কথা বলা থেকে নেতৃত্ব, সফট স্কিল শেখানোই হতে পারে নতুন ক্যারিয়ার

একজন কর্মী নিজের কাজ খুব ভালো জানেন, কিন্তু সহকর্মীদের সঙ্গে ঠিকভাবে কথা বলতে পারেন না। আবার কেউ দক্ষ হলেও চাপের সময় নিজেকে সামলাতে পারেন না। কেউ মিটিংয়ে ভালো ধারণা থাকা সত্ত্বেও তা সবার সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে পারেন না। কর্মক্ষেত্রে এমন সমস্যার মুখোমুখি হন অনেকেই। 

 

এই কারণেই বর্তমানে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি যোগাযোগ, নেতৃত্ব, দলগত কাজ, সময় ব্যবস্থাপনা ও আচরণগত দক্ষতার গুরুত্বও বাড়ছে। আর কর্মীদের এসব দক্ষতা গড়ে তুলতে কাজ করছেন এক ধরনের প্রশিক্ষক, যাদের বলা হয় সফট স্কিল প্রশিক্ষক। 

সফট স্কিল কী?

সহজভাবে বললে, একজন মানুষ অন্যদের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করেন, কীভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করেন, দলের সঙ্গে কীভাবে কাজ করেন কিংবা কঠিন পরিস্থিতিতে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেন, এসবই তার সফট স্কিলের অংশ। 

কারিগরি দক্ষতা দিয়ে একজন কর্মী হয়তো একটি নির্দিষ্ট কাজ করতে পারেন। কিন্তু সেই কাজটি দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে করা, একজন গ্রাহকের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলা কিংবা প্রতিষ্ঠানের কোনও সমস্যায় নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রয়োজন হয় ভিন্ন ধরনের দক্ষতা। 

এই জায়গাতেই একজন সফট স্কিল প্রশিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। 

কী শেখান একজন সফট স্কিল প্রশিক্ষক? 

একজন প্রশিক্ষক সাধারণত কর্মীদের বাস্তব কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার অনুশীলন করান। শুধু বক্তৃতা দিয়ে প্রশিক্ষণ শেষ হয় না, বরং নানা পরিস্থিতি তৈরি করে কর্মীদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। 

যেমন কোনও কর্মীকে একজন অসন্তুষ্ট গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলার পরিস্থিতিতে ফেলা হতে পারে। প্রশিক্ষক তখন গ্রাহকের ভূমিকায় থাকবেন এবং কর্মীকে পরিস্থিতি সামলাতে হবে। পরে কোথায় ভুল হয়েছে, কীভাবে আরও ভালোভাবে কথা বলা যেতো এবং কোন আচরণটি পেশাদার হতো, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। 

এভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীদের যোগাযোগ, নেতৃত্ব, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধান, সময় ব্যবস্থাপনা, উপস্থাপনা এবং কর্মক্ষেত্রে পেশাদার আচরণ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। 

কথা বলার দক্ষতা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

কর্মক্ষেত্রে প্রতিদিনই নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। সহকর্মী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, গ্রাহক কিংবা ব্যবসায়িক অংশীদার, সবার সঙ্গে একইভাবে কথা বলা যায় না। 

কোন কথা কীভাবে বলতে হবে, কখন নিজের মতামত দিতে হবে, কখন অন্যের কথা শুনতে হবে এবং মতের অমিল হলেও কীভাবে শান্তভাবে আলোচনা করতে হবে, এসব বিষয় কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ। 

একজন সফট স্কিল প্রশিক্ষক কর্মীদের এসব বিষয় অনুশীলনের মাধ্যমে শেখাতে পারেন। 

নেতৃত্বও শেখানো যায় 

নেতৃত্ব মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে থাকা নয়। একটি দলের কাজ ঠিকভাবে এগিয়ে নেওয়া, অন্যদের উৎসাহ দেওয়া, দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া এবং সমস্যার সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও নেতৃত্বের অংশ। 

তাই ভবিষ্যতে যারা ব্যবস্থাপনা বা নেতৃত্বের দায়িত্ব নিতে চান, তাদের জন্য এ ধরনের প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। 

একজন প্রশিক্ষক কর্মীদের বিভিন্ন দলগত কাজ ও বাস্তব পরিস্থিতির মাধ্যমে নেতৃত্বের দক্ষতা অনুশীলনের সুযোগ দিতে পারেন। 

কেন বাড়ছে এই পেশার সুযোগ?

বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে বড় প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, প্রযুক্তি কোম্পানি, টেলিকম, বেসরকারি সংস্থা ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কর্মীদের যোগাযোগ ও নেতৃত্বের দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। 

এই কারণে সফট স্কিল প্রশিক্ষকের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। 

কেউ চাইলে কোনও প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ বা মানবসম্পদ বিভাগে চাকরি করতে পারেন। আবার অভিজ্ঞতা অর্জনের পর স্বাধীন প্রশিক্ষক হিসেবেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করা সম্ভব। অনলাইনে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ থাকায় এই পেশায় কাজের পরিধিও আরও বাড়ছে। 

কীভাবে শুরু করবেন?

এই পেশায় আসার জন্য নির্দিষ্ট একটি বিষয়েই ডিগ্রি থাকতে হবে, এমন নয়। তবে নিজের যোগাযোগ দক্ষতা শক্তিশালী হওয়া জরুরি। 

 

মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, সহজভাবে কোনও বিষয় বোঝানো, সবার সামনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলা এবং বিভিন্ন মানুষের আচরণ বোঝার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। 

মনোবিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, মানবসম্পদ, শিক্ষা বা যোগাযোগ বিষয়ে পড়াশোনা থাকলে কিছু ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ পরিচালনার পদ্ধতি, উপস্থাপনা এবং কর্মক্ষেত্রের আচরণ সম্পর্কে নিয়মিত শেখাও প্রয়োজন। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্যকে যে দক্ষতাগুলো শেখাতে চান, সেগুলো আগে নিজের মধ্যেই তৈরি করতে হবে। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও কেন প্রয়োজন থাকবে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক ধরনের কারিগরি কাজ সহজ করে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও অনেক কাজ প্রযুক্তির মাধ্যমে করা সম্ভব হবে। কিন্তু মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা, মতবিরোধ সামলানো, দলকে নেতৃত্ব দেওয়া, অন্যের কথা বোঝা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী যোগাযোগ করার মতো দক্ষতার প্রয়োজন থেকেই যাবে। 

তাই প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, কর্মক্ষেত্রে মানুষের আচরণ ও যোগাযোগের দক্ষতাও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। 

যারা মানুষের সঙ্গে কাজ করতে ভালোবাসেন, কথা বলতে ও শেখাতে আগ্রহী এবং গতানুগতিক চাকরির বাইরে ভিন্ন ধরনের ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের জন্য সফট স্কিল প্রশিক্ষক হতে পারে একটি সম্ভাবনাময় পথ। নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অন্যদের পেশাগত উন্নতিতে ভূমিকা রাখার সুযোগও রয়েছে এই পেশায়।