কিডনি দিয়ে ছেলেকে বাঁচিয়েছিলেন মা, কেড়ে নিলো করোনা

দুই বছর আগে নিজের কিডনি দিয়ে মোহাম্মদ সাইফুলকে নতুন জীবন দিয়েছিলেন মা নুরুননেছা বেগম। কিন্তু করোনা কেড়ে নিলো তার নাড়ি ছেঁড়া ধন। রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাইফুল গত ৩ মার্চ রাত ৮টার দিকে মারা যান।

ফোনে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা হয় নুরুননেছা বেগমের। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার লোহাগড়া থানায়। তার স্বামী পেশায় রিকশা চালক। তাদের চার ছেলের মধ্যে সাইফুল বড়। তিনি ছিলেন মায়ের সবচেয়ে আদরের। তাই ছেলের চিকিৎসার জন্য নিজেদের বাড়ি, গরু-ছাগলসহ সবই বিক্রি করে দিয়েছেন নুরুননেছা। এখন অন্যের বাড়ি থাকেন তিনি। সম্পদহীন হয়েও তার কষ্ট ছিল না। ছেলেকে হারানোর পর নিজেকে নিঃস্ব লাগছে তার, ‘কিডনি দিয়াও ছেলেটারে বাঁচাইতে পারলাম না। আমার বুকের ভেতরে এখন কষ্ট আর ব্যথা।’

গত ৫ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন সাইফুল। পরদিনই আবারও বাড়ি ফিরে যান। এরপর থেকে হালকা হাঁচি ও জ্বর আসে। ৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে যাওয়ায় তাকে ঢাকায় আসার পরামর্শ দেওয়া হয়। মা ও ছেলে মিলে ফের ঢাকায় আসে। যেখানে তার কিডনির চিকিৎসা হয়েছিল সেই হাসপাতালে ভর্তির পর চিকিৎসকরা জানান, ফুসফুসে পানি জমেছে বলে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তারা প্রথমে পাঁচ লিটার অক্সিজেন দেন। পরে তার চাহিদা ১০ লিটারে গিয়ে ঠেকে। কিন্তু ১০ লিটার অক্সিজেন দেওয়ার মতো সক্ষমতা সেই বেসরকারি হাসপাতালের না থাকায় তাকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার জন্য বলা হয়।

নুরুননেছা বেগম জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারি সাইফুলের করোনা শনাক্ত হয়। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে সাইফুলকে ভর্তি করানো হয় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। প্রথম রাখা হয় ওয়ার্ডে। এরপর এইচডিইউতে (হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট) স্থানান্তর করা হয় তাকে। পরদিন (১৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে তাকে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) নিয়েছিলেন চিকিৎসকরা।

পাঁচ বছর আগে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন সাইফুল। এরপর সুস্থই ছিলেন তিনি। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে তার কিডনি রোগ ধরা পড়ে। এজন্য ভারতে গেলে জানতে পারেন, তার দুটি কিডনিই ড্যামেজ। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, কিডনি না পাল্টানো হলে বাঁচার আশা ক্ষীণ। দেশে ফিরে ঢাকার একটি হাসপাতালে আট মাস ছিলেন তিনি।

নুরুননেছা বলেন, ‘যখন ডাক্তাররা বললো– একটা কিডনি পাইলে ছেলেটা সুস্থ হইয়া যাইবো, সারাজীবন ভালো (সুস্থ) মানুষের মতো বাঁচতে পারবো। ভাবলাম, আমার কিডনি হইলো দুইটা। তাইলে আমরা মা-ছেলে কেন আমার দুইটা কিডনি ভাগ কইরা বাঁচতে পারমু না? হাসপাতালের দেয়ালে দেয়ালে কিডনি দানের কথা দেখছি। এইসব পইড়া আরও সাহস পাইলাম– আমি তো আমার ছেলেরে কিডনি দিয়া বাঁচাইতে পারি। এরপর বিভিন্ন টেস্ট হইলো, এরপর ছেলেরে আমি কিডনি দিলাম। আমার অন্য তিন ছেলের কথা ভাবি নাই। যা ছিল সম্পদ, সেসব কিছু বিক্রি করে ছেলেটার চিকিৎসা করাইছিলাম। নিজের শরীর থেকে কিডনি দিলাম, ছেলেটা সুস্থও হইলো। কিন্তু করোনার সহ্য হইলো না, আমার ছেলেটারে নিয়া নিলো।’

সাইফুলের জন্য সবারই একটু আলাদা মমতা ছিল জানিয়ে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান সহকারী অধ্যাপক ডা. শাহজাদ হোসেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সাতাশ বছরের ছেলেটা। দুই বছর হলো বিয়ে হয়েছে। তার কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে বছরখানেক আগে। কিডনি দান করেছিলেন ছেলেটির মা।’

সেদিনের অভিজ্ঞতা ফেসবুকে বর্ণনা করেন ডা. শাহজাদ হোসেন, ‘আমার ডিউটি শেষ হবে রাত ৮টায়। ডিউটির একেবারে শেষ সময়ে সব চেষ্টার পরও ছেলেটি মারা যায়। ডেথ ডিক্লেয়ার করা হয় রাত ৮টা ১০ মিনিটে। তার মা এবং স্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে দুঃসংবাদটি শোনাতে হয়েছে আমাকে। সাইফুলের স্ত্রী ছুটে বেরিয়ে যায়। কিন্তু তার মা আমার চোখে চোখ রেখে কথা শুনছিলেন এবং তার যা জানার জেনে নিচ্ছিলেন। গ্রামীণ একজন নারী, কোথায় এত শক্তি পেয়েছেন জানি না। গ্রামের মানুষ হয়েও সাহস দেখিয়েছেন। তবু হেরে গেলেন।’

ডা. শাহজাদ হোসেন আরও লিখেছেন, ‘কোভিড-১৯ কত মানুষের বুক থেকে হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে নিয়ে গেছে তা শুধু সেইসব পরিবারই জানে আর জানি আমরা।’