রাজধানীর শ্যামলীতে অক্সিজেন লাইনে লিকেজের ঘটনায় এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠার পর সামনে এসেছে আরেক বিস্ময়কর তথ্য। যে ভবনে ঘটনাটি ঘটেছে, সেই ভবনের একই ফ্লোরে কাঁচের দেয়াল দিয়ে কক্ষ তৈরি করে পাশাপাশি চলছে তিনটি জেনারেল হাসপাতালের কার্যক্রম। এমন বাস্তবতায় হাসপাতাল পরিচালনার নিয়মকানুন ও তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, শ্যামলী বেবি কেয়ার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের পাশাপাশি একই ফ্লোরে রয়েছে হাইকেয়ার অর্থোপেডিক্স অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল এবং সিটি কেয়ার জেনারেল হাসপাতালের একটি ওয়ার্ড।
রাজধানীর শ্যামলীর মিরপুর রোডের পাশে ‘রূপায়ণ শেলফোর্ড’ নামের একটি ২০ তলা ভবনের সপ্তম তলায় অবস্থিত এই তিন হাসপাতালের একটি ‘শ্যামলী বেবি কেয়ার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে’ মঙ্গলবার এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে গাদাগাদি করে হাসপাতাল অনুমোদনে সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। আর অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, অনুমোদন দেওয়ার দায়িত্ব সিটি করপোরেশন বা রাজউকের। তবে একবার কার্যক্রম শুরু করলে এসব হাসপাতাল বন্ধ করাও তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে ওঠে।
তিন হাসপাতাল কীভাবে চলছে
সরেজমিন ভবনের লিফটে সপ্তম তলায় নামলে চোখে পড়ে শ্যামলী বেবি কেয়ার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের কাচের দরজা। দরজা দিয়ে ভেতরে গেলে সামনেই হাসপাতালটির রিসেপশন। এর পাশে আরও একটি দরজা রয়েছে, যেটি ‘হাইকেয়ার অর্থোপেডিক্স অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল’ নামের আরেকটি হাসপাতালের। মাঝখানে কাচের দেয়াল দিয়েই দুটি হাসপাতাল। এর পাশেই রয়েছে অষ্টম তলার ‘সিটি কেয়ার জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের’ রোগীদের ওয়ার্ড। এর মধ্যে শ্যামলী বেবি কেয়ার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে কোনও রোগী না থাকলেও অন্য দুটি হাসপাতালে রোগী রয়েছে।
মঙ্গলবার বিকালে শ্যামলী বেবি কেয়ার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে ‘অক্সিজেনের লাইনে লিকেজের’ কারণে একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করে পরিবার। এরপর থেকে এই হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
কী হয়েছিল শ্যামলী বেবি কেয়ারে
হাসপাতালে ‘গ্যাস লিকেজ’ থেকে শিশু মৃত্যুর অভিযোগ এলেও হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টরা বলছেন ভিন্ন কথা। হাসপাতালটির রিসেপশনিস্ট সোহান শেখ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মঙ্গলবার যে ঘটনাটি ঘটে, সেখানে মোট ছয় জন শিশু রোগী ছিল। তাদের মধ্যে তিন জন হামের রোগী ছিল। যে শিশুটি মারা গেছে, সে-ও হামের রোগী ছিল। আগে থেকেই তার অবস্থা ছিল গুরুতর।
তিনি বলেন, হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহের জন্য একটি সিস্টেম ছিল, যেখানে চারটি লাইন ছিল—একটি ইমার্জেন্সি লাইনসহ মোট কয়েকটি অক্সিজেন লাইন ভাগ করা ছিল। এর মধ্যে একটি লাইনে লিকেজ (ছিদ্র) হয়। ফলে সেখানে শব্দ হয়, যা শুনে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। লিকেজের কারণে যে শব্দ হয়েছিল, তা মূলত অক্সিজেন লাইনের চাপের কারণে স্বাভাবিকভাবেই হতে পারে। এ ঘটনাকে কেউ কেউ ভুলভাবে ‘অক্সিজেন বোতল ব্লাস্ট’ বলে প্রচার করেছে, কিন্তু এখানে কোনও বোতল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেনি।
তিনি আরও বলেন, ওই শিশুটির অবস্থা আগে থেকেই খারাপ ছিল। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটির পূর্বের রিপোর্ট অনুযায়ী চিকিৎসা চলমান ছিল এবং সে গুরুতর অবস্থাতেই ভর্তি ছিল। ঘটনার সময় রোগীর অভিভাবকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে তাদের উপরের তলায় সিটি কেয়ার জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বাকি রোগীরা বর্তমানে মোটামুটি সুস্থ আছে বলে জানানো হয়েছে।
সোহান বলেন, এটি কোনও ধরনের অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার ঘটনা নয়, বরং একটি দুর্ঘটনা। ঘটনার পর হাসপাতালের কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে কোনও রোগী নেই; ছয় জন রোগীর সবাইকে স্থানান্তর করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। তারা আবারও পরিদর্শনে আসবেন বলে জানিয়েছে। আমাদের আগামী দুই-একদিনের মধ্যে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আবার কার্যক্রম চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে সে সময় কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে একই ফ্লোরে এমন একাধিক হাসপাতালের কার্যক্রম কীভাবে চলছে জানতে চাইলে সোহান শেখ বলেন, ‘একই ফ্লোরে একাধিক হাসপাতাল আছে এটা সত্য। তবে এগুলোর এনআইসিইউ ও অন্যান্য ইউনিট পরিচালিত হয় নির্দিষ্ট অন্য একটি ফ্লোরে।’
মৃত শিশুটির বাবার অভিযোগ
মৃত শিশু ফারিসের বাবা মো. ফারুক বলেন, আমাদের বাচ্চা আগে থেকেই নিউমোনিয়ার সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। চিকিৎসার পর বাচ্চার কিছুটা উন্নতি হচ্ছিল। আমরা নিজেরাও দেখেছি যে বিকাল পর্যন্ত, প্রায় ৫টার দিকে, বাচ্চা ভালো ছিল। পরে হঠাৎ করেই সন্ধ্যা ৬টার দিকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডারের লাইনে বা অন্য কোনও কারণে একটি শব্দ হয়। এরপর সবাই আতঙ্কিত হয়ে যায়। পরিবারের সবাই চিৎকার করতে থাকে, বাচ্চাদের বাইরে বের করতে বলে, কারণ তারা ভয় পেয়ে যায় যে কোনও দুর্ঘটনা ঘটেছে।
‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তখন বলে যে কিছু হয়নি, এটি শুধু অক্সিজেন লাইনের সমস্যা, পরে অন্য লাইনে অক্সিজেন সরবরাহ স্বাভাবিক করা হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর আবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হয় এবং বাচ্চাদের সপ্তম তলা থেকে অষ্টম তলায় শিফট করা হয়। আমাদের বাচ্চা ওই সময়ই সেখানে ছিল। পরে হঠাৎ করেই বাচ্চার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। আমার বাচ্চা মারা যায়’, যোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর আমরা থানায় গিয়ে জানাই। মোহাম্মদপুর থানা থেকে পুলিশ আসে এবং ডকুমেন্ট নেয়। সে সময় পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চায়, কিন্তু ওই সময় ফুটেজ দিতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পুলিশ একাধিকবার সিসিটিভি ফুটেজ চাইছিল, বিশেষ করে ঘটনার সময়কার ফুটেজ—কীভাবে শব্দ হলো বা কীভাবে পরিস্থিতি তৈরি হলো তা দেখতে। কিন্তু তখন তারা ফুটেজ দিতে পারেনি।’
ফারুক বলেন, ‘পরে পুলিশ বলে মামলা করলে পোস্টমর্টেম (ময়নাতদন্ত) করতে হবে। কিন্তু আমি আমার সাড়ে ৪ মাস বয়সী বাচ্চার ময়নাতদন্ত করতে রাজি হইনি। তাই আমি আর মামলা করার পথে যাইনি। রাত ১২টার দিকে আমরা হাসপাতাল থেকে রওনা দিই। বাচ্চাকে নিয়ে চলে আসি আমাদের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে।’
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান জানান, হাসপাতালটি পরিদর্শন করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে কোনও রোগী নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে বৃহস্পতিবার অধিদফতরে হাজির হতে বলা হয়েছে। তাদের বক্তব্য শোনার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেমন আছে অন্য শিশুরা
অক্সিজেনের লাইনে লিকেজের ঘটনার পর সব শিশুকে উপরের তলায় সিটি কেয়ার জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তাদের বর্তমান অবস্থা জানতে সেখানে গেলে হাসপাতালটির রিসেপশনে থাকা সাগর কুমার মোদক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওই ঘটনার পর আমাদের এখানে পাঁচ জনকে শিফট করা হয়েছিল। এর মধ্যে তিন জন আজ ছুটি নিয়ে চলে গেছে।’
শিশুদের কী সমস্যা ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাদের এনআইসিইউ সাপোর্ট লাগতো। তাদের মধ্যে দুজনের হামের সমস্যা ছিল। যে পাঁচ জন শিশু এখানে ছিল, তার মধ্যে তিন জন চলে গেছে। বাকি দুজন অনেকটা সুস্থ। হয়তো আমরা কাল বা পরশু তাদের ছুটি দিয়ে দেবো। তাদের অবস্থা এখন স্থিতিশীল’
যা বলছে অধিদফতর
একটি ভবনের একটি ফ্লোরে তিনটি জেনারেল হাসপাতাল করা যায় কিনা বা কার্যক্রম চালানো যায় কিনা এই বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসলে হাসপাতাল কোথায় হবে বা কোথায় হবে না—এই সিদ্ধান্ত আমরা নিই না। এ ধরনের সিদ্ধান্ত সাধারণত সিটি করপোরেশন ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার সময় বা পরিবেশ অধিদফতর ও রাজউকের সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ঢাকা শহরে কোথায় একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হবে, সে সিদ্ধান্ত মূলত সিটি করপোরেশন বা রাজউক নিয়ে থাকে। আমরা সাধারণত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর তার সেবার মান ও কার্যক্রম দেখি। তবে একই ফ্লোরে একাধিক হাসপাতাল থাকা আসলেই ঠিক নয়। একটি হাসপাতালের কার্যক্রম অন্য হাসপাতালের কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে কিনা, সেটি আমরা দেখবো।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের টিম সেদিন সেখানে (শ্যামলী বেবি কেয়ার হাসপাতাল) গিয়েছিল। আমরা হাসপাতালের কার্যক্রম আপাতত বন্ধ করে দিয়েছি এবং অক্সিজেন লিকেজের বিষয়টি বায়োমেডিক্যাল ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছি। আমরা নিজেরা মেকানিক্যাল বিষয়গুলো বুঝবো না, তাই একজন বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের ছাড়পত্র পাওয়ার পরই হাসপাতালটি চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। সে পর্যন্ত হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।’
এসময় আইন অনুযায়ী একটি ফ্লোরে একাধিক হাসপাতাল পরিচালনা করা যায় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘...আইনের দুর্বলতার জায়গাটি এখানেই। কোথায় করা যাবে বা যাবে না, সে ক্ষেত্রে আমাদের অনেক সময় সরাসরি করণীয় থাকে না। কারণ এ ধরনের অনুমোদন অন্য সংস্থার মাধ্যমে হয়ে থাকে। তবে হাসপাতাল চালুর পর সেটির কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব অবশ্যই আমাদের। কিন্তু একবার কোনও প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অনুমতি পেয়ে গেলে সেটি বন্ধ করা বা সরিয়ে দেওয়া আইনগতভাবে সহজ নয়। বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। তবু বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে এবং আমরা এটি পর্যবেক্ষণ করছি।’