নতুন কোনও পণ্য বাজারে আনার আগে প্রতিষ্ঠানগুলোকে জানতে হয়, ক্রেতারা আসলে কী চান। পণ্যের দাম কত হওয়া উচিত, কোনও বয়সের মানুষ সেটি বেশি কিনবে, প্যাকেজিং কেমন হলে নজর কাড়বে কিংবা প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় পণ্যটি কোথায় দাঁড়াবে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন হয় বাজার গবেষণার।
আর এই গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেন মার্কেট রিসার্চ অ্যানালিস্ট। সহজভাবে বললে, বাজার ও ক্রেতার আচরণ নিয়ে গবেষণা করে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য তৈরি করাই এই পেশার মূল কাজ।
কী কাজ করেন মার্কেট রিসার্চ অ্যানালিস্ট?
ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠান নতুন একটি পানীয় বাজারে আনতে চায়। পণ্যটি ক্রেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কি না, সম্ভাব্য ক্রেতারা কত টাকা খরচ করতে রাজি, কোন স্বাদ বা প্যাকেজিং তাদের বেশি পছন্দ এবং বাজারে একই ধরনের পণ্য কতটা জনপ্রিয়, এসব তথ্য আগে জানা দরকার।
মার্কেট রিসার্চ অ্যানালিস্টরা সাধারণত জরিপ, সাক্ষাৎকার, বাজার পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন তথ্যসূত্রের মাধ্যমে এসব তথ্য সংগ্রহ করেন। পরে সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে বাজারের প্রবণতা ও ক্রেতার পছন্দ সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করেন। এসব ফলাফল প্রতিবেদন বা উপস্থাপনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সামনে তুলে ধরা হয়।
জরিপ থেকে সিদ্ধান্ত
এই পেশার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জরিপ পরিচালনা। নির্দিষ্ট শ্রেণির ক্রেতাদের কাছে প্রশ্নমালা পাঠিয়ে তাদের মতামত নেওয়া হয়। আবার কোনও পণ্য ব্যবহারকারীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেও তথ্য সংগ্রহ করা হতে পারে।
তবে তথ্য সংগ্রহের পরই মূল কাজ শুরু হয়। শত শত বা হাজার হাজার মানুষের মতামতের মধ্যে কোন প্রবণতাটি ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তা খুঁজে বের করতে হয়। এ কাজে এসপিএসএস, এক্সেলসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়।
একজন দক্ষ অ্যানালিস্ট শুধু সংখ্যা দেখেন না, সংখ্যার পেছনের কারণও খোঁজেন। কোনো পণ্য কেন জনপ্রিয় হচ্ছে বা কেন ক্রেতারা সেটি এড়িয়ে যাচ্ছেন, সেই প্রশ্নের উত্তর বের করাই তাদের অন্যতম দায়িত্ব।
কারা আসতে পারেন এই পেশায়?
মার্কেট রিসার্চ অ্যানালিস্ট হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট একটি বিষয়েই পড়াশোনা করতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। ব্যবসায় শিক্ষা, মার্কেটিং, অর্থনীতি, পরিসংখ্যান, সমাজবিজ্ঞান কিংবা জার্নালিজম ও মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন পড়েছেন, এমন শিক্ষার্থীরাও এই পেশায় আসতে পারেন।
বিশেষ করে গবেষণা, সাক্ষাৎকার গ্রহণ, মানুষের আচরণ বোঝা এবং তথ্যকে সহজ ভাষায় উপস্থাপনের দক্ষতা থাকলে এই পেশায় সুবিধা পাওয়া যায়।
যেসব দক্ষতা প্রয়োজন
এই পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে প্রথমেই প্রয়োজন বিশ্লেষণী দক্ষতা। বড় পরিমাণ তথ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খুঁজে বের করার সক্ষমতা থাকতে হবে।
এর পাশাপাশি জরিপ তৈরি, প্রশ্নমালা প্রণয়ন, তথ্য সংগ্রহ এবং গবেষণা পরিচালনার ধারণা থাকা দরকার। তথ্য বিশ্লেষণের জন্য এসপিএসএস, এক্সেল বা এ ধরনের সফটওয়্যার শেখাও গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্য উপস্থাপন। গবেষণা থেকে পাওয়া ফলাফল প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের কাছে সহজভাবে তুলে ধরতে রিপোর্ট, চার্ট, উপস্থাপনা বা তথ্যচিত্র তৈরি করতে জানতে হয়।
কাজের সুযোগ কোথায়?
বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্য, টেলিযোগাযোগ, ব্যাংকিং, বিজ্ঞাপন, ই-কমার্স, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং গবেষণা সংস্থায় বাজার গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও পরামর্শক সংস্থাতেও এ ধরনের পেশাজীবীদের কাজের সুযোগ রয়েছে।
অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজার বিশ্লেষণ, ব্র্যান্ড কৌশল, ব্যবসায়িক পরামর্শ কিংবা গবেষণা ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রেও ক্যারিয়ার এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
ক্যারিয়ার হিসেবে কেমন?
বর্তমানে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে তথ্যের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। ক্রেতার আচরণ, বাজারের পরিবর্তন এবং প্রতিযোগীদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যত বেশি তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনও তত বাড়ছে।
তাই যারা গবেষণা করতে ভালোবাসেন, মানুষের আচরণ বুঝতে আগ্রহী এবং তথ্যের মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ গল্প খুঁজে বের করতে পারেন, তাদের জন্য মার্কেট রিসার্চ অ্যানালিস্ট হতে পারে সময়োপযোগী একটি ক্যারিয়ার। এই পেশায় কাজের মাধ্যমে শুধু তথ্য বিশ্লেষণ নয়, একটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তেও সরাসরি ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।