দুই বছর পর করোনায় ‘স্বস্তি’

আজ ৮ মার্চ— দেশে করোনা মহামারির দুই বছর। ২০২০ সালের এ দিন দেশে তিন জন করোনা আক্রান্ত রোগীর খবর জানায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এর ঠিক ১০ দিন পর করোনা আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যুর কথা জানায় প্রতিষ্ঠানটি। এরপর থেকে দেশ পার করেছে কঠিন এক সময়।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহানে প্রথম করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মহামারি ঘোষণা করে ১১ মার্চ। দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। দেশে দেশে দেওয়া হয় লকডাউন।

শুরুতে করোনাতে আক্রান্ত রোগীদের মৃতদেহ দাফন করার লোকপর্যন্ত পাওয়া যেত না। চিকিৎসা নিতে হাসপাতালগুলোতে বেড না পেয়ে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতেই মৃত্যু হয়েছিল অনেকের। তবে দুই বছর পেরিয়ে ‍তৃতীয় বছরের শুরুতে বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বই করোনার স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে।

 

স্ক্রিনিং ও প্রথম তিন রোগী

গতবছরের ২১ জানুয়ারি শুধু চীন ফেরত এবং সাত ফেব্রুয়ারি থেকে সব যাত্রীরই স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করে সরকার। ৮ মার্চ আইইডিসিআরের তৎকালীন পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, এতদিন যা বলে এসেছি আজ আর তা বলতে পারছি না। বাংলাদেশে তিন জন করোনা আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে দুজন পুরুষ, একজন নারী।

 

প্রথম ও দ্বিতীয় বছরে মৃত্যু

২০২০ সালের ৮ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ৬ মার্চ পর্যন্ত দেশে করোনায় শনাক্ত হন পাঁচ লাখ ৪৯ হাজার ৭২৪ জন। মারা গেছেন আট হাজার ৪৫১ জন। সুস্থ হয়েছিলেন পাঁচ লাখ এক হাজার ৯৬৬ জন।

গত রবিবার (৬ মার্চ) পর্যন্ত করোনায় মোট শনাক্ত ১৯ লাখ ৪৭ হাজার ২৬৬ জন, মোট মারা গেছেন ২৯ হাজার ৮৫ জন। সে হিসেবে দ্বিতীয় বছরে করোনাতে শনাক্ত হয়েছেন ১৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫৪২ জন আর মারা গেছেন ২০ হাজার ৬৩৪ জন।

করোনাতে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়ে উঠেছেন ১৮ লাখ ৪৩ হাজার ৩৩৮ জন। সে হিসেবে দ্বিতীয় বছরে সুস্থ হয়েছেন ১৩ লাখ ৪১ হাজার ৩৭২ জন।

 

প্রথম পিক

২০২০ সালের ৫ জুন দেশে করোনা শনাক্তের ৯০তম দিনে সংক্রমিত শীর্ষ ২০ দেশের তালিকায় ঢুকে যায় বাংলাদেশের নাম (সূত্র: ওয়ার্ল্ডোমিটার)। জুনে শনাক্ত ছাড়িয়ে যায় এক লাখ। জুলাই মাসে একদিনে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ১৯ জন শনাক্ত হয়। আগস্ট পর্যন্ত চলে এই তাণ্ডব। জনস্বাস্থ্যবিদরা এই সময়টাকে করোনার পিক (চূড়া) আখ্যা দিয়েছিলেন। এরপর সংক্রমণ কমতে শুরু করে।

 

টিকা

২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি দেশে করোনা টিকাদান কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর সাত ফেব্রুয়ারি দেশজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। কয়েকদফায় বয়স কমিয়ে শিক্ষার্থী, ভাসমান জনগোষ্ঠী, গর্ভবতী নারীদের টিকার আওতায় আনা হয়েছে। কয়েকবার গণটিকাদান কর্মসূচির বিশেষ ক্যাম্পেইনও হাতে নেয় অধিদফতর। যা এখনও চলমান।

 

ফের সংক্রমণ

২০২০ সালের মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত রোগী শনাক্তের হার বাড়ে। শীতের সময় দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা থাকলেও রোগী শনাক্তের হার ছিল নিম্নমুখী। কিন্তু ২০২১-এর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সংক্রমণের হার কমতে শুরু করলেও মার্চ থেকে বাড়তে শুরু করে। ৭ এপ্রিল আইইডিসিআর দেশে সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্টের কথা জানায়।

সেসময় দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা হাজারের ওপরে চলে যায়। শনাক্ত ও মৃত্যু বাড়তে থাকায় পাঁচ এপ্রিল থেকে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এতে সংক্রমণ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও ঈদুল ফিতরে বিধিনিষেধ আবার শিথিল হয়ে পড়ে।

৩০ মে আইইডিসিআর চারটি ভ্যারিয়েন্টের কথা জানিয়ে বলে—  ২৭টি ইউকে ভ্যারিয়েন্ট, ৮৫টি সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট, পাঁচটি নাইজেরিয়ান ভ্যারিয়েন্ট এবং ২৩টি ইন্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্ট তথা ডেল্টা পাওয়া গেছে।

 

ডেল্টার ধ্বংসলীলা

৪ জুন আইইডিসিআর জানায়, দেশে সংক্রমণের ৮০ শতাংশই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। এর কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিক সংক্রমণ হয়েছে ততদিনে। যার ফলে প্রথমে সীমান্তবর্তী জেলা ও পরে পাশের জেলাগুলোতেও সংক্রমণ ছড়িয়ে যায় হু হু করে।

সেসময় ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কঠোর বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার কারণে আগের বিপর্যয়কে ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। শহর ছেড়ে যাওয়া গ্রামমুখী মানুষের ঢল নামে। ছিল না স্বাস্থ্যবিধির বালাই।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতিতে শঙ্কা প্রকাশ করে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তারা সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হতে অনুরোধ করেছিল।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সেই আশঙ্কাকে সত্যি করে দেশে করোনা মহামারিকালের দ্বিতীয় ঢেউয়ের এপ্রিলকে ছাড়িয়ে জুন হয়ে ওঠে ভয়ংকর। ১ জুলাই থেকে আবার কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়ার নির্দেশনা জারি হয়। যার সময়সীমা বাড়িয়ে ১৪ জুলাই পর্যন্ত করা হয়। তবে সেই কঠোর বিধিনিষেধও দিনে দিনে শিথিল হতে শুরু করে।

তখন ‘পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে’ বলে ফের শঙ্কা জানায় অধিদফতর। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট বিধ্বংসী রূপ দেখায়। ছড়িয়ে পরে পুরো দেশে।

 

রেকর্ড ভাঙা জুন-জুলাই

৪-৫ জুলাই পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান ১৬৪ জন। যা কিনা সেদিন পর্যন্ত ছিল মহামারিকালে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু। এ সময়ে নতুন করে শনাক্ত হয়েছিলেন ৯ হাজার ৯৬৪ জন। একদিনে এত মৃত্যু আর শনাক্তের এ রূপ আগে দেখেনি বাংলাদেশ। তার আগের ২৪ ঘণ্টাতেও ১৫৩ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে মৃত্যুর রেকর্ড ভাঙে ওই সময়।

১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার অর্থাৎ করোনাভাইরাসে এক হাজার লোকের মৃত্যু হতে সময় লেগেছিল মাত্র ৮ দিন।

৩০ জুনেই আট হাজার ৮২২ জন শনাক্ত হওয়ার খবর জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর, যা কিনা আজকের আগে ছিল সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত।

ওই আট দিনে রোগী শনাক্ত হন ৬১ হাজার ৭৭৯ জন। এত কম সময়ে এত রোগীও আর শনাক্ত হয়নি তার আগের ১৬ মাসের মহামারিকালে।

 

ভয়ংকর আগস্ট

প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, লঞ্চে ও ফেরিতে গাদাগাদি করে গ্রামে গিয়ে ঈদ করেছিল মানুষ। ঈদের পরের কয়েকদিনে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই আবার দলবেঁধে ঢাকায় ফিরেছে মানুষ। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলেছিলেন, সংক্রমণের ‘পিক টাইম’-এ এমন কাণ্ড আরও খারাপ অবস্থায় নিয়ে যাবে।

সেটাই সত্যি হয় আগস্টে। ঈদের পর থেকে দৈনিক রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুর একের পর এক রেকর্ড দেখেছে বাংলাদেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় যেসব দেশে দৈনিক শনাক্ত ও মৃত্যু সবচেয়ে বেশি হচ্ছিল, সেই তালিকায় অষ্টম স্থানে চলে যায় বাংলাদেশ।

অবশেষে আগস্টের শেষ দিকে সংক্রমণ কমে শনাক্তের হার নেমে আসে ১ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু বছর শেষে নতুন ত্রাসের জন্ম দেয় করোনার অতিসংক্রমণশীল ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন। ডেল্টার তুলনায় পাঁচ-ছয়গুণ বেশি সংক্রমণ ক্ষমতা নিয়ে ওমিক্রন ছড়াতে থাকে বাতাসের গতিতে।

 

প্রথম ওমিক্রন

গত ১১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের দুই জন সদস্য করোনাভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনে শনাক্ত হয়েছেন বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। এই ক্রিকেট দলের সদস্যরা জিম্বাবুয়ে সফর শেষে দেশে ফেরেন। তাদের আইসোলেশনে রাখা হয়। তবে এরপর থেকে ধীরে ধীরে ওমিক্রনের প্রভাব বাড়তে থাকে।

তিন মাসের শনাক্তের তুলনা

ওমিক্রন সুনামি জানুয়ারিতে

শুরুর দিকে যারা ওমিক্রনে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হন, তাদের সবাই ছিলেন ঢাকার বাসিন্দা। এরপর দেশজুড়ে রোগী বাড়তে থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবে দেখা যায়, ১২ জানুয়ারি সরকারি হিসাবে শনাক্ত রোগী ১৬ লাখ ছাড়ায়। অধিদফতর জানায়, আগের সপ্তাহের তুলনায় এই সপ্তাহে শনাক্ত বেড়েছে প্রায় ২০০ শতাংশ। এর ১৩ দিন পর ২৫ জানুয়ারি ছাড়িয়ে যায় ১৭ লাখ।

আর গত ২৮ জানুয়ারি মহামারিকালে সর্বোচ্চ রোগী শনাক্তের আগের রেকর্ড ভেঙে যায়। সেদিন শনাক্তের হার হয় ৩৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এর ঠিক সাত দিন পর ১ ফেব্রুয়ারিতে রোগী ছাড়ায় ১৮ লাখ।

২০২১ সালের জানুয়ারিতে যেখানে শনাক্ত হয়েছিলেন ২১ হাজার ৬২৯ জন, সেখানে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে শনাক্ত হন দুই লাখ ১৩ হাজার ২৯৪ জন। আর জানুয়ারির মোট শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা গত বছরের ডেল্টার সময়ের জুনকেও ছাড়িয়ে যায়। গত বছরের জুনে ডেল্টা তাণ্ডবে শনাক্ত হয়েছিল এক লাখ ১২ হাজার ৭১৮ জন।

জানুয়ারিতে সংক্রমণ ফের বেড়ে যাওয়ায় ২১ জানুয়ারিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২২ ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে আবারও শ্রেণি পাঠদান শুরু হয়।

 

৫৪৩ দিন পর খোলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

সংক্রমণ কমে আসায় ৫৪৩ দিন পর অর্থাৎ প্রায় দীর্ঘ দেড় বছর পর শ্রেণিকক্ষের দ্বার খোলা হয় ২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। তার আগের বছরের ১৭ মার্চ থেকে দেশের সবধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। সংক্রমণ কিছুটা কমে আসায় প্রথম ধাপে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সব স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার কথা জানায়।

 

অবশেষে স্বস্তি

ধীরে ধীরে ওমিক্রন সুনামিও স্তিমিত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, বর্তমানে করোনার স্বাভাবিক পরিস্থিতির কাছাকাছি রয়েছে বাংলাদেশ। তা সত্ত্বেও সবাইকে মাস্ক পরতে হবে, মেনে চলতে হবে স্বাস্থ্যবিধি।

এখনই মাস্ক খুলে ফেলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি জানিয়ে অধিদফতর জানাচ্ছে, ভাইরাসের মিউটেশন হচ্ছে। ভাইরাসের বিবর্তন এখনও হতে পারে। আবার নতুন করে কোনও ভ্যারিয়েন্ট আসবে কিনা সে শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।