স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম বলছে, চলতি বছরে ৮৬ হাজার ১৫৫ জনের মধ্যে ঢাকার ১২টি সরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৭ হাজার ৮৮৩ জন, ২৯টি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৮ হাজার ৭৮২ জনসহ ঢাকা মহানগরীতে মোট চিকিৎসা নিয়েছেন ৪৬ হাজার ৬৬৫ জন। আবার ঢাকা মহানগরী ছাড়া ঢাকা বিভাগসহ মোট আট বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৯ হাজার ৮৭৮ জন। আর এখন পর্যন্ত শতকরা ৯৮ শতাংশ রোগী হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) বলছে, তাদের হিসাবে এখন পর্যন্ত ৭৫ জন রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। আইইডিসিআরের ডেথ রিভিউ কমিটি দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হওয়ার ২২৪টি ঘটনাকে বিশ্লেষণ করছে। এর মধ্যে রিভিউ কমিটি ১২৬টি মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে ৭৫টি মৃত্যু ডেঙ্গুতে হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে। এই ৭৫ মৃত্যুর মধ্যে গত এপ্রিলে মারা গেছেন দুই জন, জুনে ছয় জন, জুলাইতে ৩২ জন, আগস্টে ৩১ জন এবং সেপ্টেম্বরে চার জন।
ডেঙ্গু চিকিৎসা বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি হাসপাতালে সাধারণ, দরিদ্র মানুষ থেকে শুরু করে যে কেউ চাইলেই এসে ডেঙ্গুর পরীক্ষা করাতে পেরেছেন, পরীক্ষাতে ডেঙ্গু পজিটিভ এলে তারা ভর্তি হয়েছেন। তবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অনেকেরই আইসিইউ ট্রিটমেন্ট দরকার হয়েছে এবার। আর আইসিইউ আসলে ঢাকাতে বেশিরভাগই বেসরকারি পর্যায়ে। যারা এবারে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ক্রিটিক্যাল অবস্থানে ছিলেন, তাদের বেশিরভাগই বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসা নিয়েছেন। আর যখন ক্রিটিক্যাল রোগী আইসিইউতে গিয়েছে, তখন সেখানে মারা যাওয়ার রিস্কও বেশি ছিল।
ডেঙ্গু আক্রান্তদের সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের ডেঙ্গু বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের কথা উঠেছে। সিরিয়াস রোগী এবং ফেসিলিটিস-এই দুটি বিষয়ও আক্রান্ত রোগী এবং মারা যাওয়া রোগীর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে ঢাকার ২৯টি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে পাঠানো ১০২টি মৃত্যুর ঘটনার মধ্যে ৮১টি মৃত্যু পর্যালোচনা করে ৫৫টি মৃত্যু ডেঙ্গুতে হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ডেথ রিভিউ কমিটি। এরমধ্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে পাঠানো তিনটি মৃত্যুর মধ্যে দুটি মৃত্যু পর্যালোচনা করে একটি, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতাল থেকে পাঠানো ১১টি মৃত্যুর মধ্যে সাতটি পর্যালোচনা করে পাঁচটি, বারডেম হাসপাতাল থেকে পাঠানো চারটির মধ্যে দুটি মৃত্যু পর্যালোচনা করে একটি, ইবনে সিনা হাসপাতাল থেকে পাঠানো সাতটি মৃত্যুর মধ্যে পাঁচটি পর্যালোচনা করে তিনটি, স্কয়ার হাসপাতাল থেকে পাঠানো ১২টি মৃত্যুর ঘটনা ১২টি পর্যালোচনা করে ১২টি, শমরিতা হাসপাতাল থেকে পাঠানো দুটি ঘটনার মধ্যে দুটি পর্যালোচনা করে একটি, মিরপুরের ডেলটা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সেন্ট্রাল হাসপাতাল, হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতাল থেকে পাঠানো একটি করে মৃত্যুর ঘটনা পর্যালোচনা করে একটি করে ডেঙ্গু আক্রান্ত মৃত্যু পাওয়া গেছে।
এছাড়া গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাঠানো চারটি ঘটনার মধ্যে চারটি পর্যালোচনা করে একটি, কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল থেকে পাঠনো ছয়টি ঘটনার মধ্যে চারটি পর্যালোচনা করে তিনটি, ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে পাঠানো আটটি ঘটনার মধ্যে সাতটি পর্যালোচনা করে ছয়টি, অ্যাপোলো হাসপাতাল থেকে পাঠানো পাঁচটি ঘটনার মধ্যে পাঁচটি পর্যালোচনা করে পাঁচটি, ইউনির্ভাসেল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে পাঠানো চারটি ঘটনার মধ্যে চারটি পর্যালোচনা করে চারটি, বিআরবি হাসপাতাল থেকে পাঠানো সাতটি ঘটনার মধ্যে সাতটি পর্যালোচনা করে তিনটি, আজগর আলী হাসপাতাল থেকে পাঠানো সাতটি ঘটনার মধ্যে পাঁচটি পর্যালোচনা করে চারটি, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে পাঠানো তিনটি ঘটনার মধ্যে একটি পর্যালোচনা করে একটি এবং অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে পাঠানো ৯টি মৃত্যুর মধ্যে পাঁচটি পর্যালোচনা করে দুইটি মৃত্যু ডেঙ্গুতে হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিউটের ডেথ রিভিউ কমিটি।
অপরদিকে, ঢাকা মহানগরী ছাড়া ঢাকা বিভাগসহ মোট আট বিভাগ থেকে পাঠানো ৪১টি মৃত্যুর মধ্যে ১৫টি ঘটনা পর্যালোচনা করে চারটি মৃত্যু ডেঙ্গুতে হয়েছে বলে জানানো হয়। এরমধ্যে ঢাকা বিভাগে একটি, খুলনা বিভাগে দুইটি এবং রংপুর বিভাগে একজনের মৃত্যু ডেঙ্গুতে হয়েছে।
বেসরকারি হাসপাতালে কেন মৃত্যু বেশি জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ- ই- মাহবুব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকারি হাসপাতালে প্রথম থেকেই একটি গাইডলাইনের ভেতর দিয়ে চিকিৎসকরা গিয়েছেন, সেখানে তাদের ( চিকিৎসক) নিজস্ব কোনও চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ ছিল না। তারা নির্দিষ্ট প্রটোকল মেনে কাজ করেছেন, আর এটার ঘাটতি ছিল বেসরকারি হাসপাতালে। সেসব হাসপাতালে সবসময়ের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও উপস্থিত থাকেন না। আর বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়া রোগীদের বেশিরভাগই ‘সিরিয়াস’ অবস্থাতে গিয়েছেন। সেখানে সিরিয়াস রোগীদের চিকিৎসার যে প্যাটার্ন তাতে কিছুটা ঘাটতি থাকতে পারে।
বেসরকারি ব্যবস্থাপনার হাসপাতালে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বারবারই প্রশ্ন উঠছে, এ বিষয়ে আইইডিসিআর-এর সাবেক পরিচালক ও গবেষক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যেহেতু এই বিষয়টি একটি ইনভেস্টিগেশনের বিষয়..., তাতে হয়তো আসল কারন ধরা পরবে। তবে রোগী যেখানে ভর্তি হয়েছে সেখানে তারা কী পরিস্থিতিতে ভর্তি হয়েছেন সেটা প্রথমে বিবেচ্য বিষয়। আরেকটি বড় বিষয় হচ্ছে, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের যেভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের সেভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। তাদের যেভাবে গাইডলাইন ফলো করার কথা, তারা সেভাবে সেটি করে কিনা সেটিও একটি বড় বিষয়।
তিনি আরও বলেন, সরকারি হাসপাতালে যেভাবে আলাদাভাবে ওয়ার্ড করে চিকিৎসক-নার্সদের প্রশিক্ষণ দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, সেভাবে বেসরকারি হাসপাতালে করা আসলে সম্ভব না। তবে হাতে গোণা কয়েকটি বড় হাসপাতাল ওয়ার্ড করেছিল, নতুন করে চিকিৎসক নিয়োগও করেছিল। তবে নতুন নিয়োগ হওয়া চিকিৎসকদের এই বিশেষ রোগে কতটা প্রশিক্ষণ রয়েছে, তারা কতটা বুঝবে সে বিষয়গুলোও ভাবতে হবে।
জানতে চাইলে বেসরকারি হাসপাতাল হেলথ অ্যাণ্ড হোপের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ডেথ রিভিউ কমিটির পর্যালোচনার ওপর নির্ভর করার কোনও দরকার নেই- এটা আমার খুব পরিষ্কার কথা। রিভিউ কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে মন্তব্য করার কোনও জায়গা নেই।