সারা দেশে হামের সংক্রমণে এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসছে। হাসপাতাল থেকে আংশিক সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার কয়েক দিন পরই শিশুরা ফের অসুস্থ হয়ে পড়ছে এবং আবারও হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, পূর্ণ সুস্থ হওয়ার আগেই হাসপাতাল ত্যাগ এবং পরবর্তীতে সঠিক যত্নের অভাবেই নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও পুষ্টিহীনতার মতো জটিলতা বাড়ছে।
রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাজারীবাগের বাসিন্দা খাদিজার সাত মাস বয়সী শিশু আরিয়ান হাসপাতালের করিডোরে একটি বেডে চিকিৎসাধীন। খাদিজা জানান, ঈদের দুই দিন আগে আরিয়ানের হাম ও নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। তখন লক্ষণ মৃদু থাকায় তিন দিনের ওষুধ দিয়ে তাকে ছুটি দেওয়া হয়। কিন্তু বাড়ি ফেরার তিন দিন পরই তার অবস্থার অবনতি ঘটে। বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে বর্তমানে সে আবারও এই হাসপাতালে ভর্তি। অনবরত কাশি আর শ্বাসকষ্টে শিশুটি এখন এতটাই দুর্বল যে কিছুই খেতে পারছে না। ওয়ার্ডে বেড খালি না থাকায় করিডোরেই চলছে তার চিকিৎসা।
একই চিত্র দেখা গেছে ডিএনসিসি হসপিটালে। সেখানে ১৭ মাস বয়সী শিশু রাফসান আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন। নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ঢাকা মেডিক্যাল ঘুরে এখানে ভর্তি হওয়া এই শিশুটি একবার সুস্থ হয়ে বাড়ি গেলেও ফের নিউমোনিয়া ও জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এ আসমা খান বলেন, “জ্বর কমলেই রোগীকে বাড়ি পাঠানো ঠিক নয়। শিশু পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাকে ছাড়পত্র দেওয়া উচিত নয়।” তিনি ব্যাখ্যা করেন যে হামের সময় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে ফুসফুসে সংক্রমণ হয়ে নিউমোনিয়া হতে পারে। এছাড়া চোখের জটিলতা থেকে অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে। এজন্যই হামের রোগীদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল দেওয়া জরুরি।
তিনি আরও জানান, হামের সময় মুখে ঘা হওয়ার কারণে শিশুরা খেতে পারে না, যা তাদের আরও দুর্বল করে দেয়। এই সময়ে শিশুকে মায়ের দুধের পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার যেমন—কলা, পেঁপে, গাজর, মাছ ও সবজি জাতীয় সুপ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী জানান, একবার হাম হলে সাধারণত দ্বিতীয়বার হয় না। তবে হাম শরীরকে এতটাই দুর্বল করে দেয় যে অন্য কোনও ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সহজে আক্রমণ করতে পারে। অনেক সময় শরীরের র্যাশ বা লালচে দানা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে, তাই ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত হওয়া কঠিন। তিনি সুস্থ হওয়ার পর শিশুকে নিয়মিত রোদে নেওয়া এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১২,৩২০ জন সম্ভাব্য হামে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্তের সংখ্যা ২,২৪১। এই সময়ে মোট ১৪৩ জন মারা গেছেন (সম্ভাব্য ও নিশ্চিতসহ)। একই দিন ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১,১৮৭ জন সম্ভাব্য রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ৭ জনের।
ডিএনসিসি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আসিফ হায়দার জানান, তাদের ৩০০ বেডের আইসোলেশন ওয়ার্ডে বর্তমানে ২৮০ জন ভর্তি রয়েছেন, যার মধ্যে ৩৭ জন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।
চিকিৎসকরা জোর দিয়ে বলছেন, শিশুদের অকাল মৃত্যু এবং দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্ব রোধে হামের পূর্ণ চিকিৎসা এবং হাসপাতাল থেকে ফেরার পর সঠিক পুষ্টি ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।