ওমিক্রন কি ডেল্টাকে ছাড়াবে?

করোনা ভাইরাসের অতি সংক্রামক ওমিক্রনের ত্রাস দেখছে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যেই ভয়ংকর ডেল্টার সময়ে একদিনে শনাক্তের হারকে পেছনে ফেলেছে ওমিক্রন। ঘরে ঘরে মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। তাদের কেউ পরীক্ষা করাচ্ছেন আর কেউ করাচ্ছেন না। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। গত এক সপ্তাহে বেড়েছে মৃত্যুও।

২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম তিনজন করোনায় শনাক্ত হওয়ার কথা জানায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এর ঠিক ১০ দিন পর করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যুর কথাও জানায় প্রতিষ্ঠানটি। এরপর প্রায় দুই বছর ধরে চলা এ মহামারির সংক্রমণ চিত্রে বিভিন্ন সময়ে ওঠানামার চিত্র দেখেছে দেশ। তবে সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা দেখা গেছে বছরের জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে।

করোনার ধরন ডেল্টার তাণ্ডবে সেসময়ে দেশ একদিনে সর্বোচ্চ রোগী আর সর্বোচ্চ মৃত্যু দেখেছে। তবে আগস্টের শেষ দিকে এসে সংক্রমণ কমতে শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। শনাক্তের হার কমে আসে ১ শতাংশের কাছাকাছি। তবে বছর শেষে নতুন ত্রাসের জন্ম দেয় করোনার অতিসংক্রমণশীল ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন। ডেল্টার তুলনায় পাঁচ থেকে ছয়গুণ বেশি সংক্রমণ ক্ষমতা নিয়ে ওমিক্রন ছড়াতে থাকে বাতাসের গতিতে।

প্রথম ওমিক্রন শনাক্ত

গত ১১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের দুই জন সদস্য করোনা ভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনে শনাক্ত হয়েছেন বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। এই ক্রিকেট দলের সদস্যরা জিম্বাবুয়ে সফর শেষে দেশে ফেরেন। তাদেরকে আইসোলেশনে রাখা হয়। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে ওমিক্রনের প্রভাব বাড়তে থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র অধ্যাপক নাজমুল ইসলাম জানিয়েছেন,দেশে এখনও ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের প্রাধান্য বেশি থাকলেও একটু একটু করে জায়গাটা ওমিক্রন দখল করে নিচ্ছে। দেশে ওমিক্রনের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন তথা সামাজিক সংক্রমণ হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ফলে ওমিক্রনের প্রভাবে দেশের আগের সব রেকর্ড ভেঙে যাবে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ইতোমধ্যে তাদের সে কথাকেই সত্যি করে ডেল্টার সর্বোচ্চ রোগী শনাক্তের রেকর্ড ভেঙেছে ওমিক্রন।

মাসজুড়ে ছড়ালো ওমিক্রন

শুরু দিকে যারা ওমিক্রনে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়,তাদের সবাই ছিল রাজধানী ঢাকার বাসিন্দা। এরপরে যশোর ও চট্টগ্রামেও ওমিক্রনে আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়। মূলত এরপর থেকেই পুরো দেশজুড়ে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।

দেশে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের দাপটে গত বছর জুলাই-আগস্টের দিকে দৈনিক শনাক্তের হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। পরে তা কমতে কমতে জুলাই মাসে ২ শতাংশে নামে। যা ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণেই ছিল।

গত ১০ জানুয়ারি রোগতত্ত্ব,রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,ইনফেকশাস ডিজিজের সূত্রমতে,ওমিক্রন যেভাবে ছড়াচ্ছে এবং তার শনাক্তের হার যদি হিসাব করা হয় তাহলে এটা আগামী তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে দেশজুড়ে ছড়িয়ে যাওয়ার কথা এবং সেটারই ‘ফোরকাস্ট’ হচ্ছে গত এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় ধরে।

ওমিক্রনে ভয়ংকর জানুয়ারি

নতুন বছরের প্রথম দিন আগের ২৪ ঘণ্টায় ( ৩১ ডিসেম্বর,২০২১ সকাল ৮ থেকে ১ জানুয়ারি,২০২২ সকাল ৮টা পর্যন্ত) ৩৭০ জন নতুন করোনা রোগী শনাক্তের তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর। সেদিন নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তে হার ছিল দুই দশমিক ৪৩ শতাংশ। একই সময়ে চার জনের মৃত্যুর কথাও জানানো হয়। আর গত ২৪ ঘণ্টায় ( ৩১ জানুয়ারি সকাল ৮টা থেকে ১ ফেব্রুয়ারি) করোনায় রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৩ হাজার ১৫৪ জন। মারা গেছেন ৩১ জন,শনাক্তের হার ২৯ দশমিক ১৭ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, নতুন শনাক্ত হওয়া ১৩ হাজার ১৫৪ জনকে নিয়ে দেশে করোনাতে কেবলমাত্র শনাক্ত হওয়া রোগী সংখ্যা ছাড়িয়ে গেল ১৮ লাখ।

অধিদফতরের হিসাবে দেখা যায়,গত দুই দিন ধরে করোনায় রোগী শনাক্ত কিছুটা কম হচ্ছে। গত ১০ জানুয়ারিতে তার আগের ২৪ ঘণ্টায় ( ৯ জানুয়ারি সকাল ৮টা থেকে ১০ জানুয়ারি সকাল ৮টা) পর্যন্ত দুই হাজার ২৩১ জন শনাক্ত হয় বলে জানায় অধিদফতর। আর ২০ জানুয়ারিতে জানায় ১০ হাজার ৮৮৮জন শনাক্ত হবার তথ্য। আর সেদিন শনাক্তের হার ছিল ২৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

২৪ জানুয়ারিতে ১৪ হাজার ৮২৮ জন ( শনাক্তের হার ৩২ দশমিক ৪০ শতাংশ),২৫ জানুয়ারিতে ১৬ হাজার ৩৩ জন (৩২ দশমিক ৩৭ শতাংশ),২৬ জানুয়ারিতে ১৫ হাজার ৫২৭ জন (৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশ),২৭ জানুয়ারি ১৫ হাজার ৮০৭ জন ( ৩১ দশমিক নয় শতাংশ),২৮ জানুয়ারি ১৫ হাজার ৪৪০জন ( ৩৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ),২৯ জানুয়ারি ১০ হাজার ৩৭৮ জন ( ৩১ দশমিক ১০ শতাংশ),৩০ জানুয়ারিতে ১২ হাজার ১৮৩ জন ( ২৮ দশমিক তিন শতাংশ) আর ৩১ জানুয়ারিতে ১৩ হাজার ৫০১ জন ( ২৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ) শনাক্ত হবার তথ্য জানায় স্বাস্থ্য অধিদফতর।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবে দেখা যায়,গত ১২ জানুয়ারি সরকারি হিসাবে শনাক্ত রোগী ১৬ লাখ ছাড়ায়,এর ১৩ দিন পর ২৫ জানুয়ারি ছাড়িয়ে যায় ১৭ লাখ। এর ঠিক সাতদিন পর ১ ফেব্রুয়ারিতে রোগী ছাড়ালো ১৮ লাখ।

ডেল্টাকে ছাড়াচ্ছে

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানাচ্ছে,কেবল জানুয়ারি মাসেই করোনাতে নতুন শনাক্ত হয়েছেন দুই লাখের বেশি মানুষ। অধিদফতর বলছে,২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে যেখানে শনাক্ত হয়েছিলেন ২১ হাজার ৬২৯ জন,সেখানে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে শনাক্ত হয়েছেন দুই লাখ ১৩ হাজার ২৯৪ জন। আর জানুয়ারির মোট শনাক্ত হওয়া রোগী সংখ্যা গত বছরের ডেল্টার সময়ের জুন মাসকে ছাড়িয়ে গেছে। গত বছরের জুনে ডেল্টা তাণ্ডবে শনাক্ত পৌঁছায় এক লাখ ১২ হাজার ৭১৮ জনে।

এ মাসেই দেশে করোনা মহামারিকালে দৈনিক শনাক্তের হারের নতুন রেকর্ড হয়েছে। গত ২৮ জানুয়ারি ডেল্টার শনাক্তের হারের রেকর্ড পেছনে পরে যায়। সম্প্রতি অধিদফতর জানায়,আগের ২৪ ঘণ্টায় রোগী শনাক্তের হার ৩৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এর আগে গত বছরে ডেল্টার সময়ে ২৪ জুলাই শনাক্তের সর্বোচ্চ হার ছিল ৩২ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

রোগতত্ত্ব,রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ( আইইডিসিআর) এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,সংক্রমণের এই চিত্র আমাদেরকে আগামী দুই সপ্তাহ পর্যন্ত দেখতে হবে,ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ সেটা হয়তো কমে আসবে। তবে সংক্রমণের এ পর্যায়ে দেশে আরও বেশি করে নমুনা পরীক্ষা বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি। ডা. মুশতাক হোসেন বলেন,সরকারি ১১ দফা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পাশাপাশি মানুষকে সম্পৃক্ত করার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

যখন ডেল্টা হয় তখন কিন্তু করোনাকে প্রতিরোধ করার জন্য একদম ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি করার প্রজ্ঞাপন দিয়েছিল ক্যাবিনেট। এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, যেখানে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সবাই ছিল। যেখানে করোনাকে প্রতিরোধে কাজ করার পাশাপাশি টিকার জন্য কাজ করা হতো।

আর এটা গ্রামে কিছুটা হয় কিন্তু শহরে একদমই হয় না জানিয়ে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন,শহরে এটা করার জন্য সিটি মেয়রদেরকে কাজ করতে হবে,তারা যেন উদাহরণ তৈরি করেন। ২০২০ সালে যখন জোনাল লকডাউন হয়েছিল,তখন তারা বেশ সক্রিয় ছিল। সেভাবেই এখন আবার কাজ করতে হবে।