ফুড ভ্লগিংয়ের ছড়াছড়ি, কিন্তু দর্শকদের কে বলবে খাবারে কী আছে

ঢাকাসহ সারা দেশেই দিনদিন বাড়ছে ফুড ভ্লগার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সংখ্যা। কম দামে খাবারের খোঁজ, একসঙ্গে বড় হাড়িতে রান্না কিংবা নানা ধরনের স্ট্রিট ফুড নিয়ে তৈরি ভিডিও মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কখনও কখনও এসব ভিডিও দেখেই শত শত মানুষ ছুটে যাচ্ছেন সেই খাবারের দোকানে।

খাবার নিয়ে এসব কনটেন্ট যখন মানুষের পছন্দ ও খাদ্যাভ্যাসে প্রভাব ফেলছে, তখন একটি প্রশ্ন সামনে আসছে, কোনো খাবার প্রচারের সময় দর্শকদের কি তার পুষ্টিগুণ, সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি কিংবা খাবারটি কতটা স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে তৈরি হচ্ছে, সেই তথ্যও জানানো হচ্ছে?

বিশেষ করে তুলনামূলক কম দামে বেশি খাবারের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ জনপ্রিয়। এর একটি উদাহরণ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ১০০ টাকায় গরুর মাংস দিয়ে ভাত বিক্রি করে আলোচনায় আসা মিজানুর রহমান ওরফে ‘ভাইরাল মিজান’। তার দোকানে ৮০ টাকায় মুরগি ও ভাত এবং ৬০ টাকায় ডিম ও ভাত বিক্রি করা হয়। আছে যত খুশি ভাত ও তরকারি নেওয়ার সুযোগও। দোকানটি নিয়ে ইউটিউবে একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ব্যাপক পরিচিতি পায়।

এ ধরনের ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়েই দেখা যায়। কোনও ভিডিওতে ৯৯ টাকায় বাসমতি বিরিয়ানি এবং ১৩০ টাকায় কাচ্চির কথা তুলে ধরা হয়েছে। কোনোটিতে আবার ১৩০ টাকায় গরুর মাংসের বিরিয়ানির স্বাদ তুলে ধরা হয়েছে। এসব ভিডিও দেখে সাধারণ অনেক মানুষই আকর্ষিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মুক্তা আক্তার বলেন, ‘কোনো ফুড ব্লগারের ভিডিও দেখে মাঝে মাঝে আমারও কোনো খাবার খেতে ইচ্ছা করে। বিশেষ করে দাম কম হলে আর খাবারটি দেখতে ভালো লাগলে আগ্রহ আরও বাড়ে।‘

তবে ভিডিওতে শুধু খাবারের স্বাদ আর দাম নিয়ে কথা না বলে খাবারটিতে কী আছে বা নিয়মিত খেলে কোনো বিষয় মাথায় রাখা দরকার কি না, সেটিও জানালে ভালো হতো বলে মনে করেন এই শিক্ষার্থী। তার ভাষ্য, ‘সব খাবারের সঙ্গে সতর্কবার্তা দেওয়ার দরকার নেই। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানালে আমরা আরও জেনে-বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারি।’

আর এসব ভিডিও দেখে যখন কেউ খাবার খেতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন সেই খাবারে কী কী উপাদান রয়েছে, কিংবা নিয়মিত খেলে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে কি না; সেসব বিষয়ও জানা গুরুত্বপূর্ণ। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের প্রধান মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা ডা. তাসনিম সানওয়ার বলেন, ‘খাবার নিয়ে তৈরি কনটেন্টে সাধারণত স্বাদ, দাম ও খাবারের পরিমাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু নিয়মিত কোনো খাবার খেলে সম্ভাব্য কী ধরনের স্বাস্থ্যপ্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে খুব কমই আলোচনা হয়।’

তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন কোনো খাবারকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয় এবং সেই কনটেন্ট মানুষের খাদ্য পছন্দে প্রভাব ফেলে, তখন অন্তত প্রাসঙ্গিক স্বাস্থ্যতথ্য দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। এর অর্থ এই নয় যে ফুড ব্লগারদের চিকিৎসক হতে হবে। বরং ভোক্তারা যাতে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য তাদের হাতে তুলে দেওয়া।’

সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খাবার নিয়ে তৈরি কনটেন্ট কেবল বিনোদনের বিষয় নয়। ২০২৫ সালে ‘বিএমজে গ্লোবাল হেলথ’-এ প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন খাদ্য বিপণন শিশু ও কিশোরদের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে ৩৬টি গবেষণা পর্যালোচনা করা হয়। এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ গবেষণাই উচ্চ আয়ের দেশগুলোকে কেন্দ্র করে হয়েছে। গবেষকেরা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

অন্য একটি গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় টিকটক ইনফ্লুয়েন্সারদের ৮ হাজার ৮৭১টি ভিডিও বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৬০টি ভিডিওতে খাবার, পানীয় কিংবা খাদ্য-সম্পূরক পণ্যের উপস্থিতি ছিল। গবেষণায় দেখা যায়, ভিডিওগুলোতে দেখানো খাবারের ৫৮ শতাংশকে অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

কিছু ফুড কনটেন্ট ক্রিয়েটরও মনে করেন, খাবার নিয়ে তৈরি কনটেন্টে স্বাস্থ্যতথ্য থাকা উচিত। ‘রায়হানিজম ট্রাভেল অ্যান্ড ফুড’-এর মীর রায়হান মাসুদ বলেন, খাবারের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে দর্শকদের জানানো ফুড ব্লগারদের উচিত।

তিনি বলেন, ‘অবশ্যই করা উচিত। এতে মানুষ কী খাচ্ছে, সে বিষয়ে আরও সচেতন হতে পারে। বাংলাদেশে হৃদ্‌রোগ ও ডায়াবেটিসের মতো খাদ্যাভ্যাস-সম্পর্কিত রোগে অনেক মানুষ ভুগছেন। ফুড ব্লগাররা যেহেতু বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেন, তাই তাদেরও একটা দায়িত্ব আছে।’

সম্প্রতি ফুড ব্লগিংয়ে আসা সাবেক বিবিসি বাংলার এই সাংবাদিক বলেন, খাবারে অতিরিক্ত লবণ, চিনি কিংবা তেল আছে কি না, সেটিও ব্লগারদের জানানো উচিত।

তিনি বলেন, ‘মানুষ প্রয়োজনীয় তথ্য পছন্দ করে। সঠিক তথ্য সুন্দর ও সহজভাবে উপস্থাপন করা হলে কনটেন্টের আকর্ষণ কমে যাবে; এমন নয়।’

কোনও খাবারকে ‘স্বাস্থ্যকর’ বলার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন খাদ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ডা. ফারজানা ওয়াহাব। তিনি বলেন, ‘কোনো খাবার সুস্বাদু বা দামের তুলনায় ভালো, এ কথা বলার সঙ্গে সেটিকে স্বাস্থ্যকর বলার পার্থক্য আছে। কোনও খাবারকে স্বাস্থ্যকর বলা হলে সেটি পুষ্টিবিজ্ঞানের ভিত্তিতে বলা উচিত। একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর খাবারের স্বাদ বা খাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে পারেন। কিন্তু তিনি যদি পুষ্টি বা চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য দেন, তাহলে সেই তথ্য যাচাই করে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।’

ডা. ফারজানা আরও বলেন, ‘প্রতিটি খাবারের সঙ্গে বড় করে সতর্কবার্তা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে কোনো খাবারে অতিরিক্ত লবণ, চিনি বা তেল রয়েছে বলে নির্ভরযোগ্যভাবে জানা থাকলে তা সহজ ভাষায় দর্শকদের জানানো যেতে পারে। এর অর্থ খাবারটি নিষিদ্ধ করা নয়। মানুষকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া।’

খাবার ও রেস্তোরাঁর প্রচার নিয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তদন্ত শাখার সহকারী পরিচালক নাসরিন আক্তার বলেন, ‘ভোক্তাদের জানা উচিত, কোনো তথ্য বিজ্ঞাপন হিসেবে দেওয়া হচ্ছে, নাকি তা স্বাধীন মতামত। ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই পার্থক্য যত স্পষ্ট হবে, ভোক্তাদের জেনে-বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও তত বাড়বে।’