ডেঙ্গুর প্রকোপে চাপে চিকিৎসাসেবা

ডেঙ্গু রোগীর স্রোত যেন থামছেই না। প্রতিদিনই হাজার হাজার মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হচ্ছেন হাসপাতালে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া তথ্য মতে, সারাদেশে ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চার জনের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮ পর্যন্ত তাদের মৃত্যু হয়। এছাড়া এ সময়ের মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রন্ত হয়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হন ১ হাজার ৫১২ জন। 

গত বছরের তুলনায় এ বছর আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ এবং মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি। গত বছরের (২০২৫ সাল) শুরু থেকে ২২ অক্টোবর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৩৬৭ জন। আর এ বছরের শুরু থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০২ জন; যা প্রায় দ্বিগুণ। একইভাবে গত বছরের এই সময়ের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন ২৫৫ জন। আর এ বছর মারা গিয়েছেন ৩৬৮ জন। যা গত বছরের থেকে বেশি। 

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সরেজমিনে ঘুরে জানা যায় হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি। 

ডেঙ্গু রোগীর পুরুষ ওয়ার্ডের কর্তব্যরত একজন নার্স বলেন, আমাদের এই ওয়ার্ডে সিট আছে ৫০টি, আর রোগী আছে ৩৮ জন। আমাদের এখানে পা রাখার মতো জায়গা থাকে না। এখন পূজার ছুটির জন্য দুই-তিন দিন ধরে বেড কিছুটা ফাঁকা আছে। অন্য সময়ে এমন অবস্থা দেখা যায় না। 

ডেঙ্গু রোগীর মহিলা ওয়ার্ডের দায়িত্বরত নার্স জানান, এই ওয়ার্ডে মোট ৪১টি বেড রয়েছে। বর্তমানে রোগী ভর্তি আছেন ২৩ জন। বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত ১৮ জন রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। পূজার ছুটির কারণে রোগীর চাপ কিছুটা কম। এ দিন সকাল থেকে চার-পাঁচজন রোগী এসেছেন। এর আগে ওয়ার্ডের ৪১টি বেডই পূর্ণ ছিল।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য হাসপাতালের ৪২০ নম্বর ওয়ার্ড পুরুষ এবং ৪২৪ নম্বর ওয়ার্ড নারী রোগীদের জন্য নির্ধারিত। এ ছাড়া বিভিন্ন ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা কর্নার করা হয়েছে। নির্ধারিত ওয়ার্ড দুটিতে রোগীর চাপ বাড়লে এসব কর্নারে রোগীদের পাঠানো হয়।

শ্যালক ডেঙ্গু আক্রান্ত, তাকে নিয়ে বৃহস্পতিবার হাসপাতাল ভর্তি হয়েছেন মহিউদ্দিন সরকার। তিনি বলেন, তিন দিন ধরে সে অসুস্থ। বুধবার সে নরসিংদীতে আমাদের বাসায় ছিল। সেখানকার একটি ল্যাবে তার পরীক্ষা করানো হয়। ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল পজিটিভ আসে। এরপর তাকে ঢাকায় হাসপাতালে নিয়ে আসি।

তিনি বলেন, হাসপাতালে আসার পর বেড পেতে কোনও সমস্যা হয়নি। চিকিৎসাও ভালো হচ্ছে। ওয়ার্ডের স্টাফদের আচরণ ও সেবার মান ভালো। অন্যান্য ওয়ার্ডের তুলনায় এই ওয়ার্ডটি ভালো মনে হয়েছে আমার কাছে। 

চারদিন ধরে ডেঙ্গু আক্রান্ত ছোট ভাইকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন হুমায়ুন কবির স্বপন। তিনি বলেন, আমরা গত সোমবার এখানে এসেছি। চার দিন ধরে হাসপাতালে আছি। এসেই বেড পেয়েছি, কোনও সমস্যা হয়নি। চিকিৎসাও মোটামুটি ভালো হচ্ছে। ডাক্তার ও নার্সদের সেবা নিয়ে বড় কোনও অভিযোগ নেই। তবে চিকিৎসক কিছুটা কম মনে হয়েছে। এটা পূজার ছুটির জন্য হয়তো।

এ সময় তিনি হাসপাতালের পরিবেশ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে বলেন, ডেঙ্গু ওয়ার্ডের অবস্থা মোটামুটি ভালো হলেও অন্যান্য ওয়ার্ডের অবস্থা ভালো না। আমি ২৫ দিন ধরে আমার আব্বাকে নিয়ে ভর্তি ছিলাম অন্য ওয়ার্ডে। সেখানে নারী ও পুরুষ একই ওয়াশরুম ব্যবহার করতে হতো। অনেকটা জেলখানার মতো অবস্থা। আর অবস্থা খুবই খারাপ। আবার বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে লিফটের স্বল্পতা, এত বড় হাসপাতাল, কিন্তু লিফট মাত্র কয়েকটা। এটা প্রধানমন্ত্রীর আসার আগের কয়েক দিনের কথা বলছি। প্রধানমন্ত্রীর আসার পর হাসপাতালের চিত্রে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হয়েছে।

জরুরি সেবা পেতে সমস্যা হয় জানিয়ে তিনি আরও বলেন, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে টিকিট কাউন্টারও বাড়ানো প্রয়োজন। এটা সরকারি হাসপাতাল, এখানে অনেক রোগী আসেন। বিশেষ করে ৬০ থেকে ৮৫ বছর বয়সী গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। ধরুন, কোনও রোগীর অবস্থা খুব খারাপ, তাকে চিকিৎসা দিতে নিয়ে এলাম, অথচ টিকিটের জন্য ৫০ জনের পেছনে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। টিকিট না কাটলে চিকিৎসক দেখানো যাচ্ছে না। এতে জরুরি চিকিৎসা পেতে সমস্যা হয় এখানে আরও টিকিট কাউন্টার বাড়ানো হলে মানুষের সুবিধা হবে। প্রয়োজনে আরও পাঁচজন কর্মী নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এটি তো সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। মানুষের সুবিধার জন্য কাউন্টার বাড়ালে সমস্যা কোথায়?

এদিকে, হাসপাতালে কর্তব্যরত একজন নাম পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হাসপাতালের বড় ওয়ার্ডে ১৭০ থেকে ২৫০ জন রোগী থাকেন। সেখানে দুজন নার্স দিয়ে এত রোগীকে সেবা দেওয়া কীভাবে সম্ভব? অথচ আমাদের এমন ওয়ার্ডে একজন চিকিৎসক ও তিন জন নার্স দায়িত্ব পালন করেন। বড় ওয়ার্ডগুলোতে জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর অনেক চাপ পড়ে।

তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে অনেক বেশি রোগী আসেন। ফলে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর কাজের চাপও অনেক বেশি থাকে। কিন্তু রোগী যত জনই আসুক, সেবা দিতেই হবে। ১০০ জন রোগী এলেও সামলাতে হবে, ৫০ জন এলেও সামলাতে হবে। রোগীর সংখ্যা বেশি হলে কাজের চাপও বেড়ে যায়। একজন নতুন রোগী আসার পর তার প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পন্ন করতে কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লাগে। স্যালাইন দেওয়া, ল্যাব পরীক্ষা করানো, রক্ত দেওয়া এবং চিকিৎসকের বিভিন্ন পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াসহ অনেক কাজ করতে হয়। এর পাশাপাশি রোগীর সঙ্গে কথা বলতে হয়, তার সমস্যাগুলো বুঝতে হয়। সব মিলিয়ে একজন রোগীর পেছনে বেশ সময় দিতে হয়।এখন প্রায় সব জায়গাতেই নার্সের সংকট রয়েছে। জনবল বাড়ানো না হলে এই সমস্যার সমাধান হবে না। 

তিনি আরও বলেন, শুধু হাসপাতালে গিয়ে স্যালাইন পরীক্ষা করলেই হবে না। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কেমন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আছে কি না এবং পর্যাপ্ত জনবল রয়েছে কি না, সেগুলোও দেখা প্রয়োজন।