পর্যটকদের ভিড় নয়, রবিবার নিজেদের মতো করে বাঁচে মাওলিননং

পর্যটনকেন্দ্র মানেই সাধারণত সপ্তাহান্তে ভিড়। ছুটির দিন যত এগিয়ে আসে, ততই বেড়ে যায় পর্যটকদের আনাগোনা। কিন্তু মেঘালয়ের একটি ছোট্ট গ্রামে ছবিটা একেবারেই আলাদা। সপ্তাহের ছুটির দিনে পর্যটকদের জন্য কার্যত বন্ধ থাকে গ্রামের দরজা। কারণ, সেই দিনটি গ্রামের মানুষের নিজেদের জন্য।

মেঘালয়ের পূর্ব খাসি পাহাড়ের মাওলিননং বহু বছর ধরেই পরিচ্ছন্নতার জন্য পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সাজানো বাড়িঘর, সবুজে ঘেরা রাস্তা এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় জায়গাটি যেন প্রকৃতির কোলে সাজানো একটি শান্ত জনপদ। ‘ডিসকভার ইন্ডিয়া’ পত্রিকার সূত্রে একসময় গ্রামটি এশিয়ার ‘সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি পায়। সেই পরিচিতিই পরে মাওলিননংকে পর্যটনের মানচিত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

শিলং থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়বে পরিচ্ছন্নতার প্রতি বাসিন্দাদের যত্ন। বাড়ির সামনে ছোট ছোট ফুলের বাগান, লতানো গাছে সাজানো সীমানা, পরিচ্ছন্ন রাস্তা এবং প্রায় সর্বত্র রাখা বাঁশের তৈরি ডাস্টবিন সবকিছুতেই রয়েছে পরিকল্পনার ছাপ।

তবে মাওলিননংয়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ নিয়মগুলির একটি হল রবিবার পর্যটকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা। দিনের বেলা বাইরে থেকে এসে গ্রাম ঘুরে দেখতে চাইলে এই নিয়ম মানতেই হবে। অবশ্য গ্রামের হোমস্টেতে থাকা অতিথিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা হতে পারে।

এই গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়বে পরিচ্ছন্নতার প্রতি বাসিন্দাদের যত্ন (ছবি: সংগৃহীত)

কেন রবিবারেই বন্ধ থাকে গ্রাম?

এর পেছনে পর্যটন কমানোর কোনও উদ্দেশ্য নেই। বরং স্থানীয় মানুষের ব্যক্তিগত সময় ও সংস্কৃতিকে সম্মান করতেই এই সিদ্ধান্ত।

গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই খাসি সম্প্রদায়ের এবং খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। রবিবার তাদের কাছে ধর্মীয় ও পারিবারিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। সপ্তাহের অন্য দিনগুলিতে কাজ, দোকানপাট ও পর্যটকদের সামলানোর ব্যস্ততা থাকলেও রবিবার তারা নিজেদের মতো করে সময় কাটাতে চান। অনেকে গির্জায় যান, পরিবারকে সময় দেন, আবার কেউ সারা সপ্তাহের কাজের পর একটু বিশ্রাম নেন।

সপ্তাহান্তেই পর্যটকদের ভিড় সবচেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে ওই দিন পর্যটকদের আনাগোনা নিয়ন্ত্রণ করে গ্রামবাসীরা নিজেদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্য কিছুটা নিরিবিলি সময় পান। স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করেই এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে বলে জানা যায়।

পর্যটনের জন্য স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রাকে বিসর্জন না দিয়ে কী ভাবে দুটির মধ্যে ভারসাম্য রাখা যায়, মাওলিননঙের এই সিদ্ধান্ত সেই প্রশ্নটিই সামনে আনে। পর্যটন থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই একটি জায়গার নিজস্ব সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিসর অক্ষুণ্ণ রাখাও জরুরি।

প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাস দেখার জন্য জায়গাটি বেশ আকর্ষণীয় (ছবি: সংগৃহীত)

মাওলিননংয়ে গেলে কী দেখবেন?

গ্রামের সৌন্দর্য দেখার পাশাপাশি এখানকার প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা কয়েকটি জায়গা পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।

এর মধ্যে রয়েছে ‘স্কাই ভিউ পয়েন্ট’। বাঁশ দিয়ে তৈরি উঁচু একটি মাচানের ওপর দাঁড়ালে চারপাশের সবুজ পাহাড় ও বিস্তীর্ণ ভূদৃশ্য চোখে পড়ে। পরিষ্কার দিনে এখান থেকে বাংলাদেশের অংশও দেখা যায়। প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাস দেখার জন্য জায়গাটি বেশ আকর্ষণীয়।

আরও একটি উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ ‘লিভিং রুট ব্রিজ’। মানুষের তৈরি কংক্রিটের সেতুর বদলে প্রকৃতির নিজস্ব উপাদান ব্যবহার করে গড়ে ওঠা এই সেতু দেখার অভিজ্ঞতা আলাদা। গাছের শিকড় দীর্ঘ সময় ধরে বেড়ে, পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে ও শক্ত হয়ে নদীর দুই প্রান্তকে যুক্ত করেছে। থাইলং নদীর কাছে পৌঁছতে বেশ কিছুটা সিঁড়ি দিয়ে নামতে হয়। পথটি কিছুটা পরিশ্রমসাধ্য হলেও প্রকৃতির এই জীবন্ত স্থাপত্য দেখার অভিজ্ঞতা সেই পরিশ্রম সার্থক করে।

মাওলিননং থেকে ডাউকিও ঘুরে দেখা যায়। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছের এই অঞ্চলটির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ডাউকি নদী। নদীতে নৌবিহারের সুযোগও রয়েছে।

শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাই নয়, সংস্কৃতিও আকর্ষণ

মাওলিননংয়ের বিশেষত্ব শুধু ঝকঝকে রাস্তা বা বাঁশের ডাস্টবিনে সীমাবদ্ধ নয়। এখানকার খাসি সম্প্রদায়ের সামাজিক রীতিনীতিও পর্যটকদের আগ্রহের অন্যতম কারণ।

খাসি সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। সন্তান মায়ের পদবি বহন করে এবং পরিবারের সম্পত্তির উত্তরাধিকার সাধারণত কনিষ্ঠ কন্যার হাতে যায়। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বিবাহের পর পুরুষ স্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন। আধুনিকতার প্রভাবের মধ্যেও এই সামাজিক কাঠামোর অনেকটাই এখনও টিকে রয়েছে।

ফলে মাওলিননং ভ্রমণ মানে শুধু সবুজ প্রকৃতি দেখা নয়; স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন ও সংস্কৃতির কাছাকাছি যাওয়ারও সুযোগ।

কোথায় থাকবেন?

মাওলিননংয়ে স্থানীয়দের পরিচালিত একাধিক হোমস্টের ব্যবস্থা রয়েছে। চাইলে সেখানে থেকে গ্রামের পরিবেশকে আরও কাছ থেকে অনুভব করা যায়। আবার শিলংকে ঘাঁটি করে গাড়িতে করেও মাওলিননং ঘুরে আসা সম্ভব।

তবে রবিবার ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকেই স্থানীয় নিয়ম ও থাকার ব্যবস্থার বিষয়ে খোঁজ নেওয়া ভালো। কারণ দিনের পর্যটন ও হোমস্টেতে থাকা অতিথিদের জন্য নিয়ম এক নয়।

কী ভাবে যাবেন?

মাওলিননং যেতে হলে প্রথমে গুয়াহাটি বা শিলং পৌঁছনো সুবিধাজনক। দেশের বিভিন্ন বড় শহর থেকে ট্রেন বা বিমানে গুয়াহাটি যাওয়া যায়। সেখান থেকে সড়কপথে শিলং হয়ে মাওলিননং পৌঁছনো যায়।

শিলং থেকেও গাড়ি ভাড়া করে সরাসরি গ্রামে যাওয়া সম্ভব। শিলংয়ের বিমান পরিষেবা তুলনামূলক সীমিত হওয়ায় অনেক পর্যটক গুয়াহাটিকে যাত্রার মূল কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেন।

তবে মাওলিননং ঘুরতে যাওয়ার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মনে রাখা দরকার এখানে পর্যটক হওয়া মানে শুধু সুন্দর জায়গা দেখা নয়, স্থানীয় মানুষের নিয়ম ও জীবনযাত্রাকেও সম্মান করা। রবিবারের নীরবতাটুকু তাই এই গ্রামের সৌন্দর্যেরই একটি অংশ।