হাটহাজারীর মাটিতে সুলতানি আমলের ছাপ

চট্টগ্রামের হাটহাজারী শহরের ব্যস্ততার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। চারপাশে বদলে গিয়েছে জনপদ, বেড়েছে আধুনিক স্থাপনা, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা। কিন্তু কয়েক শতাব্দী পেরিয়েও টিকে রয়েছে ছয় গম্বুজের একটি পুরনো মসজিদ। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি পরিচিত ফকির মসজিদ নামে।

হাটহাজারী উপজেলার দেওয়াননগর মৌজায়, উপজেলা সদরের বাজারের কাছেই কৃষি ফার্ম সড়কের পাশে মসজিদটির অবস্থান। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি চট্টগ্রাম অঞ্চলে টিকে থাকা সুলতানি আমলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ। একটি ভগ্ন আরবি শিলালিপির সূত্র ধরে ধারণা করা হয়, মসজিদটি ১৪৭৪ থেকে ১৪৮১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সুলতান শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহের শাসনামলে নির্মিত হয়েছিল।

অর্থাৎ প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছরের পুরনো এই স্থাপনা আজও ব্যবহার হচ্ছে নামাজের জন্য। কিন্তু এত দীর্ঘ ইতিহাসের পরও মসজিদটি দীর্ঘদিন যথাযথ সংরক্ষণের বাইরে ছিল। সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর এটিকে ঐতিহ্য হিসেবে জরিপে অন্তর্ভুক্ত করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

ভগ্ন শিলালিপিতে মিলেছে ইতিহাসের সূত্র

ফকির মসজিদের নির্মাণকাল নিয়ে মূল সূত্রটি পাওয়া যায় মসজিদের পাশে থাকা একটি ভগ্ন আরবি শিলালিপি থেকে। সেই শিলালিপির পাঠ বিশ্লেষণ করে ইতিহাসবিদেরা মসজিদটির নির্মাণকাল সুলতান শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহের শাসনামল বলে ধারণা করেন। চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে ১৮৭১ সালে হামিদউল্লাহ খান রচিত ‘আহাদিস-উল-খাওয়ানিন’ গ্রন্থেও মসজিদটির উল্লেখ রয়েছে। পরে ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আবদুল করিম ক্ষতিগ্রস্ত শিলালিপিটির পাঠ প্রকাশ করেন, যা মসজিদের ইতিহাস নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে।

কেন নাম ফকির মসজিদ

মসজিদের নামের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে স্থানীয় জনশ্রুতি। কথিত আছে, একসময় মসজিদটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। চারপাশের ঝোপঝাড় ও জঙ্গলে এমন ভাবে ঢেকে গিয়েছিল যে সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালেই চলে যায় স্থাপনাটি।

প্রায় ২০০ বছর আগে মুকিম শাহ নামে এক সুফি সাধক মসজিদটি খুঁজে পান এবং পরিষ্কার করে আবার নামাজের উপযোগী করে তোলেন বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। তার কবর এখনও মসজিদের প্রবেশপথের পাশে রয়েছে। সেই থেকেই মসজিদটির পরিচিতি হয়ে ওঠে ‘ফকির মসজিদ’।

ছয় গম্বুজের স্থাপত্য

মসজিদের সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বৈশিষ্ট্য তার ছয়টি ছোট, কাছাকাছি বসানো গোলাকার গম্বুজ। প্রতিটি গম্বুজের উপর রয়েছে অলংকারময় চূড়া। চার কোণে রয়েছে বৃত্তাকার বুরুজ বা টাওয়ার। ভেতরের নামাজের কক্ষটি কয়েকটি অংশে বিভক্ত এবং কেন্দ্রীয় মিহরাবটি পাশের মিহরাবগুলির তুলনায় বড়। মিহরাবের অলংকরণেও সুলতানি আমলের স্থাপত্যরীতির ছাপ রয়েছে।

পুরনো স্থাপনাটির আয়তনও খুব বড় নয়। কিন্তু এর স্থাপত্যে যে সময়ের ছাপ রয়েছে, সেটিই মসজিদটিকে বিশেষ করে তুলেছে। কয়েক শতাব্দী ধরে নানা পরিবর্তনের মধ্যেও মূল কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলি টিকে আছে।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে চারপাশ

মসজিদটি এখনও নিয়মিত ব্যবহৃত হয়। তবে কয়েক শতাব্দী পুরনো স্থাপনার পক্ষে বর্তমান সময়ের চাহিদা মেটানো সহজ নয়। ১৯৯৩-৯৪ সালে মসজিদটির পাশে তিনতলা একটি স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে মুসল্লিদের জায়গার সংকট মেটাতে পুরনো মসজিদের পূর্ব পাশে নতুন নামাজের স্থানও যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন কয়েকশ’ মানুষ এখানে নামাজ পড়েন। শুক্রবার মুসল্লির সংখ্যা আরও বেড়ে যায়।

অবশেষে সংরক্ষণের উদ্যোগ

এত পুরনো হওয়া সত্ত্বেও ফকির মসজিদ দীর্ঘদিন প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের সংরক্ষিত ঐতিহ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি বদলানোর ইঙ্গিত মিলেছে।

২০২৪ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের মাঠ জরিপের তালিকায় মসজিদটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের পরিচালক নাহিদ সুলতানা জানান, ফকির মসজিদকে ঐতিহ্য হিসেবে জরিপে নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া চলছে। কয়েক শতাব্দী পুরনো স্থাপনাটির সংরক্ষণের জন্য নির্দেশিকাও তৈরির কথা জানান তিনি।

এই উদ্যোগ কার্যকর হলে ফকির মসজিদের স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য আরও পরিকল্পিত ভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

ইতিহাসের টানে ঘুরে আসতে পারেন

হাটহাজারী শহরের কাছেই হওয়ায় ফকির মসজিদে যাওয়া তুলনামূলক সহজ। চট্টগ্রাম শহর থেকে হাটহাজারীর দিকে গিয়ে উপজেলা সদরের এলাকায় পৌঁছালেই স্থানীয়দের কাছে ফকির মসজিদের অবস্থান জানা যাবে। মসজিদটি কৃষি ফার্ম সড়কের পাশে, দেওয়াননগর এলাকায়।

ফকির মসজিদের সামনে দাঁড়ালে তাই শুধু একটি পুরনো স্থাপনা দেখা হয় না। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুলতানি আমলের চট্টগ্রাম, হারিয়ে যাওয়া একটি সময় এবং কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে আজও টিকে থাকার এক আশ্চর্য গল্প।