চাকরির সাক্ষাৎকারে ‘নিজের সম্পর্কে বলুন’ প্রশ্নের উত্তর দেবেন যেভাবে

সাক্ষাৎকার কক্ষে প্রবেশ করার পর আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা বিনিময় শেষ হয়েছে। বোর্ডের সদস্যরা আপনার সিভির দিকে একবার তাকালেন। এরপরই এল সেই বহুল পরিচিত প্রশ্ন, ‘আচ্ছা, নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন।’

প্রশ্নটি শুনে অনেকেই ধরে নেন, এটি হয়তো সবচেয়ে সহজ প্রশ্ন। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। চাকরির সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে বেশি করা হলেও, এই প্রশ্নের উত্তর দিতেই সবচেয়ে বেশি ভুল করেন প্রার্থীরা। কেউ নিজের পুরো জীবনের গল্প বলতে শুরু করেন, কেউ আবার এতটাই সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন যে বোর্ড তার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণাই পায় না।

মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রশ্নের উদ্দেশ্য আপনার নাম, ঠিকানা বা শিক্ষাগত যোগ্যতা জানা নয়। সেগুলো তো আগে থেকেই আপনার জীবনবৃত্তান্তে লেখা আছে। এই প্রশ্নের মাধ্যমে নিয়োগদাতারা জানতে চান, আপনি নিজেকে কতটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারেন, আপনার যোগাযোগ দক্ষতা কেমন, চিন্তাগুলো কতটা গোছানো এবং আপনি আবেদন করা পদের জন্য কতটা প্রস্তুত।

‘নিজের সম্পর্কে বলুন’ প্রশ্নের কোনও নির্দিষ্ট মুখস্থ উত্তর নেই। কারণ প্রত্যেক প্রার্থীর অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং লক্ষ্য আলাদা। তবে একটি বিষয় সবার ক্ষেত্রেই একই, উত্তরটি হতে হবে সংক্ষিপ্ত, প্রাসঙ্গিক এবং আবেদন করা পদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

কেন প্রায় সব সাক্ষাৎকারেই এই প্রশ্ন করা হয়

অনেকের মনে প্রশ্ন আসে, জীবনবৃত্তান্তে সব তথ্য থাকার পরও সাক্ষাৎকারে আবার নিজের সম্পর্কে বলতে বলা হয় কেন।

এর প্রধান কারণ, নিয়োগদাতারা শুধু তথ্য জানতে চান না, তারা একজন মানুষকে জানতে চান। সিভি বলে দেয় আপনি কোথায় পড়েছেন, কোথায় কাজ করেছেন কিংবা কী কী দক্ষতা রয়েছে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করেন, নিজের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে কতটা সচেতন, কিংবা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে পারেন কি না, তা বোঝার সুযোগ তৈরি হয় এই প্রশ্নের মাধ্যমে।

অনেকেই যে ভুলটি করেন

সাক্ষাৎকারে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে অনেক প্রার্থী ছোটবেলা থেকে শুরু করেন।

কোথায় জন্মেছেন, কোন স্কুলে পড়েছেন, পরিবারের সদস্য কতজন, শখ কী, কোন খেলাধুলা পছন্দ করেন, এমন নানা তথ্য বলতে বলতে মূল বিষয় থেকে সরে যান।

কিন্তু নিয়োগদাতারা আসলে জানতে চান না আপনার শৈশবের গল্প। তারা জানতে চান, আপনি এই প্রতিষ্ঠানের জন্য কী মূল্য যোগ করতে পারবেন।

তাই নিজের পরিচয় দেওয়ার সময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা, অর্জিত দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য।

 

 

নিজের পরিচয় মানে নিজের গল্প নয়, পেশাগত পরিচয়

সাক্ষাৎকারে ‘নিজের সম্পর্কে বলুন’ প্রশ্ন শুনে অনেকেই ব্যক্তিগত জীবনের নানা তথ্য বলতে শুরু করেন। কোথায় জন্ম, কোথায় বেড়ে ওঠা, পরিবারের সদস্যসংখ্যা কিংবা শখের বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। কিন্তু চাকরির সাক্ষাৎকারে নিয়োগদাতারা এসব তথ্য জানতে চান না।

তারা জানতে চান, আপনি কে, কী শিখেছেন, কী ধরনের কাজ করেছেন এবং কেন মনে করেন এই পদের জন্য আপনি উপযুক্ত। অর্থাৎ আপনার উত্তরটি এমন হওয়া উচিত, যা সরাসরি আবেদন করা চাকরির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে।

কতক্ষণ কথা বলবেন

এটি অনেকের কাছেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

মানবসম্পদ পেশাজীবীদের মতে, নিজের পরিচয় দেওয়ার আদর্শ সময় সাধারণত দুই থেকে তিন মিনিট। এর চেয়ে কম হলে বোর্ড আপনার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নাও পেতে পারে। আবার পাঁচ বা সাত মিনিট ধরে কথা বললে মনোযোগ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সংক্ষিপ্ত, গোছানো এবং প্রাসঙ্গিক উত্তর সব সময় বেশি কার্যকর।

উত্তরের শুরুতে নিজের বর্তমান পরিচয়, এরপর শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা, অর্জিত দক্ষতা এবং সবশেষে কেন এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চান, সেটি উল্লেখ করলেই একটি সুন্দর কাঠামো তৈরি হয়।

সদ্য স্নাতকদের কী বলা উচিত

যাদের এখনও চাকরির অভিজ্ঞতা নেই, তারা প্রায়ই মনে করেন সাক্ষাৎকারে বলার মতো কিছুই নেই। কিন্তু এটি ভুল ধারণা।

নিয়োগদাতারা জানেন, নতুন স্নাতকদের দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থাকার কথা নয়। তাই তারা অন্য বিষয়গুলো দেখেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, প্রকল্প, বিতর্ক, স্বেচ্ছাসেবী কাজ, নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, কর্মশালা কিংবা ইন্টার্নশিপ, এসবই আপনার সম্ভাবনার পরিচয় বহন করে।

অভিজ্ঞ প্রার্থীদের কী বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত

যাদের কয়েক বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে নিয়োগদাতারা জানতে চান আগের কর্মস্থলে কী ধরনের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কী অর্জন করেছেন।

শুধু পদবির নাম বললেই যথেষ্ট নয়। বরং কাজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে কী অবদান রেখেছেন, কী ধরনের সমস্যা সমাধান করেছেন কিংবা কোনও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন কি না, সেসব তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরলে উত্তর আরও শক্তিশালী হয়।

মুখস্থ উত্তর নয়, নিজের ভাষায় বলুন

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ভিডিও প্ল্যাটফর্মে ‘নিজের সম্পর্কে বলুন’ প্রশ্নের শত শত প্রস্তুত উত্তর পাওয়া যায়। অনেকেই সেগুলো হুবহু মুখস্থ করে সাক্ষাৎকারে বলেন।

কিন্তু অভিজ্ঞ সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীরা খুব সহজেই বুঝতে পারেন, কোন উত্তরটি স্বাভাবিক আর কোনটি মুখস্থ।

বরং নিজের ভাষায়, স্বাভাবিক গতিতে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বললে সেটি অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়।

শরীরী ভাষা অনেক সময় কথার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ

সাক্ষাৎকারে শুধু কী বলছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; কীভাবে বলছেন, সেটিও সমান গুরুত্ব পায়। মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলেন, একজন প্রার্থীর আত্মবিশ্বাস, মনোযোগ এবং আন্তরিকতা অনেক সময় তার শরীরী ভাষা থেকেই বোঝা যায়।

সাক্ষাৎকার কক্ষে প্রবেশের পর স্বাভাবিকভাবে শুভেচ্ছা জানানো, অনুমতি নিয়ে বসা এবং কথা বলার সময় বোর্ডের সদস্যদের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেওয়া ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে। আবার অতিরিক্ত অস্থিরতা, বারবার মোবাইল দেখা, চেয়ারে হেলান দিয়ে বসা বা নিচের দিকে তাকিয়ে কথা বলা অনেক সময় নেতিবাচক বার্তা দেয়।

কথা বলার সময় অযথা হাত নাড়ানো, খুব দ্রুত উত্তর দেওয়া কিংবা দীর্ঘ বিরতি নেওয়াও এড়িয়ে চলা উচিত।  

নিজের শক্তির কথা বলুন, কিন্তু বাড়িয়ে নয়

অনেক প্রার্থী মনে করেন, সাক্ষাৎকারে নিজের ভালো দিকগুলো যত বেশি বলা যাবে, তত ভালো। কিন্তু বাস্তবে অতিরঞ্জিত দাবি উল্টো বিপদ ডেকে আনতে পারে।

তাই এমন কোনও দাবি করবেন না, যার ব্যাখ্যা বা প্রমাণ দিতে পারবেন না। বরং ছোট হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বলুন। নিয়োগদাতারা মুখস্থ প্রশংসার চেয়ে বাস্তব উদাহরণকে বেশি গুরুত্ব দেন।

ভালো উত্তরের সঙ্গে খারাপ উত্তরের পার্থক্য কোথায়?

ধরুন, বোর্ড আপনাকে বলল, ‘নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন।’

একজন প্রার্থী উত্তর দিলেন, ‘‘আমি ছোটবেলা থেকে খুব পরিশ্রমী। আমি খেলাধুলা করতে ভালোবাসি। আমাদের পরিবারে পাঁচজন সদস্য। আমি সব সময় নতুন কিছু শিখতে চাই...’’

এ ধরনের উত্তর শুনে বোর্ড আপনার পেশাগত যোগ্যতা সম্পর্কে খুব বেশি ধারণা পাবে না।

অন্যদিকে আরেকজন প্রার্থী বললেন, ‘‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেছি। পড়াশোনার পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠানে ছয় মাস ইন্টার্নশিপ করেছি, যেখানে আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত ও তথ্য বিশ্লেষণের কাজ শিখেছি। দলগতভাবে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি এবং শেখার আগ্রহ থেকেই আপনার প্রতিষ্ঠানের এই পদে আবেদন করেছি।’’

দুটি উত্তরের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। দ্বিতীয় উত্তরটি সংক্ষিপ্ত, প্রাসঙ্গিক এবং চাকরির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাই এটি নিয়োগদাতার কাছে অনেক বেশি কার্যকর মনে হবে।

 

প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে না জেনে সাক্ষাৎকারে যাওয়া বড় ভুল

অনেক প্রার্থী নিজের পরিচয় সুন্দরভাবে দিলেও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কোনও ধারণা রাখেন না। সাক্ষাৎকারে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, ‘‘আমাদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চান কেন?’’, তখন তারা সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেন না।

সাক্ষাৎকারে যাওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট, সাম্প্রতিক কার্যক্রম, সেবার ধরন এবং যে পদের জন্য আবেদন করেছেন, সেই পদের দায়িত্ব সম্পর্কে ধারণা নেওয়া উচিত।

এর ফলে নিজের পরিচয় দেওয়ার সময়ও প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনের সঙ্গে নিজের দক্ষতার মিল তুলে ধরা সহজ হয়।

অনুশীলনের বিকল্প নেই

ভালো উত্তর একদিনে তৈরি হয় না। সাক্ষাৎকারের আগে অন্তত কয়েকবার নিজের পরিচয় বলার অনুশীলন করা উচিত।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলুন, মোবাইলে ভিডিও ধারণ করুন অথবা পরিবারের কোনও সদস্য বা বন্ধুর সামনে অনুশীলন করুন। ভিডিও দেখে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন কোথায় খুব দ্রুত কথা বলছেন, কোথায় অপ্রয়োজনীয় তথ্য যোগ করছেন বা কোথায় আরও আত্মবিশ্বাসী হওয়া দরকার।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ভালো পরিচয় কখনোই মুখস্থ সংলাপের মতো শোনায় না। এটি হয় সংক্ষিপ্ত, আন্তরিক এবং প্রাসঙ্গিক।

তাদের মতে, সাক্ষাৎকারে নিজের সম্পর্কে বলার সময় এমন বিষয়গুলোকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত, যা আবেদন করা পদের সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সঙ্গে ইতিবাচক মনোভাব, শেখার আগ্রহ এবং পেশাদার আচরণও উত্তরকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

শেষ কথা

চাকরির সাক্ষাৎকারে ‘নিজের সম্পর্কে বলুন’ প্রশ্নটি যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় এই একটি প্রশ্নের উত্তর থেকেই নিয়োগদাতারা প্রার্থীর আত্মবিশ্বাস, যোগাযোগ দক্ষতা, চিন্তার স্বচ্ছতা এবং পেশাদার মনোভাব সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা তৈরি করেন।

তাই নিজের পরিচয় দেওয়ার সময় ব্যক্তিগত জীবনের অপ্রয়োজনীয় তথ্য নয়, বরং শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্যকে গুরুত্ব দিন। উত্তরটি সংক্ষিপ্ত, স্বাভাবিক এবং বাস্তব উদাহরণভিত্তিক হলে সেটি আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।

মনে রাখতে হবে, সাক্ষাৎকারে প্রথম ধারণা তৈরি হওয়ার সুযোগ খুব বেশি আসে না। তাই প্রশ্নটি যত পরিচিতই হোক, এর জন্য প্রস্তুতি নেওয়াটাই হতে পারে আপনার পরবর্তী চাকরির পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।