ভাবুন, ঘুম ভাঙছে জানলার ওপারে নীল সমুদ্র দেখে। ঘর থেকে বেরোনোর প্রয়োজন নেই। নিজস্ব ডেকেই জাকুজিতে বসে সূর্যোদয় দেখা যাচ্ছে। একটু পর ব্যক্তিগত বাটলার পছন্দের খাবার নিয়ে হাজির। বিকালে স্পা, সন্ধ্যায় জ্যাজের আসর, আর রাতে তারাভরা আকাশের নীচে সিনেমা।
এ কোনও পাঁচতারা রিসর্টের কল্পিত ছবি নয়। সমুদ্রের বুকেই এমন বিলাসী ছুটির আয়োজন নিয়ে আসছে ‘আমনগতি’ যা একটি আল্ট্রা-লাক্সারি সুপারইয়ট। ২০২৭ সালের মে মাসে যাত্রা শুরু করার কথা এই অভিনব সমুদ্রযানের। তবে তার আগেই এর দাম ও পরিষেবার কারণে ভ্রমণপ্রেমীদের কৌতূহলের কেন্দ্রে চলে এসেছে এটি।
নামেই মিলেছে দুই সংস্কৃতির ছোঁয়া
‘আমনগতি’ নামটির মধ্যেই রয়েছে আলাদা গল্প। ‘আমন’ আরবি শব্দ, যার অর্থ শান্তি। আর ‘গতি’ সংস্কৃত শব্দ। দুই শব্দ মিলিয়ে নামের অর্থ দাঁড়ায় অনেকটা ‘শান্তিপূর্ণ যাত্রা’।
নামে ভারতীয় শব্দ থাকলেও এটি ভারতের কোনও প্রকল্প নয়। আমন গ্রুপ, ক্রুজ সৌদি এবং নেদারল্যান্ডসের সিনোট ইয়ট আর্কিটেকচারের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে এই সুপারইয়ট।
আর এর সবচেয়ে বড় চমক এখানে বিলাসিতা শুধু চোখে দেখার জন্য নয়, বরং অতিথির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রতিটি মুহূর্তকে ঘিরেই পরিকল্পনা করা হয়েছে।
৯৪ অতিথির জন্য ২০৭ কর্মী!
সাধারণ বিলাসবহুল হোটেলে অতিথি পরিষেবার জন্য পর্যাপ্ত কর্মী থাকেন। কিন্তু আমনগতির ব্যবস্থা আরও এক ধাপ এগিয়ে।
এখানে একসঙ্গে সর্বোচ্চ ৯৪ জন অতিথি থাকতে পারবেন। তাদের পরিষেবায় থাকবেন প্রায় ২০৭ জন কর্মী। অর্থাৎ অতিথি-পিছু কর্মীর সংখ্যা প্রায় দু’জনের কাছাকাছি।
শুধু ঘর পরিষ্কার রাখা নয়, অতিথির লাগেজ গোছানো থেকে শুরু করে সফর শেষে আবার ব্যাগ গুছিয়ে দেওয়া ব্যক্তিগত হোস্টের দায়িত্বে থাকবে এমন নানা কাজ। কোনও কিছু প্রয়োজন হলে আলাদা করে খোঁজাখুঁজি করারও দরকার নেই।
নিজের ঘরেই ব্যক্তিগত বাটলার
আমনগতির স্যুটে থাকার অভিজ্ঞতাকে হোটেলের ঘরের সঙ্গে তুলনা করলে ভুল হবে। কারণ এখানে অতিথিদের জন্য রাখা হয়েছে ব্যক্তিগত পরিষেবার এক দীর্ঘ তালিকা।
খিদে পেয়েছে? ব্যক্তিগত বাটলার খাবার পৌঁছে দেবেন। আবার প্রিমিয়াম স্যুটে থাকলে পাওয়া যাবে ব্যক্তিগত শেফের পরিষেবাও। তিনি সেই স্যুটে থাকা অতিথিদের পছন্দ ও রুচি অনুযায়ী খাবার তৈরি করবেন।
প্রতিটি স্যুটে থাকবে ব্যক্তিগত বার। সেখানে বিভিন্ন ধরনের পানীয়ের ব্যবস্থা থাকবে। অ্যালকোহল না চাইলে অতিথির পছন্দমতো অন্য পানীয়ও তৈরি করে দিতে পারবেন বারটেন্ডার।
ঘর ছাড়াই স্পা-র বিলাসিতা
আমনগতির বিলাসিতার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ওয়েলনেস। প্রায় ১১৯০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে তৈরি হবে আমন স্পা অ্যান্ড ওয়েলনেস। সেখানে থাকছে জাপানি ধাঁচের প্লাঞ্জ পুল, তুর্কি হামাম এবং রাশিয়ান বানিয়ার মতো স্টিম-বাথের ব্যবস্থা।
প্লাঞ্জ পুলে গরম ও ঠান্ডা জলে শরীর ডোবানোর আলাদা ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি থাকবে সবুজে ঘেরা ‘সেরিনিটি গার্ডেন’, ত্বকের পরিচর্যা, হেয়ার ও নেল সেলুন এবং বিভিন্ন ওয়েলনেস পরিষেবা।
নিজের স্যুটেই জাকুজ়ি, সঙ্গে সমুদ্রের দৃশ্য
আমনগতির প্রিমিয়াম স্যুটের ব্যক্তিগত ডেক হতে পারে ছুটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাগুলির একটি। সেখানে থাকবে জাকুজ়ি বা হট টাব। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে উষ্ণ জলে আরামে বসে থাকার সুযোগ তো থাকছেই। প্রয়োজন হলে ব্যক্তিগত কর্মী তোয়ালে বা পছন্দের পানীয় নিয়েও হাজির হবেন।
আর প্রযুক্তির ব্যবহারও কম নয়। ঘরের বিভিন্ন গ্যাজেট আইপ্যাডের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। প্রয়োজনমতো দেওয়াল থেকে নেমে আসবে নির্দিষ্ট গ্যাজেট পুরো ব্যবস্থাটিই যেন ভবিষ্যতের কোনও বিলাসবহুল বাড়ি।
পরিবারের জন্য সমুদ্রের বুকে ‘ভিলা’
পরিবার নিয়ে ভ্রমণ করলে ব্যক্তিগত পরিসরের অভাব হবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রিমিয়াম ও ডিলাক্স স্যুট একত্র করে তৈরি করা যাবে একটি বড় ‘ফ্যামিলি ভিলা’।
অর্থাৎ একই সঙ্গে কয়েকটি ঘর ব্যবহার করেও পরিবারের সদস্যরা নিজেদের মতো করে ছুটি কাটাতে পারবেন।
তিন পুল, তার মধ্যে সমুদ্রের বুকেও!
জলপ্রেমীদের জন্যও রয়েছে বিশেষ আয়োজন। আমনগতিতে থাকবে মোট তিনটি পুল।
এর মধ্যে দু’টি হবে সমুদ্রের সঙ্গে সংযুক্ত অর্ধ-নিমজ্জিত সি-পুল। আর তৃতীয়টি হবে খোলা আকাশের নীচে উষ্ণ নোনা জলের ইনফিনিটি পুল।
পুলের পাশে থাকবে সান লাউঞ্জার ও ডে-বেড। বিকালে সেখানে মিলবে আফটারনুন টি, আর সূর্যাস্তের সময় পরিবেশন করা হবে বিশেষ পানীয়।
অর্থাৎ সমুদ্রযাত্রার পাশাপাশি পুলের ধারে বসেও উপভোগ করা যাবে ‘গোল্ডেন আওয়ার’।
শিল্প, বই আর সিনেমার জন্য আলাদা আয়োজন
শুধু খাওয়া-দাওয়া আর স্পা নয়, আমনগতিতে অবসর কাটানোর জন্যও রয়েছে নানা ব্যবস্থা।
জাহাজের ভিতরে থাকবে আর্ট গ্যালারি, যেখানে শিল্পকর্ম ও ভাস্কর্য দেখার সুযোগ থাকবে। বইপ্রেমীদের জন্য থাকবে লাইব্রেরি। তরুণ অতিথিদের জন্য রাখা হয়েছে গেমিং জোন ও ইয়ুথ লাউঞ্জ।
সিনেমাপ্রেমীরা ইনডোর থিয়েটারে ছবি দেখতে পারবেন। আবার চাইলে খোলা ডেকে বসে রাতের আকাশের নীচেও সিনেমা দেখার ব্যবস্থা থাকবে।
সন্ধ্যা নামলেই বদলে যাবে পরিবেশ
রাতের বিনোদনের জন্য থাকবে জ্যাজ ক্লাব। সেখানে আন্তর্জাতিক শিল্পীদের পারফরম্যান্স উপভোগ করতে পারবেন অতিথিরা।
এ ছাড়াও থাকবে বিভিন্ন লাউঞ্জ, বার এবং সিগার লাউঞ্জ। অর্থাৎ দিনের শান্ত সমুদ্রযাত্রা শেষ করে রাতটাও কাটানো যাবে নিজের পছন্দের বিনোদনে।
খাবারের জন্য চার রেস্তোরাঁ
খাবারের ক্ষেত্রেও কমতি থাকছে না। আমনগতিতে থাকবে চারটি বিশেষ রেস্তোরাঁ আলিরা, হিওরি, আকারি এবং আমন গ্রিল।
রেস্তোরাঁয় বসে খেতে ইচ্ছে না করলে রয়েছে ব্যক্তিগত ডাইনিংয়ের বিকল্প। এমনকি মিষ্টিপ্রেমীদের জন্য থাকছে আলাদা ডেজার্ট রেস্তোরাঁ।
এর পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পানশালা ও সিগার লাউঞ্জও থাকবে।
খেলাধুলার ব্যবস্থাও রয়েছে
ছুটিতে শরীরচর্চার অভ্যাস যাতে বাদ না যায়, তার জন্য রয়েছে ফিটনেস স্টুডিয়ো। যোগাসন, মেডিটেশন ও পাইলেটসের জন্যও আলাদা জায়গা থাকবে।
জলক্রীড়া থেকে ভার্চুয়াল গল্ফ বিনোদনের নানা বিকল্প রাখা হয়েছে। এমনকি আমনগতিতে থাকবে দু’টি হেলিপ্যাডও।
কত খরচ এই স্বপ্নের সমুদ্রভ্রমণে?
এত আয়োজনের দাম যে সাধারণ ছুটির বাজেটের মধ্যে থাকবে না, সেটাই স্বাভাবিক।
আমনগতিতে এক রাতের জন্য ন্যূনতম খরচ শুরু হচ্ছে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮.৬ লাখ টাকা থেকে। আর সবচেয়ে বিলাসবহুল প্রিমিয়াম আমন স্যুটে থাকার খরচ পৌঁছতে পারে প্রতি রাতে প্রায় ২৬ লাখ টাকা পর্যন্ত।
তবে ইচ্ছে করলেই এক রাতের জন্য বুকিং করে ফিরে আসা যাবে না। আমনগতিতে যাত্রার ক্ষেত্রে ন্যূনতম তিন রাত থাকতে হবে।
অর্থাৎ সমুদ্রের বুকে কয়েক দিনের এমন রাজকীয় ছুটি কাটাতে গেলে খরচটা যে কয়েক লক্ষের গণ্ডি পেরিয়ে যাবে, তা বলাই যায়।
তবু প্রশ্ন থেকে যায় এত বিপুল অর্থ খরচ করে সমুদ্রে ভাসতে মানুষ কেন যাবেন?
সম্ভবত উত্তরটা রয়েছে আমনগতির ভাবনাতেই। এখানে যাত্রার গন্তব্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ যাত্রাপথের প্রতিটি মুহূর্তকে বিলাসবহুল অভিজ্ঞতায় পরিণত করা।
২০২৭ সালের মে মাসে যখন আমনগতি সমুদ্রে নামবে, তখন বোঝা যাবে এই ভাসমান বিলাসপ্রাসাদ সত্যিই বিশ্বের অভিজাত ভ্রমণের সংজ্ঞা কতটা বদলাতে পারে।