বাড়ছে ডেঙ্গু: রোগী ও মৃত্যু বেশি ঢাকা দক্ষিণে

ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গত শুক্রবার (৬ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত দেড়টায় মারা গেছেন ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মারুফ। রাজধানীর পান্থপথে একটি বেসরকারি হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। নাজমুল তেজগাঁও কলেজের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার্থী ছিলেন। এই তরুণের মৃত্যুতে তার পরিবার এখন দিশেহারা।  

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এই বছর এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৯৭ জন। এখন পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ভর্তি হয়েছেন ১৬ হাজার ২৮৫ জন। গত বছরের একই সময়ের ভেতর (৯ সেপ্টেম্বর) ডেঙ্গুতে মারা গিয়েছিলেন ৭১৬ জন এবং আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৩৫ জন। সেই তুলনায় বর্তমানে ডেঙ্গু রোগী অনেক কম।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, গত বছর এযাবৎকালের সর্বাধিক ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়। তবে তখন রোগী বেশি ছিল মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ বছর জানুয়ারিতেই হাজারের বেশি রোগী পাওয়া গেছে যা আগে কখনও পাওয়া যায়নি।

হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের ওয়ার্ড (ফাইল ছবি)

২০২১ সালের জানুয়ারিতে রোগী ছিল ৩২ জন। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে রোগী পাওয়া যায় ১২৬ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, এ বছরের জানুয়ারিতে মারা গেছেন ১৪ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩ জন এবং মার্চে ৫ জন। গত বছরের জানুয়ারিতে মারা যান ৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩ জন এবং মার্চে কোনও মৃত্যু ছিল না।

২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ডেঙ্গুতে কেউ মারা যায়নি। তার আগে ২০২১ সালেও এই সময়ের মধ্যে এই রোগে মৃত্যুর কোনও ঘটনা ঘটেনি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, গত বছর (২০২৩ সাল) জুলাই থেকে রোগী বাড়তে শুরু করে। জুলাইয়ে ৪৩ হাজার ৮৫৪ জন, আগস্টে ৭১ হাজার ৯৭৬ জন এবং সেপ্টেম্বরে ২১ হাজার ৫২৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। সেই তুলনায় এই বছর রোগী কম পাওয়া যাচ্ছে।

২৫ শতাংশ রোগী ডিএসসিসি এলাকায়

তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, এই বছরের আক্রান্ত রোগীদের বেশিরভাগই ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার। এই বছরের ১ জানুয়ারি থেকে প্রাপ্ত রোগীর প্রায় ২৫ শতাংশ রোগী ঢাকা দক্ষিণের। আর মোট মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি এই এলাকায়। তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত মোট মৃত্যু ৯৬ জনের মধ্যে ৫৮ জনই ডিএসসিসি এলাকায় মারা গেছেন। আর রোগী পাওয়া গেছে ৪ হাজার ২০১ জন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় রোগী পাওয়া গেছে ২ হাজার ৭৬৭ জন এবং মারা গেছেন ৮ জন। 

একদিনে রেকর্ড সংখ্যক রোগী

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৬১৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে মারা গেছেন ১ জন।

সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, এ বছর এই প্রথম একদিনে এত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলেন। ভর্তি রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী আছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায়। এখানে ১৭৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৩৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)

সিটি করপোরেশনের বাইরের রোগী

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি রোগী আছে চট্টগ্রাম বিভাগে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় এখন পর্যন্ত ৪৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। আর সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে রোগী ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ৩০০ জন।

এছাড়া বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ১ হাজার ৬৯৪ জন, খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ১ হাজার ১৫১ জন, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ৩১২ জন, রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ১৭৮ জন এবং রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ৫০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

মশা কমানোর তাগিদ  

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ডেঙ্গু চিকিৎসায় রোগীর ব্যবস্থাপনা ভালো থাকলে মৃত্যু কম হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মশা কমানো বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। গত বছর দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডেঙ্গু ছড়িয়েছে। সেখানে বেশির ভাগ রোগী প্রথমবারের মতো আক্রান্ত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এবার যদি ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তাহলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ দ্বিতীয়বারের মতো আক্রান্ত হবে। আবার নতুন নতুন রোগীও আক্রান্ত হতে পারে।

তার মতে, প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় পরিচ্ছন্ন অভিযান চালাতে হবে। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর কিংবা জনপ্রতিনিধিদের এখানে সম্পৃক্ত করতে হবে। কাজটি প্রতিদিন করতে হবে, একদিন করেই বসে থাকলে হবে না। এটি জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া সম্ভব না। সিটি করপোরেশনের কাছে এত জনবল নেই। একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দাঁড় করাতে হবে। সেটি মানুষকে সম্পৃক্ত করে করা সম্ভব।

এডিস মশা (ছবি: সংগৃহীত)

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পূর্ব প্রস্তুতি প্রয়োজন সব সময়। আমি দুই মাস আগেও বলেছিলাম এই মৌসুমে ডেঙ্গু বাড়বে। এখন ডেঙ্গু আগামী কয়েকদিন আরও বাড়বে। এই মুহূর্তে সিটি করপোরেশনের জোরেসোরে কাজ করা দরকার। হট স্পট ম্যানেজমেন্ট, লার্ভা ম্যানেজমেন্ট, লার্ভা সোর্স ম্যানেজমেন্ট– এই তিনটা বিষয়ে এখন গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করতে হবে। এই তিনটি কাজ এখন জোরেসোরে আমাদের করতে হবে। লোকবল কম থাকলে প্রয়োজনে অন্য জায়গা থেকে লোক এনে এই কাজ গুলো করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে মশা নিধন কার্যক্রম কিছুটা স্থবির হয়ে আছে। তবে হাসপাতালগুলো প্রস্তুত করা আছে। আলাদা ডেঙ্গু ডেডিকেটেড ইউনিট তৈরি রাখতে বলা হয়েছে।