মুঘল ঢাকার পথে পথে: যে শহর একদিন ছিল বাংলার রাজধানী

ঢাকার অলিগলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হয়তো বোঝার উপায় নেই, এই শহর একসময় ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী। আজকের ব্যস্ত পুরান ঢাকার গলির নিচে, ভগ্নপ্রায় প্রাসাদের দেয়ালে, শতবর্ষী মসজিদের খিলানে এবং বুড়িগঙ্গার তীরে এখনও লুকিয়ে আছে চারশ’ বছরের ইতিহাস।

১৬০৮ সালে ইসলাম খান চিশতী বাংলার সুবাহর রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সম্মানে শহরের নাম রাখা হয় ‘জাহাঙ্গীরনগর’। এরপর প্রায় এক শতাব্দী ধরে মুঘল প্রশাসন, বাণিজ্য, সামরিক কার্যক্রম এবং শিল্প-সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে ঢাকা। বিশ্বের নানা প্রান্তের বণিক, দূত, সৈনিক ও পর্যটকের পদচারণায় মুখর ছিল এই নগরী।

লালবাগ কেল্লা (ছবি: উইকিপিডিয়া)।

লালবাগ কেল্লা: অসমাপ্ত এক স্বপ্ন

মুঘল ঢাকার সবচেয়ে পরিচিত স্থাপনা লালবাগ কেল্লা। ১৬৭৮ সালে এর নির্মাণ শুরু করেন যুবরাজ মুহাম্মদ আজম। পরে সুবাদার শায়েস্তা খান কাজ এগিয়ে নিলেও তার কন্যা পরীবিবির মৃত্যুর পর দুর্গ নির্মাণ আর সম্পূর্ণ হয়নি।

দুর্গের ভেতরে রয়েছে পরীবিবির সমাধি, দরবার হল, হাম্মামখানা, মসজিদ এবং সুন্দর বাগান। অসমাপ্ত হলেও এটি মুঘল স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন।

বড় কাটরা (ছবি: উইকিপিডিয়া)।

বড় কাটরা: ভ্রমণকারীদের রাজকীয় বিশ্রামাগার

১৬৪৪ সালে নির্মিত বড় কাটরা ছিল একাধারে প্রাসাদ, অতিথিশালা ও বাণিজ্যকেন্দ্র। বুড়িগঙ্গা নদীপথে আগত ব্যবসায়ী ও অতিথিরা এখানে অবস্থান করতেন। একসময় বিশাল প্রবেশদ্বার, খোলা প্রাঙ্গণ ও সারিবদ্ধ কক্ষ নিয়ে এটি ছিল ঢাকার অন্যতম জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপনা। আজ তার অল্প অংশ টিকে আছে।

ছোট কাটরা (ছবি: উইকিপিডিয়া)।

ছোট কাটরা: ইতিহাসের নীরব সাক্ষী

বড় কাটরার কিছুদিন পর নির্মিত ছোট কাটরাও একই ধরনের স্থাপত্যশৈলীর উদাহরণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর অনেক অংশ হারিয়ে গেলেও অবশিষ্টাংশ এখনও মুঘল ঢাকার ঐতিহ্য বহন করছে।

সাত গোম্বুজ মসজিদ (ছবি: উইকিপিডিয়া)।

মসজিদে মসজিদে মুঘল শিল্প

মুঘল আমলে ঢাকায় অসংখ্য মসজিদ নির্মিত হয়। সাত গম্বুজ মসজিদ, কারতলব খান মসজিদ, খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ—প্রতিটি স্থাপনাতেই দেখা যায় খিলান, গম্বুজ, কর্নার টাওয়ার এবং অলংকরণে মুঘল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য।

এসব মসজিদ শুধু উপাসনালয় নয়। এগুলো ছিল শিক্ষা, বিচার এবং সামাজিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

হোসনে দালাল (ছবি: উইকিপিডিয়া)।

হোসেনি দালান: ধর্মীয় সম্প্রীতির নিদর্শন

মুঘল আমলে নির্মিত হোসেনি দালান বাংলাদেশের শিয়া সম্প্রদায়ের প্রধান ইমামবাড়া। মহররমে এখানে হাজারো মানুষের সমাগম হয়। ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি এটি মুঘল স্থাপত্যের একটি অনন্য নিদর্শন।

আহসান মঞ্জিল (ছবি: উইকিপিডিয়া)।

নদীকেন্দ্রিক শহর

মুঘল ঢাকা গড়ে উঠেছিল বুড়িগঙ্গাকে ঘিরে। নদীপথ ছিল তখনকার প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা। তাই প্রশাসনিক ভবন, গুদাম, বাজার এবং আবাসিক এলাকাগুলো নদীর কাছাকাছি নির্মিত হয়েছিল। ঢাকার সূক্ষ্ম মসলিন কাপড় এই নদীপথ ব্যবহার করেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হতো।

সোনারগাঁও (ছবি: উইকিপিডিয়া)।

কোথায় হারিয়ে গেল মুঘল ঢাকা?

১৭১৭ সালে রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরের পর ঢাকার গুরুত্ব কমতে শুরু করে। এরপর ব্রিটিশ আমলে নতুন নগর পরিকল্পনা গড়ে ওঠে। জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত নির্মাণ, দখল ও অবহেলায় মুঘল আমলের বহু স্থাপনা হারিয়ে যায়।

ঐতিহাসিকদের মতে, একসময় ঢাকায় শতাধিক মুঘল স্থাপনা ছিল। আজ তার অল্প কয়েকটি টিকে আছে।

তারা মসজিদ (ছবি: উইকিপিডিয়া)।

সংরক্ষণ কেন জরুরি

একটি শহরের পরিচয় শুধু তার আধুনিক ভবনে নয়, তার ইতিহাসেও। মুঘল স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করা মানে শুধু পুরোনো ইট-পাথর রক্ষা করা নয়, বরং একটি শহরের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ধরে রাখা।

আম্বরখান মসজিদ (ছবি: উইকিপিডিয়া)।

অনেক স্থাপনা এখনও সংস্কারের অপেক্ষায়। কোথাও অবৈধ দখল, কোথাও পরিবেশগত ক্ষয়, কোথাও আবার নগরায়ণের চাপে ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে।

ধানমন্ডি ঈদগাহ মাঠ (ছবি: উইকিপিডিয়া)।

ইতিহাসের পথে এক দিনের ভ্রমণ

হাতে যদি একদিন সময় থাকে তাহলে ঢাকাযর মুঘল ইতিহাসের স্বাদ নিতে পারেন একটি ছোট্ট ভ্রমণে। সকালে লালবাগ কেল্লা, এরপর খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ, হোসেনি দালান, বড় কাটরা, ছোট কাটরা ঘুরে দুপুরে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নেওয়া যেতে পারে। বিকালে বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়ালে কল্পনায় ভেসে উঠতে পারে শত শত বছর আগের জাহাজ, ব্যবসায়ী, দূত আর মসলিনের বাণিজ্যে ব্যস্ত জাহাঙ্গীরনগর।