“আমার মেয়েটা রাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতো, আমি ওকে বুকে নিয়ে ঘুমাতাম। এখন আমার আর ঘুম আসে না। শুধু মনে হয়— আমার মেয়েটা কী করছে? ও কি একা একা ভয় পাচ্ছে?” কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন জাকিয়া। এক শোকাতুর মায়ের বিলাপ আর আর্তনাদে যেন বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, “ঘুম থেকে উঠে আমাকে না দেখলে জান্নাত চিৎকার করে খুঁজতো। এখন তো আর আমাকে কেউ খোঁজে না— আমার জান্নাত আমাদের ছেড়ে চলে গেলো, আমার বুকটা একেবারে খালি হয়ে গেছে।”
মাত্র আট মাস পূর্ণ হওয়ার ঠিক একদিন আগে, ১৩ তারিখ বিকাল চারটায় ঢাকার মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ছোট্ট জান্নাত। হামে আক্রান্ত হওয়ার পর নিউমোনিয়ার জটিলতা— সবশেষে লড়াইয়ে হেরে যায় তার জান্নাত। অথচ পরদিন তার আট মাস পূর্ণ হওয়ার খুশিতে বাড়িতে উৎসবের আমেজ থাকার কথা ছিল; তার বদলে এখন সেখানে শুধুই বুকফাটা হাহাকার।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ঘর আলো করে এসেছিল জান্নাত
জাকিয়া ও রোমান পাঠান দম্পতির একমাত্র সন্তান ছিল জান্নাত। আড়াই বছর আগে বিয়ের পর প্রথম সন্তানকে চার মাস গর্ভাবস্থায় হারিয়েছিলেন তারা। সেই শোক কাটিয়ে অনেক চিকিৎসা, মানত আর প্রার্থনার পর জান্নাত তাদের ঘর আলো করে এসেছিল। ফুটফুটে সুন্দর অবয়ব, বড় বড় চোখ, মিষ্টি চেহারার জান্নাত ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল। মা-বাবার জীবন ভরে উঠছিল তার হাসিতে।
মা জাকিয়া বলেন, “ওকে পৃথিবীতে আনতে কত কষ্ট করেছি, কত টাকা খরচ করেছি, শুধু যেন আমার মেয়েটা সুস্থ থাকে। ও একটু একটু করে ডাকতে শিখছিল, বাবাকে দেখলে হাত বাড়িয়ে দিতো।” বাবা রোমান বলেন, “জান্নাত ‘বাবা’ বলতে পারতো না, কিন্তু বলার চেষ্টা করতো।”
হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে ছোটাছুটি
মাসখানেক আগে জান্নাত হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে তাকে আড়াইহাজার ও পরে মাতুয়াইল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ১৫ দিন চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও আবারও শুরু হয় জ্বর, ঠান্ডা ও কাশি। এবার ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান— জান্নাতের হাম হয়েছে, সঙ্গে নিউমোনিয়া। কিন্তু সিট না থাকায় তারা ভর্তি নেয়নি। সেখান থেকে পাঠানো হয় ঢাকা শিশু হাসপাতালে।
শিশু হাসপাতালেও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি। জান্নাতের বাবা রোমান বলেন, “আমি ডাক্তারদের পায়ে ধরে বলেছি, আমার মেয়েটাকে ভর্তি নেন। আমরা গ্রাম থেকে আসছি, এত বড় হাসপাতাল, আপনারা না রাখলে কোথায় যাবো? কিন্তু তারা ভর্তি নিলো না।”
শেষ পর্যন্ত ৯ এপ্রিল সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে মেঝেতে ঠাঁই হয় জান্নাতের। শিশুটির বাবা বলেন, “আমাকে বলা হয়েছিল সিট নাই। আমি বলেছি, আমার মেয়ের চিকিৎসা দরকার, মাটিতে হলেও করাবো।”
অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার অভিযোগ
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তির পর প্রথম দিন চিকিৎসা শুরু হলে কিছুটা স্বস্তি পান তারা। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। শুক্রবার থেকে জান্নাতের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। মুখে নল দিয়ে অক্সিজেন দেওয়া হয়।
মা জাকিয়ার অভিযোগ, চিকিৎসকদের নিষেধ থাকায় ক্ষুধার্ত মেয়েটাকে শেষ দিনগুলোতে কিছুই খাওয়াতে পারেননি তিনি। মা বলেন, “আমি ভয়ে কিছুই দেইনি, শুধু ওষুধ খাওয়াতাম। আমার মেয়েটা অনেক কষ্ট করে গেছে।”
এদিকে বাবার অভিযোগ আরও গুরুতর। তিনি জানান, হাসপাতালের নার্সরা নিজেরা অক্সিজেন মাস্ক না লাগিয়ে অভিভাবকদেরই লাগিয়ে দিতে বলতেন। এছাড়া অক্সিজেন মাপার যন্ত্রটি নিয়েও তাদের সন্দেহ ছিল, কারণ সেটি একেকবার একেক রিডিং দেখাচ্ছিল।
“নার্সরা বলেছিল কোনো খাবার দিতে পারবো না… আমার মেয়েটা খেতে চাইত… মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতো… কিন্তু আমি ভয়ে কিছুই দেইনি… শুধু ওষুধ খাওয়াতাম… আমার মেয়েটা অনেক কষ্ট করে গেছে…”
সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয় আইসিইউ নিয়ে। রোমান পাঠান বলেন, “আমি বারবার আইসিইউর কথা বললেও তারা গুরুত্ব দেননি। তারা বলেছিলেন, দরকার হলে তারাই দেবেন।”
শেষ মুহূর্তের হাহাকার
সোমবার জান্নাতের খিঁচুনি ও শ্বাসকষ্ট তীব্র হলে একজন সিনিয়র চিকিৎসক এসে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “এই বাচ্চা এখানে কেন? ওর তো আইসিইউ দরকার ছিল!” এরপর পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের অক্সিজেন মাপার বড় মেশিনটিও নষ্ট। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
জান্নাতের মা সেই করুণ মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “মারা যাওয়ার আগে ও হাত বাড়িয়ে দিচ্ছিল— একবার বাবার দিকে, একবার আমার দিকে। আমি বললাম, মা তোমাকে আদর করবো। ও হাতটা আরও বাড়িয়ে দিলো, আমি জড়িয়ে ধরলাম। কিছুক্ষণ পরই আমার কলিজার টুকরাটা নিথর হয়ে গেলো।”
বাবার ভাষায়, “আমি বাসায় এসে ‘জান্নাত’ বলে ডাক দিলে ও ঘুরে ঘুরে আমাকে খুঁজতো, আমি কোলে নিলে কপালে চুমু দিতো, এখন আর কেউ ডাকে না।”
মায়ের অভিযোগ, “আমি জীবিত মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে গেছিলাম, কিন্তু ফিরলাম লাশ নিয়ে। আমার কলিজার টুকরাটাকে বাঁচাইতে পারলাম না।” তিনি বলেন, “মারা যাওয়ার পর আমার মেয়েটাকে এত সুন্দর লাগছিল। দেখে মনে হচ্ছিল একদম সুস্থ একটা বাচ্চা শুয়ে আছে।”
হামের মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে এভাবেই পরিবারের একমাত্র স্বপ্ন, মায়ের বুকের ধন হারিয়ে গেলো। আর রেখে গেল অসীম শূন্যতা— যা কোনোদিন পূরণ হবে না।