ঘরে ঘরে সর্দি-কাশি-জ্বর, ঢাকার বাতাসও কি দায়ী?

রাজধানীর ইস্কাটনের বাসিন্দা লিপি আক্তারের ১৫ বছরের ছেলে হঠাৎ ঠান্ডা, কাশি ও হালকা জ্বরে আক্রান্ত হয়। প্রথমে ডেঙ্গু সন্দেহ করেছিলেন তিনি। পরীক্ষা করিয়ে ফল নেগেটিভ আসায় ভেবেছিলেন হয়তো সিজনাল জ্বর। জ্বর একসময় কমেও যায়। কিন্তু কাশি কমেনি। পরে চিকিৎসক জানান, ছেলের লাং ইনফেকশন হয়েছে, সঙ্গে রয়েছে অ্যালার্জিও। এখন তাকে মাস্ক পরে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

লিপি আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলের বয়স ১৫। হঠাৎ ঠান্ডা, কাশি, হালকা জ্বর। প্রথমে ভাবলাম ডেঙ্গু, টেস্টে নেগেটিভ আসলো। এরপর ভাবলাম সিজনাল জ্বর, কমে যাবে। জ্বর কমেও গেলো কাশি আর কমে না। পরে ডাক্তার বললেন লাং ইনফেকশন। অ্যালার্জিও আছে। আমার ছেলে অ্যালার্জি জাতীয় কিছুই খায় না এমনিতেই, তাহলে এই এলার্জি কোথা থেকে আসলো। ডাক্তার পরামর্শ দিয়েছেন মাস্ক পরতে। কারণ ঢাকায় এখন অনেক ধুলাবালি। এসব নাক দিয়ে ভেতরে যায়। ডাস্ট অ্যালার্জি থেকে সমস্যা হতে পারে।’

শাহজাহানপুরের বাসিন্দা শামসুল করিমের ছেলেরও ডাস্ট অ্যালার্জি রয়েছে। সম্প্রতি তার সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় নেবুলাইজ করতে হচ্ছে। চিকিৎসকের পরামর্শে মাস্ক ছাড়া বাসা থেকে বের হওয়াও নিষেধ করা হয়েছে।

শামসুল করিম বলেন, ‘আমার ছেলে মাঝে মাঝেই মাস্ক পেরে স্কুলে যায়, তার ডাস্ট অ্যালার্জি আছে। সম্প্রতি সেটা অনেক বেড়ে গেছে। নেবুলাইজ করতে হচ্ছে। ডাক্তার দেখালাম, বললো, অ্যালার্জি বেড়ে গেছে। মাস্ক ছাড়া বাসা থেকে বের হওয়া নিষেধ। এরপর ঠান্ডা, কাশি বেড়ে গেলো। এখনও নিয়মিত ওষুধ খেতে হচ্ছে।’

ঢাকায় ইদানীং ডেঙ্গু, হাম, সিজনাল জ্বর ছাড়াও অনেকের ঠান্ডা-কাশি বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, এসব উপসর্গের সঙ্গে ঢাকার দূষিত বাতাসের সম্পর্ক কতটা?

চিকিৎসকদের মতে, জ্বর, সর্দি-কাশির মতো উপসর্গের সঙ্গে বায়ুদূষণের সরাসরি সম্পর্ক সব ক্ষেত্রে না থাকলেও দূষিত বাতাস ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। বায়ুদূষণের প্রভাব সব সময় তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমানে জ্বর, সর্দি-কাশির সঙ্গে বায়ুদূষণের সরাসরি যোগসূত্র সব ক্ষেত্রে নেই। তবে কিছু ক্ষেত্রে এর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ফুসফুসের সমস্যা ও অ্যালার্জির কারণ হিসেবে বায়ুদূষণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘বায়ুদূষণের কারণে মানবদেহের প্রায় সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি হয়। বিশেষ করে হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে বর্তমানে বড় একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বায়ুদূষণ। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অ্যালার্জি, ঠান্ডা-কাশিতে ভোগা, নারীদের বিভিন্ন রোগের কারণও এই দূষণ। এমনকি এই বায়ুদূষণের কারণে গর্ভপাতের মতো ঘটনাও ঘটে।’ তাই এখনই বায়ুদূষণের বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি বলে জানান এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

চিকিৎসকরা বলছেন, বাতাসে থাকা ক্ষুদ্র ধূলিকণা ও অন্যান্য দূষণকারী উপাদান শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘ সময় দূষিত বাতাসে অবস্থান করলে শ্বাসতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। যাদের আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি বা ফুসফুসের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে দূষিত বাতাসে উপসর্গ বাড়তে পারে।

সেপ্টেম্বরেও দূষণের তালিকায় ঢাকা

আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইকিউএয়ারের হিসাবে ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৩ স্কোর নিয়ে বায়ুদূষণের শীর্ষে ছিল মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর। ১৬২ স্কোর নিয়ে তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। বাতাসের এই মানকেও ধরা হয় ‘অস্বাস্থ্যকর’।

এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বরের তথ্যে ১৬৭ স্কোর নিয়ে চতুর্থ অবস্থানে ছিল ঢাকা। তবে সেটি বৃষ্টি হওয়ার পরের অবস্থা। ওই দিন ২২৫ স্কোর নিয়ে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকার শীর্ষে ছিল কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসা। ২০১ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর এবং ১৬৮ স্কোর নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে ছিল ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা।

তালিকায় ১৫৪ স্কোর নিয়ে মালয়েশিয়ার কুচিং পঞ্চম এবং ১৫২ স্কোর নিয়ে ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটি ষষ্ঠ অবস্থানে ছিল। ১৩৭ স্কোর নিয়ে যৌথভাবে সপ্তম ও অষ্টম অবস্থানে ছিল সিঙ্গাপুর ও ভারতের রাজধানী দিল্লি। কাতারের দোহা ১২৭ স্কোর নিয়ে নবম এবং বাহরাইনের মানামা ১২১ স্কোর নিয়ে দশম অবস্থানে ছিল।

এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর ১৫৭ স্কোর নিয়ে ঢাকার অবস্থান ছিল যৌথভাবে ষষ্ঠ। ওই দিন মালয়েশিয়ার কুচিং ২৪৯ স্কোর নিয়ে প্রথম, কঙ্গোর কিনশাসা ২৩২ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় এবং কুয়ালালামপুর ১৭৭ স্কোর নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে ছিল। ভিয়েতনামের হ্যানয় ১৭০ এবং পাকিস্তানের লাহোর ১৬৩ স্কোর নিয়ে যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে ছিল।

বায়ু বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, একিউআই সূচক শূন্য থেকে ৫০ পর্যন্ত ‘ভালো’ বলে বিবেচিত হয়। ৫১ থেকে ১০০ ‘মোটামুটি’, ১০১ থেকে ১৫০ পর্যন্ত ‘সতর্কতামূলক’, ১৫১ থেকে ২০০ পর্যন্ত ‘অস্বাস্থ্যকর’, ২০১ থেকে ৩০০-এর মধ্যে থাকা একিউআই মাত্রাকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বলা হয়। আর ৩০১-এর বেশি স্কোরকে ‘বিপজ্জনক’ বা দুর্যোগপূর্ণ বলা হয়।

প্রসঙ্গত, বাতাসে দূষণের ক্ষেত্রে যে মানদণ্ড ব্যবহার করা হয় তা হলো—এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে (একিউআই)। বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণত ছয় ধরনের পদার্থ এবং গ্যাসের কারণে দূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। এর মধ্যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধূলিকণা অর্থাৎ ‘পিএম (পার্টিকুলেটেড ম্যাটার) ২ দশমিক ৫’-কে ঢাকায় দূষণের জন্য বেশি দায়ী করা হয়।

ক্ষতিকর ছয় ধরনের পদার্থের মধ্যে প্রথমেই আছে ‘পিএম ২ দশমিক ৫’ অথবা ২ দশমিক ৫ মাইক্রো গ্রাম সাইজের ক্ষুদ্র কণা। এরপর ‘পিএম-১০’ সবচেয়ে বেশি। বাকি চারটির মধ্যে আছে সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেন, কার্বন মনোক্সাইড ও সিসা। এই ছয় পদার্থ ও গ্যাসের ভগ্নাংশ গড় করেই বায়ুর সূচক নির্ধারণ করা হয়। সেই সূচককে বলা হয় এয়ার কোয়ালিটি বা সংক্ষেপে একিউআই।

দূষণ বাড়ছে, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বায়ুদূষণ পরিস্থিতি নিয়ে বায়ুদূষণ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত কয়েক বছরের তুলনায় বর্তমানে বায়ুদূষণের মাত্রা সব জায়গায় বেশি। শুধু ঢাকায় নয়, বিশ্বের অনেক জায়গাতেই বায়ুদূষণ বেড়েছে। এই বায়ুদূষণের ফলে বাতাসে যে ধুলিকণা ছড়িয়ে আছে, তা আমাদের ফুসফুসের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।’

অধ্যাপক সালাম বলেন, ‘অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি হওয়ার পেছনে বেশি কর্মকাণ্ড, নির্মাণকাজ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘দূষণের মাত্রা বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হলো—এখানে দূষণের বিভিন্ন উৎস একসঙ্গে সক্রিয় রয়েছে এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেই।’ তার মতে, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থাগুলোকে আরও বিস্তৃত ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের গবেষণা এবং সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আনা জরুরি।

বৃষ্টির পরও কেন কমছে না দূষণ

বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির কারণে বাতাসে থাকা ধুলাবালি ও কিছু ক্ষতিকর কণার পরিমাণ সাময়িকভাবে কমতে পারে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু বৃষ্টির পর দূষণের উৎসগুলো থেকে নির্গমন অব্যাহত থাকে বলে বাতাসের মান আবারও খারাপ হতে পারে।

ঢাকার নির্মাণকাজ, সড়কের ধুলাবালি, যানবাহনের নির্গমন, ইটভাটা ও শিল্পকারখানার দূষণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।

বায়ুদূষণ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান মজুমদার এ বিষয়ে বলেন, ‘বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে সাধারণত বাতাসের দূষণ কমে আসার কথা। তবে এ সময়ও অনুপযোগী যানবাহন থেকে গ্যাসীয় দূষণ, সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি ও নির্মাণকাজের কারণে দূষণ অব্যাহত থাকে। ফলে শুধু বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।’

তিনি বলেন, ‘বর্ষাকালে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করা এবং অনুপযোগী যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি।’

দূষণ নিয়ন্ত্রণে নির্দেশ

এদিকে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ৯ সেপ্টেম্বর পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক এক পর্যালোচনা সভায় তিনি বায়ু ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, ইটভাটাজনিত দূষণ বন্ধ এবং রাজধানী থেকে ফিটনেসবিহীন ও পরিবেশদূষণকারী যানবাহন অপসারণে গুরুত্ব দেন।

একইসঙ্গে পলিথিন ও প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।