ওয়াসার পানি নিয়ে ওয়াসা থাকুক এবং আপনি আপনার স্বাস্থ্যসেবার দিকগুলো দেখেন। কারণ দুটোই সরকারি স্বাস্থ্যসেবা, আপনার ঝামেলায় যাওয়ার দরকার নেই। দ্বিতীয়ত, ওই এলাকার পানির ট্যাংকগুলো ছাদের নিচে আছে। এগুলো ১০-২০ বছর ধরে পরিষ্কার করা হয় না। এতে ব্যাঙ, টিকটিকি মরে পড়ে আছে। এটাও পানি দূষিত হওয়ার কারণ। তাছাড়া এলাকাবাসী আমাদের দেখিয়েছে যে ওয়াসার পানির লাইনে লিকেজ আছে। আমাদের ঢাকা থেকে আসা টিম এই পানির স্যাম্পল নিয়েছিল। তারা একটি স্যাম্পলে দোষ পেয়েছে। তাই আমরা মেয়রকে বলেছি, সবাইকে নিয়ে একটি সমন্বয় মিটিং করতে। সবাইকে নিয়ে তিনি একটি সমন্বয় মিটিং করার কথা জানিয়েছেন। এই অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে না পারলে এই রোগের সমাধান হবে না।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হেপাটাইটিস ই জটিল রোগ না। এটা থেকে জন্ডিস হয়। শুধু গর্ভবতী নারীদের জন্য এটা ঝুঁকিপুর্ণ। গর্ভবতী নারী ছাড়া অন্যদের জন্য এটা সিরিয়াস কিছু না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে রোগী এমনিতেই ভালো হয়ে যায়।’
রোগটির প্রতিরোধ প্রসঙ্গে ডা. মো. হাবিবুর রহমান দুলাল বলেন, ‘যেহেতু এটি পানি, খাবার মাধ্যমে এবং হাতের মাধ্যমে ছড়ায়, এজন্য এটি প্রতিরোধ করতে হলে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ঠিক রাখতে হবে। যেখানে সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করা যাবে না। হাত ধুয়ে খাবার খেতে হবে। খাবারের পরে হাত পরিষ্কার করে ধুতে হবে। একইসঙ্গে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। তাহলে এই রোগ প্রতিরোধ করা যাবে।’