অফিসে বিভিন্ন প্রজন্মের কর্মীদের মধ্যে দূরত্ব কমানোও পেশা, জানতেন কি?

একই অফিসে পাশাপাশি বসে কাজ করছেন ভিন্ন বয়সের মানুষ। একজন হয়তো বছরের পর বছর ধরে প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত নিয়ম ও কাজের পদ্ধতিতে অভ্যস্ত। অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের কোনো কর্মী কাজ করছেন প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতিতে, দ্রুত যোগাযোগ আর নমনীয়তার প্রত্যাশা নিয়ে।

সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন দুজনের কাজের ধরন, যোগাযোগের পদ্ধতি কিংবা নেতৃত্ব সম্পর্কে প্রত্যাশার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। একজনের কাছে যে পদ্ধতি স্বাভাবিক, অন্যজনের কাছে সেটিই হয়তো অস্বস্তিকর। বয়সের এই পার্থক্যের সঙ্গে যুক্ত হয় চাকরি সম্পর্কে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিও।

একই অফিসে তাই শুধু কাজ ভাগ করে দিলেই সব সময় কাজের পরিবেশ ভালো থাকে না। বিভিন্ন প্রজন্মের কর্মীদের মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি করাও অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

আর এই জায়গা থেকেই তৈরি হচ্ছে নতুন এক ধরনের পেশার সুযোগ; জেনারেশনাল কনসালট্যান্ট বা প্রজন্মভিত্তিক কর্মক্ষেত্র বিশেষজ্ঞ। তাদের কাজ মূলত প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রজন্মের কর্মীদের কাজের ধরন ও প্রত্যাশা বোঝা এবং পারস্পরিক দূরত্ব কমাতে পরামর্শ দেওয়া।

কোথায় তৈরি হয় দূরত্ব?

একজন জেনারেশনাল কনসালট্যান্ট প্রথমে বোঝার চেষ্টা করেন, প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে কোথায় প্রজন্মগত পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। কে কীভাবে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, কী ধরনের নেতৃত্ব চান, কীভাবে প্রশংসা বা মতামত পেতে চান; এসব বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়।

নতুন প্রজন্মের কর্মীদের ক্ষেত্রে কাজের নমনীয়তা, প্রযুক্তির ব্যবহার, দ্রুত যোগাযোগ, ব্যক্তিগত সময় এবং কাজের অর্থবহতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে অভিজ্ঞ কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত কাঠামো, সরাসরি যোগাযোগ কিংবা দীর্ঘদিনের কাজের পদ্ধতিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারেন।

তখন একজন কনসালট্যান্টের কাজ হয় কোনো একটি প্রজন্মকে সঠিক বা ভুল হিসেবে দেখানো নয়। বরং প্রত্যেকের কাজের ধরন ও প্রত্যাশা বুঝে এমন একটি পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করা, যেখানে সবাই একসঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেন।

একজন জেনারেশনাল কনসালট্যান্ট কী করেন?

প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের কাজের ধরনও বদলাতে পারে। কর্মীদের মধ্যে জরিপ ও সাক্ষাৎকার নেওয়া, বিভিন্ন প্রজন্মের কাজের ধরন বিশ্লেষণ করা এবং কর্মীদের সমস্যা ও প্রত্যাশা চিহ্নিত করা এর মধ্যে রয়েছে।

ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ উন্নত করার পরামর্শ দেওয়াও তাদের কাজ। পাশাপাশি নেতৃত্ব ও কর্মী ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ আয়োজন, নতুন ও পুরোনো কর্মীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা তৈরি, কর্মীদের ধরে রাখার কৌশল নিয়ে পরামর্শ এবং কর্মপরিবেশ উন্নয়নে নীতিমালা তৈরিতেও তারা সহায়তা করতে পারেন।

ধরা যাক, কোনো প্রতিষ্ঠানের নতুন কর্মীরা মনে করছেন, ব্যবস্থাপনা তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। তখন কনসালট্যান্ট কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করতে পারেন। আবার অভিজ্ঞ কর্মীরা যদি নতুন প্রজন্মের যোগাযোগের ধরন বা কাজের পদ্ধতি নিয়ে সমস্যায় পড়েন, সেটিও বিশ্লেষণ করে সমাধানের পথ বের করা যায়।

অর্থাৎ কাজটি শুধু দুই প্রজন্মের মধ্যে দূরত্বের কথা বলা নয়। সেই দূরত্ব কোথা থেকে তৈরি হচ্ছে, সেটি বোঝা এবং কাজের পরিবেশে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করাই এর মূল বিষয়।

শুধু কথা বললেই হয় না

এই পেশায় মানুষের আচরণ বোঝার পাশাপাশি ভালো যোগাযোগের দক্ষতা থাকা জরুরি। বিভিন্ন বয়সের মানুষের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে হয় এবং তাদের মতামত নিরপেক্ষভাবে বুঝতে হয়।

এ জন্য যোগাযোগের দক্ষতার পাশাপাশি গবেষণা ও বিশ্লেষণের ক্ষমতাও প্রয়োজন। জরিপ, সাক্ষাৎকার ও কর্মীদের মতামত থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য বের করতে জানতে হয়।

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মীদের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, সন্তুষ্টি ও ধরে রাখার বিষয়ে ধারণা থাকা দরকার। একই সঙ্গে মানুষের আচরণ, প্রেরণা ও কর্মক্ষেত্রের সম্পর্ক বোঝার জন্য মনোবিজ্ঞানের প্রাথমিক জ্ঞান কাজে লাগে।

দুই প্রজন্মের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হলে বাস্তবসম্মত সমাধান বের করার সক্ষমতাও এই পেশার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার মধ্যে পড়ে।

কোথায় কাজের সুযোগ?

বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, উন্নয়ন সংস্থা, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগে এ ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন হতে পারে।

কারণ বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু কর্মী নিয়োগের দিকে নয়, কর্মীদের দীর্ঘদিন ধরে রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে। কর্মীদের কাজের সন্তুষ্টি, নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক এবং কর্মপরিবেশ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে একই কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা তৈরির দক্ষতারও প্রয়োজন হচ্ছে।

কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন?

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ব্যবসায় প্রশাসন, ব্যবস্থাপনা বা গণযোগাযোগ বিষয়ে পড়াশোনা করা ব্যক্তিরা এই পেশায় আসতে পারেন। তবে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে ডিগ্রির পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের আচরণ ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে বাস্তব জ্ঞান তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।

শুরুতে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, কর্মীদের প্রেরণা, নেতৃত্ব, কর্মপরিবেশ ও প্রজন্মগত পার্থক্য নিয়ে পড়াশোনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সের কর্মীদের নিয়ে জরিপ বা ছোট গবেষণা করে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব।

একই অফিসে ভিন্ন বয়সের মানুষ কাজ করবেন; এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের কাজের ধরন, প্রত্যাশা আর যোগাযোগের পার্থক্য যেন কাজের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেই জায়গায় কাজ করারও যে আলাদা পেশাগত সুযোগ তৈরি হচ্ছে, সেটিই জেনারেশনাল কনসালট্যান্টের ধারণা।