টিকা যেকোনও সময়ের চেয়ে এখন কেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ  

২০২৬ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন যাত্রায় একটি বড় মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে। তবে এই অগ্রগতির সমান্তরালে টিকা অর্থায়নের ক্ষেত্রেও দেশটিকে এখন এক কঠিন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। বিদেশি অনুদান সংকুচিত হয়ে আসা এবং নিজস্ব অর্থায়নের বাধ্যবাধকতা বৃদ্ধি আমাদের উন্নয়ন যাত্রার সাফল্যের পরিচায়ক হলেও, এটি জনস্বাস্থ্য খাতে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকিও তৈরি করেছে। 

এই পরিবর্তনের সময় সবচেয়ে উপেক্ষিত ঝুঁকিগুলোর একটি হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর)। টিকা অর্থায়নের আলোচনায় প্রায়ই কেবল দামের বিষয়টি প্রাধান্য পায়, কিন্তু টিকা শুধু শিশুদের স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ নয়। অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমাতে, ওষুধ-প্রতিরোধী সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে এবং রেজিস্ট্যান্সের বিস্তার ধীর করতে টিকা হলো অন্যতম শক্তিশালী আগাম হাতিয়ার। 

বাংলাদেশে এএমআর-এর বোঝা ইতোমধ্যেই অনেক বেশি 

২০২১ সালের একটি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৯৬,৮৭৮টি মৃত্যু এএমআর-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং ২৩,৪৫৪টি মৃত্যু সরাসরি এর কারণে ঘটেছিল। এই পরিসংখ্যান এএমআর-কে দেশের বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। 

একই সময়ে, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ব্যাপকভাবে রয়ে গেছে। তথ্যপ্রমাণ বলছে, প্রায় অর্ধেক অ্যান্টিবায়োটিক কোনও প্রেসক্রিপশন ছাড়াই কেনা হয়। এছাড়া বাংলাদেশের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ধরন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ওয়াচ’ এবং ‘রিজার্ভ’ ক্যাটাগরির ওষুধের দিকে বেশি ঝুঁকে আছে— যেসব অ্যান্টিবায়োটিক মূলত তাদের কার্যকারিতা টিকিয়ে রাখার জন্য খুব সীমিতভাবে ব্যবহার করা উচিত। 

ঠিক এই কারণেই, আর্থিক সংকটের দোহাই দিয়ে টিকাদান কর্মসূচিকে কোনও ঐচ্ছিক খাত হিসেবে দেখার সুযোগ বাংলাদেশের নেই। 

টিকা: সংক্রমণ কমায় ও অ্যান্টিবায়োটিকের চাহিদা কমায় 

টিকা এবং এএমআর-এর সম্পর্কটি অত্যন্ত সহজ— যখন টিকা সংক্রমণ প্রতিরোধ করে, তখন অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। এটি অপ্রয়োজনীয় প্রেসক্রিপশন বন্ধ করে, হাসপাতালে ভর্তির হার কমায় এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের সংস্পর্শে আসার মাত্রা কমিয়ে দেয়, যা মূলত রেজিস্ট্যান্স তৈরি হওয়ার মূল কারণ। 

বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) দীর্ঘকাল ধরে দেশটির জনস্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় সাফল্য। এটি নবজাতকের ধনুষ্টংকার নির্মূল (২০০৮), পোলিও নির্মূল (২০১৪) এবং শিশুমৃত্যুর হার ব্যাপকভাবে কমানোতে অবদান রেখেছে। 

টিকাকে এখন আর কেবল রোগ প্রতিরোধের উপায় হিসেবে দেখলে চলবে না, একে এএমআর ঠেকানোর প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করতে হবে। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে, যেখানে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যায় এবং সঠিক রোগ নির্ণয়ের সুযোগ সবখানে সমান নয়, সেখানে টিকার গুরুত্ব অপরিসীম। 

প্রমাণগুলো ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে যে, যেসব রোগ টিকার মাধ্যমে ঠেকানো সম্ভব, সেই রোগগুলোর কারণেই আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ, টিকাদানের হার বাড়লে সরাসরি অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর চাপ কমে আসবে। 

নিউমোকোকাল রোগ এবং শিশুদের ডায়রিয়া এর দুটি বড় উদাহরণ। হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২৪-৫৯ মাস বয়সী প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে প্রায় ২০ জন নিউমোকোকাল রোগে এবং ২৮ জন তীব্র ওটিটিস মিডিয়াতে (কানের সংক্রমণ) আক্রান্ত হয় যাদের অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। নিউমোকোকাল কনজুগেট ভ্যাকসিনের (পিসিভি) সরাসরি প্রয়োগ এই আক্রান্তের একটি বড় অংশ প্রতিরোধ করতে পারে। 

একইভাবে, রোটাভাইরাস (যা এখনো বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত নয়) দুই বছরের কম বয়সী প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে ১৩টিরও বেশি অ্যান্টিবায়োটিক-নির্ভর ডায়রিয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। টিকার মাধ্যমে এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। 

টিকার এই সুফলগুলো কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়। যখনই আমরা একটি রোগ প্রতিরোধ করি, তখনই একটি অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের হাত থেকে রক্ষা পাই। এভাবে প্রতিটি অ্যান্টিবায়োটিক ডোজ কমানোর মাধ্যমেই আমরা রেজিস্ট্যান্সের মহাবিপদকে রুখে দেওয়ার দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাই। 

টাইফয়েড টিকা: পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র 

টাইফয়েডের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ে নতুন মাইলফলক হলো টিসিভি টিকা। ২০২৫ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ৯ মাস থেকে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের অন্তত ৯৫ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা। 

টাইফয়েড কেবল দারিদ্র্য বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের রোগ নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অ্যান্টিবায়োটিক-নির্ভর সংক্রমণ। ক্রমবর্ধমান রেজিস্ট্যান্স এর চিকিৎসাকে দিন দিন ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত করে তুলছে। এটি প্রমাণ করে যে, টাইফয়েডের টিকা কেবল একটি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নয়, বরং এটি এএমআর মোকাবিলার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। 

মডেলিং বা গাণিতিক বিশ্লেষণ বলছে, আগামী ১০ বছর শিশুদের নিয়মিত টাইফয়েড টিকা দিলে আমরা লাখ লাখ মানুষকে ওষুধ-প্রতিরোধী টাইফয়েডের হাত থেকে বাঁচাতে পারবো। এটি কেবল জীবনই বাঁচাবে না, বরং জনস্বাস্থ্যের ওপর রোগের দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাবও কমিয়ে আনবে। 

তবে কেবল ক্যাম্পেইনই যথেষ্ট নয়। টাইফয়েড টিকার দীর্ঘমেয়াদী এএমআর সুবিধা নির্ভর করে নিয়মিত টিকাদানের ওপর, যার জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল অর্থায়ন। 

উত্তরণকালীন ঝুঁকি 

টিকা অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনও হঠাৎ ধসের মুখে পড়ছে না, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। বিদেশি অনুদান কমে আসা এবং টিকার দামের বড় অংশ নিজেদের তহবিল থেকে দেওয়ার যে বাধ্যবাধকতা তৈরি হচ্ছে, তা আমাদের জাতীয় বাজেটের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করবে। এই পরিবর্তনটি মোকাবিলা করাই এখন আমাদের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ। 

কিছু পদক্ষেপ হয়তো দামের আকস্মিক ধাক্কা কমাতে সাহায্য করবে (যেমন দরকষাকষির মাধ্যমে কম দামে টিকা পাওয়ার সুযোগ বজায় রাখা), তবে আর্থিক চাপটি বাস্তব। 

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এটি নয় যে বাংলাদেশ টিকা কেনা বন্ধ করে দেবে; বরং ঝুঁকি হলো টিকাদান কর্মসূচির ‘অদৃশ্য’ অংশগুলো যেমন কোল্ড-চেইন রক্ষণাবেক্ষণ, আউটরিচ পরিষেবা, স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা এবং বস্তি ও দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে টিকা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাগুলো দুর্বল হয়ে যেতে পারে। 

এগুলো এমন জায়গা যেখানে নিঃশব্দে অবনতি ঘটতে পারে এবং সেই সঙ্গে এএমআর-এর বোঝা আরও বাড়তে পারে। 

যে সুযোগ কাজে লাগাতে পারে বাংলাদেশ 

আমাদের এই অর্জনকে একটি বড় সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের অর্থ এই নয় যে আমরা টিকা দেওয়া কমিয়ে দেবো। বরং এখন সময় এসেছে টিকাকে কেবল একটি জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি হিসেবে না দেখে, একে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য-নিরাপত্তার একটি অবিচ্ছেদ্য কৌশল হিসেবে গড়ে তোলার। 

আইসিডিডিআর,বি, স্বাস্থ্য অধিদফতর, আইইডিসিআর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত গ্লোবাল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স পার্টনারশিপ (জিএআরপি) বাংলাদেশ টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপের একটি সাম্প্রতিক নীতি-পত্রে এএমআর হ্রাসে টিকাকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কিছু ব্যবহারিক দিক তুলে ধরা হয়েছে।

আমরা এখানে কিছু জরুরি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করছি— 

প্রথমত, নিয়মিত শিশু টিকাদানের শতভাগ হার বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে আর্থিক চাপ যেন কোনোভাবেই টিকাদানের হারে ঘাটতি তৈরি না করে।

দ্বিতীয়ত, যেসব টিকা অ্যান্টিবায়োটিক-নির্ভর অসুস্থতা কমায় (যেমন রোটাভাইরাস এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা), সেগুলোর অন্তর্ভুক্তি ও প্রয়োগ দ্রুততর করতে হবে এবং পিসিভি ও টিসিভি-র মতো উচ্চ-প্রভাবশালী টিকার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।

তৃতীয়ত, এএমআর-এর সঙ্গে সম্পর্কিত নতুন টিকাগুলোর দ্রুত অনুমোদন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে নীতিগত পথ প্রশস্ত করতে হবে এবং নিয়মিতভাবে টিকাদানের নির্দেশিকা আপডেট করতে হবে। 

পরিশেষে, আমাদের এখন নিজস্ব তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার দিকে নজর দিতে হবে। টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা গবেষণায় এএমআর-এর তথ্য যুক্ত করা জরুরি, যাতে আমরা কেবল বিদেশের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে আমাদের দেশের মানুষের ওপর টিকার সুনির্দিষ্ট কার্যকারিতা তুলে ধরতে পারি। 

বাংলাদেশ যখন এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি সহজ— টিকা কেবল রোগ প্রতিরোধের জন্য নয়। এটি এমন একটি ভবিষ্যৎ প্রতিরোধের জন্য যেখানে (খুব সম্ভবত) অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করবে না।

যে দেশে প্রতি বছর এএমআর-এর কারণে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটছে, সেখানে টিকাদান কর্মসূচি কেবল বজায় রাখার মতো কোনও স্বাস্থ্য কর্মসূচি নয়, বরং এটি একটি জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল যা যেকোনও মূল্যে রক্ষা করতে হবে। 

লেখক: ঋষিরাজ ভগবতী, সিনিয়র রিসার্চ অ্যানালিস্ট, ওয়ান হেলথ ট্রাস্ট; ইমেইল: rbhagawati@onehealthtrust.org ও 

ড. ওয়াসিফ আলি খান, ইমেরিটাস সায়েন্টিস্ট, ইনফেকসাস ডিজিজেস ডিভিশন, আইসিডিডিআর,বি; ইমেইল: wakhan@icddrb.org