ছুটি চাওয়ায় চিকিৎসককে শোকজ

রাজধানীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের একজন চিকিৎসক ছুটির আবেদন করায় তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ওই চিকিৎসককে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য ও পবিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মানবসম্পদ -২ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব সুজিৎ দেবনাথ স্বাক্ষরিত নোটিসে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী ( শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ মোতাবেক কেন আপনার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তা পত্রপ্রাপ্তির সাত কর্মদিবসের মধ্যে জবাব প্রদানের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

ছুটি চাওয়ায় কারণ দর্শানোর এ নোটিসে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে চিকিৎসকদের মধ্যে । তারা বলছেন, ছুটি দেওয়ার বা না দেওয়ার ক্ষমতা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রয়েছে। কিন্তু ছুটির আবেদন করায় কারণ দর্শানোর নোটিস কেন দেওয়া হবে?

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে থাকা গত ১৭ ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিসে বলা হয়, চিকিৎসক ( নাম প্রকাশ করা হলো না) আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মালদ্বীপ ভ্রমণের জন্য আটদিন অর্জিত ছুটির আবেদন করেছেন। বর্তমানে কোভিড সংক্রমণ এবং মৃত্যু বাড়ছে। কোভিড পরবর্তী জটিলতায় অনেক রোগী মারা যাচ্ছে। ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ ইনস্টিটিউটে চাকরি করে দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে মালদ্বীপে আনন্দ ভ্রমণের বিষয়টি হতাশাব্যঞ্জক। বিষয়টি আপনার দায়িত্বহীনতার পরিচয় বহন করে ।

এমতাবস্থায় কেন আপনার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তা পত্রপ্রাপ্তির সাত কর্মদিবসের মধ্যে জবাব প্রদানের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

এ বিষয়ে ওই চিকিৎসক  বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি একটি করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে দায়িত্বরত।  দুই বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছি, কিছুটা ক্লান্তও। কিন্তু বর্তমান সময়ে সংক্রমণ কমে এসেছে। তাই ছুটির জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু করোনার শুরুতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে স্বাস্থ্য বিভাগের সবার ছুটি বাতিল করে নোটিস দেওয়া হয়। আমার ধারণা, সে নোটিস এখনও বহাল থাকায় আমাকে নোটিস দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, দেশে করোনা মহামারি শুরু হলে স্বাস্থ্য বিভাগের সবার ছুটি বাতিল করা হয়।

ছুট চাওয়ায় কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়াতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, ছুটি না দেওয়ার এখতিয়ার নিশ্চয়ই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রয়েছে। কিন্তু ছুটি চাওয়াতে কারণ দর্শানোর নোটিস কেন দেওয়া হবে?

নোটিসের আরেকটি বিষয় নিয়ে চিকিৎসকরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এই নোটিস করোনা মহামারির সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখীর সময়ে। অথচ গত কয়েকদিন ধরেই সংক্রমণ কমেছে। হাসপাতালে রোগী সংখ্যাও কম। আর যে হাসপাতালে ওই চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সে হাসপাতালে বর্তমানে করোনাতে আক্রান্ত কোনও রোগী ভর্তি নেই। ১৭৪টি সাধারণ শয্যার সবগুলো ফাঁকা। ফাঁকা রয়েছে ১৬টি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র ( আইসিইউ)।

ছুটি চাওয়ার কারণে নোটিস কেন দেওয়া হবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে একাধিকবার হাসপাতালের পরিচালককে ফোন করা হলেও তার ফোনে সংযোগ পাওয়া যায়নি।

একাধিক চিকিৎসক নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তারা বলছেন, ছুটি চাইবার কারণে কোনও  চিকিৎসককে শোকজ দেওয়ার ঘটনা বোধহয় বাংলাদেশেই প্রথম হবে। চিকিৎসকরা গত দুই বছর ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, সেখানে একজন চিকিৎসককে শোকজ নোটিস দেওয়া মানে পুরো চিকিৎসক সমাজকে অপমান করা।  আর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবার যে কথা বলা হয়েছে, সেটা পুরো চিকিৎসকদের জন্য অত্যন্ত অ্যালার্মিং।

একজন চিকিৎসক ছুটি চাইলে তাকে কেন শোকজ করা হবে প্রশ্ন রেখে  বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) এর মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, ছুটি পাওয়া বা ছুটি চাওয়া যে কোনও সরকারি কর্মকর্তার অধিকার। ছুটি দেবেন কিনা তা নির্ভর করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ওপর। কর্তৃপক্ষ চাইলেই ছুটির আবেদন রিজেক্ট করতে পারে। 

ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, যদি কোনও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাকে শোকজ করে থাকেন, আমি সেই চিকিৎসককে অনুরোধ করবো মানবাধিকার এবং সরকারি বিধি লঙ্ঘন করার দায়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে চাকরি ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা করতে।  বিএমএ তাকে সব ধরনের সহযোগিতা দেবে।