দীর্ঘ দূরত্বের বিমানে ভ্রমণের পর ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা, মাথাব্যথা, হজমের গোলমাল ও মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। একে সাধারণভাবে জেট ল্যাগ বলা হয়। তবে ভ্রমণের আগে ও পরে কিছু অভ্যাস মেনে চললে এর প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব।
জেট ল্যাগের মূল কারণ শুধু ঘুমের ঘাটতি নয়; বরং শরীরের জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদমের সঙ্গে নতুন সময় অঞ্চলের অমিল। তাই দ্রুত নতুন সময়ের সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নেওয়াই এর প্রভাব কমানোর প্রধান কৌশল।
ভ্রমণের আগেই প্রস্তুতি নিন
ভ্রমণের কয়েক দিন আগে থেকেই ঘুমের সময় সামান্য পরিবর্তন করা যেতে পারে। পূর্ব দিকে ভ্রমণ করলে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। আর পশ্চিম দিকে গেলে এক থেকে দুই ঘণ্টা দেরিতে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে। এতে শরীর নতুন সময়সূচির সঙ্গে কিছুটা আগে থেকেই মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়।
গন্তব্যে পৌঁছে আলোর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ
জেট ল্যাগ কমানোর তুলনামূলক নিরাপদ একটি উপায় হলো গন্তব্যে পৌঁছানোর পর সঠিক সময়ে আলোতে থাকা। দিনের আলো মস্তিষ্ককে দিনের সময় সম্পর্কে সংকেত দেয় এবং ঘুমের হরমোন মেলাটোনিনের নিঃসরণকে প্রভাবিত করে। তবে শুধু বাইরে গেলেই হবে না; ভ্রমণের দিক ও সময়ের পার্থ্য অনুযায়ী কখন আলোতে থাকা উচিত, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ে চোখে আলো প্রবেশ কমাতে সানগ্লাস ব্যবহার করাও প্রয়োজন হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, পশ্চিম দিকে ভ্রমণ করে সকালে রওনা হয়ে পাঁচটি টাইম জোন অতিক্রম করলে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর কিছু সময় বাইরে আলোতে থাকা উপকারী হতে পারে। এতে মস্তিষ্ককে বোঝানো যায় যে স্থানীয় সময় অনুযায়ী এখনো দিন চলছে। তবে গন্তব্যের স্থানীয় সময় অনুযায়ী রাত না হওয়া পর্যন্ত জেগে থাকার চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
হালকা ব্যায়ামও সহায়ক হতে পারে
আলোর সংস্পর্শের সঙ্গে হালকা বা মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম যুক্ত করা যেতে পারে। কিছু ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যায়াম শরীরের জৈবিক ঘড়িকে নতুন সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে সাহায্য করতে পারে। তাই জেট ল্যাগের মধ্যেও পেশাদার ক্রীড়াবিদদের সাধারণত ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, তবে অতিরিক্ত পরিশ্রম না করে হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করাই ভালো।
খাবারের সময়ও বদলাতে হবে
শুধু ঘুম ও আলো নয়, খাবারের সময়ও শরীরের জৈবিক ঘড়িকে প্রভাবিত করে। ভ্রমণের সময় সম্ভব হলে গন্তব্যের স্থানীয় সময় অনুযায়ী খাবার খাওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে।
বিমানে কখন খাবার দেওয়া হবে, তা সবসময় যাত্রীর নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর থেকে স্থানীয় সময় অনুযায়ী নিয়মিত খাবার খাওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে। এতে লিভার ও অগ্ন্যাশয়ের মতো অঙ্গের নিজস্ব জৈবিক ঘড়ি নতুন সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে পারে এবং বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
মেলাটোনিন ব্যবহারে সতর্কতা
জেট ল্যাগ কমাতে কেউ কেউ মেলাটোনিন ব্যবহার করেন। এটি শরীরকে রাতের সময়ের সংকেত দিতে সাহায্য করতে পারে। তবে ভুল সময়ে মেলাটোনিন গ্রহণ করলে উল্টো শরীরের জৈবিক ঘড়ি আরও বিভ্রান্ত হতে পারে এবং জেট ল্যাগের উপসর্গ বাড়তে পারে।
এ ছাড়া মেলাটোনিনে মাথা ঘোরা ও বমিভাবের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা বা অন্য ওষুধের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার কারণেও এটি সবার জন্য উপযুক্ত নয়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নতুন করে মেলাটোনিন বা অন্য কোনো ওষুধ শুরু না করাই নিরাপদ।
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাও সমস্যা বাড়াতে পারে
জেট ল্যাগ নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ারও প্রয়োজন নেই। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সারেতে পরিচালিত একটি গবেষণা, যা এখনো পিয়ার-রিভিউ বা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি, ইঙ্গিত দিয়েছে—যারা জেট ল্যাগ নিয়ে আগে থেকেই বেশি দুশ্চিন্তায় ছিলেন, তাদের উপসর্গও তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
গবেষকদের ধারণা, এর পেছনে ‘নোসিবো ইফেক্ট’ কাজ করতে পারে। অর্থাৎ, কোনো সমস্যার নেতিবাচক ফল সম্পর্কে প্রবল প্রত্যাশা থাকলে সেই প্রত্যাশাই কখনো কখনো উপসর্গকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে, জেট ল্যাগ এড়াতে ভ্রমণের আগে ঘুমের সময় সামান্য পরিবর্তন, গন্তব্যে পৌঁছে সঠিক সময়ে আলোতে থাকা, হালকা ব্যায়াম এবং স্থানীয় সময় অনুযায়ী খাবার খাওয়ার অভ্যাস কাজে আসতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শরীরকে নতুন সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া এবং বিষয়টি নিয়ে অযথা আতঙ্কিত না হওয়া।
সাধারণত শরীর ধীরে ধীরে নতুন সময় অঞ্চলের সঙ্গে সামঞ্জস্য করে। পূর্ব দিকে ভ্রমণ করলে প্রতিদিন প্রায় এক ঘণ্টা এবং পশ্চিম দিকে গেলে প্রায় দেড় ঘণ্টা করে শরীরের জৈবিক ঘড়ি নতুন সময়ের দিকে এগোতে পারে। ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই জেট ল্যাগের উপসর্গ কমতে শুরু করে এবং অনেকের ক্ষেত্রে প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে স্বাভাবিক অনুভূতি ফিরে আসে।
এটি কোনও চিকিৎসকের পরামর্শ, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীর পরামর্শ নিন।
সূত্র: বিবিসি