প্রসঙ্গত, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বৃহস্পতিবার (৮ আগস্ট) পর্যন্ত মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১২ জন। একইসময়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২১ জন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন ৪ জন। মহাখালীতে ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৬ জন। গত ৩ আগস্ট শমরিতা হাসপাতালে মারা যান চাঁদপুরের লাভলী বেগম নামে ১ জন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গত সপ্তাহে ২ জন নারী মারা যান। গত ২৮ জুলাই গাজীপুর থেকে আসা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত আব্দুল করিম নামে ১ জন সিএমএইচে মারা যান। এরআগে, পুলিশ কর্মচারী হাসপাতালে গত ১৯ জুন ১ জন মারা গেছেন।
এদিকে, বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার বাইরে খুলনা, চাঁদপুর, মাদারীপুরে তিনজন, নড়াইল, কক্সবাজার, নোয়াখালী, কিশোরগঞ্জ, কুষ্টিয়ায় ১৭ জন মারা গেছেন। অথচ স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তালিকায় এসব হাসপাতালে ডেঙ্গুরোগে আক্রান্ত হয়ে রোগীর মৃত্যুসংখ্যা দেখানো হয়েছে শূন্য। অর্থাৎ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে এসব হাসপাতালে কোনও রোগী মারা যাননি বলে দাবি করেছে ডেথ রিভিউ কমিটি।
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে এই পর্যন্ত ৮২ জনের মৃত্যু হলেও সরকারি হিসাব বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে (৮ আগস্ট) পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছেন মাত্র ২৯ জন।
ডেঙ্গুরোগীর মৃত্যুর হিসাবে এত গরমিল কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অফিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, ‘‘আইইডিসিআর থেকে আমাদের জানানো হয়। তারা ডিক্লেয়ার করলেই কেবল আমরা বলতে পারি। তাদের একটি পৃথক ‘ডেথ রিভিউ কমিটি’ রয়েছে, যারা এসব মৃত্যু তদন্ত করে প্রকাশ করে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার সব খবরই আমরা জানি। কিন্তু আইইডিসিআরের কাছে সরাসরি খবর চলে যায়। তারাই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে। তাই, তারা যদি কনফার্ম না করে, তাহলে আমরা তা দিতে পারি না।’
ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু নিয়ে আইইডিসিআরের ডেথ রিভিউ করার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ‘‘আইইডিসিআর ‘এপিডেমিক ইনস্টিটিউট’, ডেথ ও বার্থ রেজিস্ট্রেশন এবং সার্টিফিকেশনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমআইএস বিভাগ রয়েছে। আইইডিসিআর ডেথ রিভিউ করে কীভাবে? প্রতিষ্ঠানটির ডেথ রিভিউ করার আইনগত বৈধতা কী?’ তাদের অভিযোগ, ‘এখানে মৃত্যুর কারণ ও সংখ্যা নিয়ে ‘লুকোচুরি’ উদ্দেশ্য রয়েছে। তাই এসব রিভিউ কমিটি করা হচ্ছে।’’
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডেথ রিভিউ কমিটি করায় যে মৃত্যুর সংখ্যা ঠিকমতো প্রকাশ পাবে না, সেটি পরিষ্কার হয়েছ আজই (৮ আগস্টে)। গতকাল পর্যন্ত ঢামেক কর্তৃপক্ষ তাদের মৃত্যুর হিসাব প্রকাশ করতো। গতকাল রাতে সেখানে ডেথ রিভিউ গঠন করার পর আজ লাটু মিয়া নামের এক রোগী ডেঙ্গুতে মারা গেলেও হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা, নাছির উদ্দীন বলেছেন, ‘লাটু মিয়া নামের একজন মারা গেছেন শুনেছি। তবে, তিনি ডেঙ্গুতেই মারা গেছেন কিনা, তা যাচাই না করে এই মুহূর্তে কিছু বলা যাবে না।’
স্বাস্থ্য অধিদফতর আদৌ কোনও তদারকি করছে কিনা, সেই প্রশ্ন রেখে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলেন, ‘‘অনেক রোগী আছেন, যাদের ডেঙ্গু হওয়ার আগে থেকেই কিছু জটিল রোগ ছিল। ডেঙ্গুর কারণে তাদের সেই জটিলতা বেড়েছে। মৃত্যুও হয়েছে। এটাকে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুই ধরে নিতে হবে। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদফতর এটাকে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুর তালিকা থেকে ‘খারিজ’ করে দিচ্ছে।’’
ডেথ রিভিউ কমিটির দেওয়া মৃত্যুর সংখ্যা এতে কম কেন এবং এর ফলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে কিনা, জানতে চাইলে আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চিকিৎসকরা যখন মৃত্যুকারণ ঘোষণা করেন, তখন ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোসিসের ভিত্তিতে করেন। ডেথ রিভিউ কমিটি করা হয়েছে। সেখানে চিকিৎসকরাই রয়েছেন। আমরা কোনও সিদ্ধান্ত দেই না, আমি পদাধিকার বলে এখানে আছি মাত্র।’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আমি এখনও কোনও ‘ইনফ্লুয়েন্স’ করিনি। জ্বর নিয়ে কোনও রোগী এলে তিনি যদি দুই ঘণ্টার ভেতরে মারা যান, তাহলেও তাকে এখন ডেঙ্গু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। কিন্তু ডেঙ্গুতে মৃত্যু কিনা, নিশ্চিত হতে চিকিৎসা সংক্রান্ত সব তথ্যের পাশাপাশি হাসপাতালে অবস্থানকালীন সব তথ্য পর্যালোচনা করেন ডেথ রিভিউতে থাকা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। একইসঙ্গে আমরা মৃতের স্বজনদের সঙ্গেও কথা বলি। রোগীল শারীরিক কী কী সমস্যা ছিল, সেসব নিয়ে কথা বলি।’’
আইইডিসিআরের পরিচালক আরও বলেন, ‘আমরা ডেথ রিভিউ কমিটির কাছে চিকিৎসকদের ফাইন্ডিংস ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া তথ্যসহ কাগজপত্রও তাদের দেই। সব কিছু পর্যালোচনা করেই রিভিউ কমিটি সিদ্ধান্ত দেয়, কোন মৃত্যু ডেঙ্গুর কারণে হয়েছে, কোনটা ডেঙ্গুর কারণে নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘‘হয়তো কোনও মানুষের অস্ত্রোপচার হয়েছে। তার মধ্যে ডেঙ্গুর ইনফেকশনও থাকতে পারে। কিন্তু মারা যাওয়ার কারণে ডেঙ্গু না হয়ে তার জন্য ‘সার্জিক্যাল কম্প্লিকেশন’ হয়েছে। তার জন্যও তিনি মারা যেতে পারেন।’’ এসব কারণে ডেথ রিভিউ কমিটি যখন বিশ্লেষণ করে, সেটাকেই শুধু তালিকায় তোলা হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘এ পর্যন্ত ২৯ জনের মৃত্যুর কথা বলছি। সেটা ৫২ জনের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করার পর নিশ্চিত হওয়া গেছে।’ তিনি বলেন, ‘বাকিগুলো যে ডেঙ্গু নয়, তা কিন্তু নয়, মৃত্যুটা ডেঙ্গুর কারণে হয়তো নয়।’
এখানে গ্যাপের কিছু নেই মন্তব্য করে ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘আপনারা যখন ২৯ বলেছেন, তখন আমরা হয়তো পাঁচটি বলেছি, আমরা এখন ২৯ বলছি, আপনারা হয়তো বেশি বলছেন। তবে ডেথ রিভিউ চলতে থাকবে। ধীরে ধীরে হয়তো এটি বৃদ্ধি পাবে। যখন নিশ্চিত হবে, তখন সেই সংখ্যা আমাদের রেকর্ডে তুলবো।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে একই প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খুব জোর দিয়েই বলছি, এই রিভিউ কমিটির কোনও প্রয়োজন নেই। এই কমিটি করে আরও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। কারণ রিভিউ তখনই প্রয়োজন হয়, রোগীর যদি কম্পেনসেসন (ক্ষতিপূরণ) অথবা আইনগত বা ইন্সুরেন্স (বীমা)-এর কোনও বিষয় থাকে। কিন্তু এই রিভিউ কমিটি করে সঠিক বিষয়টি আসছে না। তারা যে রোগীর স্বজনের কথা বলে, সেটিও সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল করে, অন্য কেউ না। তাইলে রিভিউ কমিটির কী প্রয়োজন ছিল?’
জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘একজন চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যখন নিশ্চিত করে এটা ডেঙ্গু রোগী, তখন আমার জন্য তিনি ডেঙ্গু রোগী। একজন ডেঙ্গু রোগী যদি মারা যান এবং তার যদি অন্য কোনও রোগও থাকে, তাহলেও তাকে ডেঙ্গুতে মারা গেছে বলেই বলতে হবে। এটাই হচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল রুল। কেউ যদি স্ট্রোকে মারা যান, কেউ যদি ডায়াবেটিসের রোগীও হন, কিন্তু তিনি যদি ডেঙ্গুতে মারা যান, তাহলে ধরেই নিতে হবে, তিনি ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। বিশ্বজুড়ে এই নীতিই ফলো করা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরাও কিন্তু ২০০৯ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জার সময়ে এটাই ফলো করেছি। এত ডেথ রিভিউ না করে কোনও চিকিৎসক যদি ডেঙ্গু রোগী বলে, সেটাই মেনে নেওয়া উচিত। আমরা এখন বিভিন্ন জায়গায় ডেথ রিভিউ কমিটি দেখতে পাচ্ছি। ডেথ রিভিউ কমিটির দরকার কী?’ তাহলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কে দেবে বলেও তিনি প্রশ্ন করেন।
ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘‘বর্তমান পরিস্থিতি ডেঙ্গু ‘মহামারি’ কিনা, সেটি ‘ডিক্লেয়ার’ করার দায়িত্ব সরকারের। তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, এটি মহামারির কাছাকাছি পর্যায়েই পৌঁছে গেছে।
প্রায় একই কথা বললেন সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই যে চিকিৎসকরা যে ডেথ সার্টিফিকেট দিচ্ছেন, দিস ইজ দ্য রাইট। এর বাইরে আর কোনও কথা নেই। চিকিৎসক যখন মেডিক্যাল ইথিকস, রুলস, চিকিৎসকের অধিকার মিলিয়ে ডেথ ঘোষণা করেন, তখন দিস ইজ দ্য ফাইনাল।’তিনি আরও বলেন, ‘কোনও রোগী যখন মারা যান, তখন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও সেটা যাচাই করি। এরপর কনফার্ম করেই স্বাস্থ্য অধিদফতরে তথ্য পাঠাই।’ সুতরাং সেখানে আর কারও পরীক্ষা করার দরকার নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।