সারা দেশে কর্মবিরতি পালন করছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। ছয় দফা দাবিতে এই কর্মবিরতির ডাক দেন তারা। তাদের কর্মবিরতিতে বিভিন্ন হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, সাধারণ মানুষের জীবন বাজি রেখে কি জরুরি সেবার বিঘ্ন ঘটানো যায়?
ছয় দফা দাবিতে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। বুধবার (৭ জুন) সকাল থেকে এ কর্মসূচি শুরু করেন তারা। দাবি আদায়ে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেছেন মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। সব শিক্ষা ও সেবা কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন মেডিক্যালের নবীন চিকিৎসকরা।
এর আগে শনিবার (৬ জুন) বাংলাদেশ সমন্বিত ইন্টার্ন চিকিৎসক ঐক্য পরিষদের এক বিবৃতিতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
চিকিৎসকরা বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্স (বিসিপিএস) প্রকাশিত একটি নোটিশের মাধ্যমে আমাদের ছয়টি দাবির মধ্যে প্রথম দাবির বিষয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করা হলেও বাকি দাবিগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে এখনও কোনও দৃশ্যমান পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে আমরা হতাশ হয়েছি।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ছয় দফা দাবি হলো— এফসিপিএস পার্ট-১ উত্তীর্ণ বেসরকারি প্রশিক্ষণার্থীদের পদায়নের নীতিমালা সংক্রান্ত কমিটির প্রস্তাবনা বাতিল, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) এবং বিসিপিএস ভর্তি পরীক্ষার ফি কমিয়ে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে আনা, নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী ইন্টার্নদের ভাতা ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা ও ট্রেইনিদের নবম গ্রেডে নির্ধারণ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, বিসিএস স্বাস্থ্য চাকরিতে প্রবেশের বয়সীমা ৩৪ বছর করা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য শ্রম আইন ২০০৬ মেনে সুস্পষ্ট বেতন কাঠামো।
চিকিৎসকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে কর্মবিরতিতে যাওয়ায় নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। জনস্বাস্থ্যবিদ এবং চিকিৎসকরা বলছেন, জরুরি সেবা বন্ধ করে কর্মবিরতি একমাত্র পথ নয়। তবে তারা এও বলছেন, যেকোনও জরুরি খাতে হঠাৎ করে কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়া যায় না। এখন পর্যন্ত দেশে যারা সরকারের দায়িত্ব পালন করেছেন তারা কেউ জনমুখী স্বাস্থ্যসেবার কথা চিন্তা করেননি। ফলে চিকিৎসকরা বারবার ধর্মঘটের ডাক দিতে বাধ্য হন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, একাবারে কর্মবিরতিতে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করার আগে দেখতে হবে তারা আন্দোলনের কোন পর্যায়ে আছে। কথায় কথায় ধর্মঘটে যাওয়া আদৌ উচিত না। কিন্তু কর্তৃপক্ষকে নোটিস দেওয়া, দীর্ঘদিন দৃষ্টি আকর্ষণ করা, এগুলা ধাপে ধাপে করতে হয়। কর্মবিরতিতে গেলেও প্রাণহানি হয়, এমন জরুরি সেবা বন্ধ করা যাবে না। ওয়ার্ডে হোক কিংবা ইমারজেন্সি কাউকে না কাউকে রাখতে হবে। সেবা বন্ধ না করাই ভালো, তবে না পারতে হয়তো করতে হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নানাভাবে নানা মহলে আমরা একটি দাবি জানিয়ে আসছি স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন প্রণয়নের। এই আইনে তিনটি বিষয় স্পষ্ট থাকবে। প্রথমত, যারা সেবা নেবে তাদের অধিকার ও দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা। সেবাগ্রহীতার অধিকার রক্ষা করা হবে। যদি তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হয় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে। সেবাগ্রহীতা তার দায়িত্ব পালন না করলে সেটাও জবাবদিহির আওতায় আসবে। দ্বিতীয়ত, যারা সেবা দেবেন অর্থাৎ চিকিৎসক-নার্স ও সংশ্লিষ্ট সবার তাদের দায়দায়িত্ব আইনে নির্দিষ্ট করা থাকবে। যদি কোথাও তারা সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তাহলে তাদেরও আইনের মুখোমুখি হতে হবে। সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কেউ যদি তাদের অধিকার ভেঙে থাকেন, তাহলে তাদেরও আইনের মুখোমুখি করা হবে। তৃতীয়ত, সেবা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান হাসপাতাল ও অন্যান্য দায়দায়িত্ব কী, তাও নিরূপণ করতে হবে। এরকম একটি ভারসাম্যপূর্ণ আইন না থাকার কারণে চিকিৎসক, রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে এক ধরনের দ্বান্দ্বিক অবস্থান তৈরি হয়ে থাকে।
ডা. লেলিন বলেন, চিকিৎসক যখন তার বিরুদ্ধে সংঘটিত অন্যায়ের প্রতিকার পান না, তখন তারা ধর্মঘটের মতো কঠিন অবস্থানে যান। ধর্মঘটে যাওয়ার আগে কিছু নিয়ম মানতে হবে। প্রথমত তাদের দাবির কথা লিখিতভাবে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে এবং সমস্যা সমাধানের যৌক্তিক সময় দিতে হবে। যেকোনও জরুরি খাতে হঠাৎ করে কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়া যায় না। এখন পর্যন্ত দেশে যারা সরকারের দায়িত্ব পালন করেছেন তারা কেউ জনমুখী স্বাস্থ্যসেবার কথা চিন্তা করেননি। ফলে চিকিৎসকরা বারবার ধর্মঘটের ডাক দিতে বাধ্য হন।
চিকিৎসকদের কর্মবিরতিতে বিভিন্ন হাসপাতালে কথা বলে জানা গেছে, স্বাস্থ্য সেবা কিছুটা হলেও বিঘ্নিত হচ্ছে। যেসব জায়গা অত্যন্ত জরুরি সেখানে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে চিকিৎসকদের নিয়োজিত করা হচ্ছে। অনেক হাসপাতালে চিকিৎসক ও লোকবল কম থাকায় সেবা দিতে বেগ পেতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাকিব হোসেন বলেন, আমরা রোগীদের স্বার্থ বিবেচনা করে কর্মবিরতি পিছিয়েছিলাম। প্রশাসনকে শুরুতে ৪৮ ঘণ্টা ও পরে আরও ২৪ ঘণ্টা সময় দিয়েছি। আমাদের বাধ্য হয়ে কর্মবিরতি পালন করতে হচ্ছে।
তবে কর্মবিরতির মধ্যেও হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে দাবি করেন সাকিব হোসেন। তার ভাষ্য, ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা কর্মবিরতিতে থাকলেও ট্রেইনি চিকিৎসকরা দায়িত্ব পালন করছেন। এ কারণে জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগসহ হাসপাতালের অন্যান্য সেবা চালু রয়েছে।