এক প্রাসাদেই দরবার হল, জাদুঘর, গল্ফ কোর্স! ঘুরে দেখুন গুজরাতের রাজকীয় ঠিকানা

গুজরাতের বডোদরায় এমন একটি রাজপ্রাসাদ রয়েছে, যার বিশালতা দেখলে চোখ কপালে উঠতে পারে। নাম লক্ষ্মী বিলাস প্যালেস। গায়কোয়াড় রাজপরিবারের এই ঐতিহাসিক প্রাসাদ শুধু রাজকীয় স্থাপত্যের নিদর্শন নয়, এর বিস্তীর্ণ চত্বরের মধ্যে রয়েছে বাগান, গল্ফ কোর্স, শিল্পকর্মের সংগ্রহ এবং রাজপরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা স্মৃতি। প্রাসাদের একটি অংশ পর্যটকদের জন্যও উন্মুক্ত।

লক্ষী বিলাস রাজপ্রাসাদের অন্দর মহল। ছবি: সংগৃহীত

১৮৯০ সালে মহারাজা সয়াজীরাও গায়কোয়াড় তৃতীয়ের আমলে তৈরি এই প্রাসাদ ইন্দো-সারাসেনিক স্থাপত্যের সঙ্গে ইউরোপীয় নকশার মেলবন্ধনের অন্যতম উদাহরণ। সরকারি পর্যটন তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০০ একর জমির উপর বিস্তৃত এই প্রাসাদ বাকিংহাম প্যালেসের প্রায় চার গুণ আয়তনের এবং বিশ্বের বৃহত্তম ব্যক্তিগত আবাসগুলির অন্যতম।

প্রাসাদের ভেতরে ঢুকলে প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো রাজকীয় আভিজাত্য। বিশাল দরবার হলের মোজাইক, রঙিন কাচের কাজ এবং ভেনিসিয়ান ঝাড়বাতি একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে অসাধারণ পরিবেশ। ভারতীয় পুরাণ ও মহাকাব্যনির্ভর শিল্পকর্মের পাশাপাশি ইউরোপীয় শিল্পরীতির প্রভাবও এখানে স্পষ্ট।

লক্ষী বিলাস রাজপ্রাসাদের ভেতর পানির ফোয়ারা। ছবি: সংগৃহীত।

লক্ষ্মী বিলাস প্যালেসের শিল্প-ঐতিহ্যের অন্যতম আকর্ষণ রাজা রবি বর্মার চিত্রকর্ম। প্রাসাদ ও সংলগ্ন সংগ্রহে তার একাধিক উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে। বিশেষ করে ভারতীয় পুরাণের চরিত্র ও রাজপরিবারকে ঘিরে আঁকা ছবিগুলি পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কারণ।

শুধু ছবি দেখেই এই সফর শেষ হয় না। রাজপরিবারের অতীতের সঙ্গে পরিচিত হতে চাইলে যেতে পারেন মহারাজা ফতেহ সিংহ মিউজিয়ামে। একসময় রাজপরিবারের সন্তানদের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত এই জায়গাটিই পরে জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। সেখানে ভারতীয় ও ইউরোপীয় শিল্পীদের আঁকা ছবি, ভাস্কর্য, রাজকীয় সামগ্রী এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে। রাজা রবি বর্মার কাজের পাশাপাশি ভারত ও পূর্ব এশিয়ার শিল্প-সংস্কৃতির নানা নিদর্শনও দেখা যায়।

লক্ষী বিলাস রাজপ্রাসাদের দরবার হল। ছবি: সংগৃহীত।

মিউজিয়ামের সংগ্রহের আরেকটি আকর্ষণ হল বিভিন্ন মার্বেল ও ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য। ফলে শিল্পপ্রেমীদের কাছে এই অংশটি আলাদা গুরুত্ব পায়। শুধু রাজপ্রাসাদ ঘুরে দেখার বদলে এখানে এলে গায়কোয়াড় পরিবারের শিল্পের প্রতি অনুরাগ এবং পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাসও কিছুটা বোঝা যায়।

প্রাসাদের বাইরের অংশও কম আকর্ষণীয় নয়। বিশাল সবুজ এলাকা, বাগান, ফোয়ারা ও বিভিন্ন ভাস্কর্যের পাশাপাশি রয়েছে মোতি বাগ গল্ফ কোর্স। প্রাসাদ-চত্বরের এই বিস্তীর্ণ সবুজ পরিসর রাজকীয় আবাসনের আভিজাত্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারি পর্যটন তথ্যেও গল্ফ কোর্স ও বাগানকে প্রাসাদের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজপ্রাসাদের ভেতরের ভাস্কর্য। ছবি: সংগৃহীত

রাজপরিবারের শিশুদের যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত টয় ট্রেনের স্মৃতিও এই রাজকীয় পরিসরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। মিউজিয়ামের সামনে সেই পুরনো ছোট রেল ইঞ্জিন দেখার সুযোগ রয়েছে বলে পর্যটন-তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাসাদের ইতিহাস বুঝে ঘুরতে চাইলে অডিয়ো গাইডের ব্যবস্থাও রয়েছে বলে বিভিন্ন পর্যটন সূত্রে উল্লেখ আছে। এর মাধ্যমে স্থাপত্য, শিল্পকর্ম এবং রাজপরিবারের ইতিহাস সম্পর্কে তথ্য শোনা যায়। তবে অডিয়ো ট্যুরের বর্তমান ব্যবস্থা ও ভাষা যাওয়ার আগে কর্তৃপক্ষের কাছে নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো, কারণ এই সুবিধা সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলাতে পারে।

লক্ষী বিলাস রাজপ্রাসাদ। ছবি: সংগৃহীত

কখন যাবেন, টিকিট কত?

বর্তমান সরকারি পর্যটন তথ্য অনুযায়ী লক্ষ্মী বিলাস প্যালেস সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে এবং সোমবার বন্ধ। তবে বিভিন্ন পর্যটন সূত্রে খোলার সময়ের সামান্য পার্থক্য দেখা যায়। তাই যাওয়ার আগে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সময় নিশ্চিত করে নেওয়াই ভালো।

টিকিটের ক্ষেত্রেও পুরনো ও বর্তমান তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রাসাদের পরিচালনাকারী গায়কোয়াড় এন্টারপ্রাইজের ওয়েবসাইটে বর্তমানে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ২৫০ টাকা এবং বিদেশি পর্যটকদের জন্য ৫২৫ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাইটে সোমবার বন্ধ থাকার কথাও জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে, মহারাজা ফতেহ সিংহ মিউজিয়ামের সরকারি পর্যটন তথ্য অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের প্রবেশমূল্য ৬০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ৪০ টাকা; মিউজিয়ামটি সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকার কথা বলা হয়েছে।

তাই গুজরাত ভ্রমণের পরিকল্পনায় বডোদরাকে রাখলে লক্ষ্মী বিলাস প্যালেস হতে পারে ইতিহাস, রাজকীয় স্থাপত্য ও শিল্পের একসঙ্গে স্বাদ নেওয়ার জায়গা। প্রাসাদের বিশালতা যেমন চমকে দেবে, তেমনই দরবার হল, রবি বর্মার শিল্পকর্ম, মিউজিয়াম এবং সবুজে ঘেরা রাজকীয় পরিসর এই সফরকে করে তুলতে পারে অন্য রকম এক অভিজ্ঞতা।