সকালে ঘুম থেকে উঠে স্মার্টফোন হাতে নেওয়া, কাজের ফাঁকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখা, অবসরে ভিডিও বা বিভিন্ন কনটেন্ট ঘাঁটা, আবার ঘুমানোর আগে শেষবারের মতো ফোনের পর্দায় চোখ রাখা। প্রযুক্তি এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজ, পড়াশোনা, যোগাযোগ ও বিনোদন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত নানা কাজেই স্মার্টফোন ও কম্পিউটারের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করলেও এর অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার অনেকের দৈনন্দিন রুটিনে সমস্যা তৈরি করতে পারে। কখন ফোন ব্যবহার করতে হবে, কতক্ষণ ব্যবহার করা উচিত কিংবা কাজের সময় কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মনোযোগ সরিয়ে রাখা যায়, এসব নিয়ে অনেকে হিমশিম খান।
এই জায়গাতেই তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের একটি কাজের ক্ষেত্র, যার নাম ডিজিটাল ওয়েলনেস কোচ। প্রযুক্তি পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়, বরং প্রযুক্তির সঙ্গে আরও স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে মানুষকে সহায়তা করাই এ ধরনের কাজের মূল উদ্দেশ্য।
ডিজিটাল ওয়েলনেস কোচ কী করেন?
সহজভাবে বললে, ডিজিটাল ওয়েলনেস কোচ মানুষকে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও সচেতনভাবে পরিচালনা করতে সহায়তা করেন। একজন ব্যক্তি দিনের কোন সময়ে বেশি ফোন ব্যবহার করছেন, কোন অ্যাপ তার বেশি সময় নিয়ে নিচ্ছে কিংবা কাজের সময় কোন বিষয়গুলো তার মনোযোগ নষ্ট করছে, এসব বিষয় চিহ্নিত করতে তারা সহায়তা করতে পারেন।
এরপর ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী, প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি বাস্তবসম্মত রুটিন তৈরি করা হয়। লক্ষ্য থাকে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়, বরং প্রয়োজনীয় কাজের জন্য ব্যবহার রেখে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো।
কীভাবে কাজ করেন তারা?
ডিজিটাল ওয়েলনেস কোচের কাজ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ব্যবহারের ধরন পর্যবেক্ষণ
প্রথমেই দেখা হয় একজন ব্যক্তি কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। কোন সময়ে বেশি ফোন ব্যবহার করছেন, কোন ধরনের অ্যাপ সবচেয়ে বেশি সময় নিচ্ছে কিংবা কাজের সময় কতবার ফোনের দিকে মনোযোগ যাচ্ছে, এসব বিষয় বোঝার চেষ্টা করা হয়।
প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ
প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু নির্দিষ্ট সময় বা জায়গাকে প্রযুক্তিমুক্ত রাখার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। যেমন, ঘুমানোর আগে নির্দিষ্ট সময় ফোন ব্যবহার না করা কিংবা খাবারের সময় ফোন দূরে রাখা।
দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন
শুধু ফোন কম ব্যবহার করতে বললেই সমস্যার সমাধান হয় না। তাই অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিংয়ের পরিবর্তে বই পড়া, হাঁটা, শরীরচর্চা, পরিবারকে সময় দেওয়া কিংবা অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়ার মতো বিকল্প অভ্যাস গড়ে তুলতেও উৎসাহ দেওয়া হতে পারে।
কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের সীমারেখা
যারা নিয়মিত কম্পিউটার ও স্মার্টফোনে কাজ করেন, তাদের ক্ষেত্রে অফিসের কাজ কখন শেষ হবে এবং ব্যক্তিগত সময় কখন শুরু হবে, সেটি নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। কাজের সময় শেষ হওয়ার পর অপ্রয়োজনীয় ই-মেইল বা বার্তা দেখা কমানোর মতো অভ্যাস তৈরিতেও সহায়তা করতে পারেন তারা।
কেন এই পেশার প্রয়োজন হচ্ছে?
প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পরিবর্তন এসেছে। অনেকের কাজ ও ব্যক্তিগত সময়ের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা থাকছে না। ঘরে বসে কাজ করা, সবসময় অনলাইনে থাকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত যুক্ত থাকার কারণে অনেকের জন্য প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতা ও ভারসাম্য তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও কর্মীদের সুস্থ কর্মপরিবেশ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস নিয়ে ভাবছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে ডিজিটাল ওয়েলনেস নিয়ে কাজ করা পেশাজীবীদের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কারা এই পেশায় আসতে পারেন?
মনোবিজ্ঞান, শিক্ষা, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ে আগ্রহী ব্যক্তিরা এই ক্ষেত্র সম্পর্কে ভাবতে পারেন। তবে এই কাজ করতে শুধু একটি বিষয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়। মানুষের আচরণ বোঝার পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন সম্পর্কেও পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার।
বিশেষ করে মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শোনা, ভালোভাবে যোগাযোগ করা, সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করা এবং বাস্তবসম্মত সমাধান দেওয়ার দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ।
কোন দক্ষতাগুলো কাজে আসবে?
ডিজিটাল ওয়েলনেস নিয়ে কাজ করতে চাইলে কয়েকটি দক্ষতা বিশেষভাবে কাজে লাগতে পারে।
মানুষের আচরণ বোঝার দক্ষতা: মানুষ কেন নির্দিষ্ট কোনো অ্যাপ বা প্রযুক্তির প্রতি বেশি সময় দিচ্ছে, সেটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
যোগাযোগের দক্ষতা: কারও অভ্যাস পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাকে বিচার না করে তার কথা শোনা এবং সহজভাবে পরামর্শ দেওয়া প্রয়োজন।
প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা: স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন অ্যাপ ও ডিজিটাল সরঞ্জাম কীভাবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে, তা জানা দরকার।
সমস্যা সমাধানের দক্ষতা: প্রত্যেক ব্যক্তির প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস আলাদা। তাই সবার জন্য একই সমাধান কার্যকর হবে না।
পরিকল্পনা করার দক্ষতা: প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে কাজ, পড়াশোনা, বিশ্রাম ও ব্যক্তিগত সময়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করতে হয়।
চাকরির বাইরে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ
ডিজিটাল ওয়েলনেস নিয়ে কাজ করার সুযোগ শুধু চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তিগত পরামর্শ, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কর্মশালা কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমেও এই বিষয়ে কাজ করার সুযোগ থাকতে পারে।
তবে কেউ যদি মানসিক স্বাস্থ্য বা চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শ দিতে চান, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যথাযথ পেশাগত যোগ্যতা থাকা জরুরি। ডিজিটাল ওয়েলনেস কোচের কাজ মানসিক রোগের চিকিৎসা বা পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।
ভবিষ্যতে কোথায় কাজের সুযোগ হতে পারে?
প্রযুক্তিনির্ভর কর্মপরিবেশ বাড়ার সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্মীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস, কাজের চাপ ও কর্মজীবনের ভারসাম্য নিয়ে আরও সচেতন হতে পারে। পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস নিয়ে কাজ করা এবং কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ আয়োজনের মতো ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে পেশাটি এখনও প্রচলিত ক্যারিয়ারের তালিকায় খুব পরিচিত নয়। তবে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন আরও বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল ওয়েলনেস নিয়ে কাজ করার প্রয়োজনীয়তাও বাড়তে পারে।
প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন সঠিক ভারসাম্য
প্রযুক্তি আমাদের জীবন থেকে বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং ভবিষ্যতে কাজ, শিক্ষা ও যোগাযোগে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়বে। তাই মূল বিষয় প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা নয়, বরং কখন এবং কতটা প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রয়োজন, সেই সিদ্ধান্ত নিতে শেখা।
এই জায়গা থেকেই ডিজিটাল ওয়েলনেস নিয়ে কাজ করা পেশাজীবীদের গুরুত্ব তৈরি হতে পারে। যারা মানুষের আচরণ, প্রযুক্তি এবং সচেতন জীবনযাপনের সংযোগ নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী, তাদের জন্য এটি হতে পারে প্রচলিত ক্যারিয়ারের বাইরে একটি ভিন্নধর্মী পথ।
প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যত গভীর হবে, সেই সম্পর্ককে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করার প্রয়োজনও তত বাড়বে। আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তৈরি হতে পারে ভবিষ্যতের নতুন নতুন পেশার সুযোগ।