আগামীকাল রবিবার (২৮ জুন) থেকে দেশব্যাপী ভিটামিন ‘এ প্লাস’ ক্যাম্পেইন শুরু করছে সরকার। এই কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী ২ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ প্লাস’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু একই বয়সী শিশুদের জন্য মাত্র দুই মাস আগে পরিচালিত হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮২ লাখ। অর্থাৎ দুই জাতীয় কর্মসূচির লক্ষ্যভুক্ত শিশুর সংখ্যার মধ্যে ৫৮ লাখের ব্যবধান দেখা দিয়েছে। এই ব্যবধান সরকারি শিশু জনসংখ্যার হিসাবের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে ধাপে ধাপে পরিচালিত হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে ১ কোটি ৮২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, তারা ওই লক্ষ্যমাত্রার ১০৩ শতাংশ অর্জন করেছে। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে একই বয়সী শিশুদের সংখ্যা এতটা বেড়ে যাওয়ায় সরকারি তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একই জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে পরিচালিত দুটি জাতীয় কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রায় এত বড় পার্থক্য তথ্য-পরিকল্পনার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। একইসঙ্গে এটি জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির বাস্তব মূল্যায়ন ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।
তাদের ভাষ্য, হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার দাবি করা হলেও দেশে এখনো প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার নতুন হামের রোগী শনাক্ত হচ্ছে। কভারেজের দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির এই অমিলও উদ্বেগের বিষয়।
ভিটামিন ‘এ প্লাস’ ক্যাম্পেইনের প্রস্তুতি
২৫ জুন সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত জানান, সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কেন্দ্রে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। পাশাপাশি বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে প্রায় ৫০০টি ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্র থাকবে।
তিনি জানান, দেশের ৫৮টি দুর্গম উপজেলায় মূল কর্মসূচির পর চার দিনের বিশেষ অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে, যাতে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া যায়। আগামী ডিসেম্বর মাসে এ কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপও অনুষ্ঠিত হবে।
বছরে সাধারণত দুইবার আয়োজিত ভিটামিন ‘এ প্লাস’ ক্যাম্পেইন সর্বশেষ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৫ সালের মার্চে। অর্থসংকট ও ক্রয়সংক্রান্ত জটিলতার কারণে এরপর দীর্ঘদিন কর্মসূচিটি স্থগিত ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কর্মসূচিতে দীর্ঘ বিরতি শিশুদের অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করে এবং হামের মতো সংক্রমণকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
লক্ষ্যমাত্রায় বড় ব্যবধান
দেশে হামের অস্বাভাবিক প্রাদুর্ভাবের পর সরকার প্রথমে ৩০টি উচ্চঝুঁকির উপজেলায়, পরে চারটি সিটি করপোরেশনে এবং শেষে সারা দেশে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করে। ওই কর্মসূচিতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১ কোটি ৮২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০ মে পর্যন্ত ১ কোটি ৮৩ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০২ শতাংশ।
এরপরও সরকার জানিয়েছে, কিছু শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়ে গেছে। অন্যদিকে একই বয়সী শিশুদের জন্য আসন্ন ভিটামিন ‘এ প্লাস’ ক্যাম্পেইনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ কোটি ৪০ লাখ।
ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন (আইপিএইচএন)-এর পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, সিভিল সার্জন কার্যালয় ও সিটি করপোরেশন থেকে পাওয়া হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
টিকাদানের তুলনায় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচিতে শিশু সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করেছে, তা আমি জানি না। আমরা আমাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে শিশুদের তালিকা করেছি।’
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি জরুরি পরিস্থিতিতে পরিচালিত হওয়ায় যথাযথ মাইক্রো-প্ল্যানিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, ‘ভিটামিন এ কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রাও হয়তো শতভাগ নির্ভুল নয়, তবে এটি আগের তুলনায় বাস্তবসম্মত। আমার ধারণা, হাম-রুবেলা অভিযানের অভিজ্ঞতা ও তথ্য ব্যবহার করেই নতুন হিসাব করা হয়েছে।’
তার ভাষ্য, সাধারণ পরিস্থিতিতে এই ধরনের কর্মসূচির আগে অন্তত ৩ মাস ধরে মাঠপর্যায়ে মাইক্রো-প্ল্যানিং করা হয়। কিন্তু হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে অভিযান শুরু হওয়ায় সেটি সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জনের দাবি করার পরিবর্তে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণের সময় যেসব শিশু হামের টিকা পায়নি, তাদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা উচিত।
মুশতাক হোসেনের মতে, কর্তৃপক্ষের উচিত মাঠপর্যায়ের পরিকল্পনায় যে ঘাটতি ছিল, তা স্বীকার করে সেগুলো সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া। তার মতে, এখনো প্রতিদিন ১ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হওয়া প্রমাণ করে, টিকাদান কর্মসূচি এখনো কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, একটি এলাকায় হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে টিকার কভারেজ অন্তত ৯৫ শতাংশ হতে হয়।
সরকারের শতভাগের বেশি কভারেজের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার যে কভারেজের কথা বলছে, সেটি বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না। যদি প্রকৃতপক্ষে শতভাগের বেশি কভারেজ অর্জিত হতো, তাহলে এতদিনে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসার কথা ছিল। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বোঝা যায়, কভারেজে ঘাটতি রয়েছে।’
জনস্বাস্থ্য ও টিকাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, এবার হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যভুক্ত শিশুর সংখ্যা প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় কম নির্ধারণ করা হয়েছিল। তার মতে, ভিটামিন ‘এ প্লাস’ ক্যাম্পেইনের জন্য নির্ধারিত শিশুর সংখ্যাই বাস্তব অবস্থার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, ওই হিসাব অনুযায়ী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির প্রকৃত কভারেজ প্রায় ৭৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। তার ভাষায়, ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জনের জন্য কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ টিকা কভারেজ প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সেই লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ১৮ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে। এ কারণেই হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসছে না। তাই টিকার বাইরে থাকা শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
সরকারের ব্যাখ্যা
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, দুই কর্মসূচির লক্ষ্যভুক্ত শিশুর সংখ্যায় বড় ব্যবধানের একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, দেশের কিছু এলাকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সহায়তায় আগে থেকেই হামের টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, টিকা কভারেজের হিসাবে বড় ধরনের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ লক্ষ্যভুক্ত শিশুর সংখ্যা নির্ধারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা নেওয়া হয়। তবে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে যাচাই-বাছাই করা হবে বলেও জানান তিনি।