ভাবুন তো, ক্যালিফোর্নিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে দাঁড়িয়ে আছেন, সামনে নীল সমুদ্র, চারপাশে রেডউডের বিশাল বন আর দূরে আঙুরের বাগান। হঠাৎ চোখে পড়ল কাঠের তৈরি একটি পুরোনো দুর্গ। তার পাশে রুশ অর্থোডক্স গির্জা, মাথায় ক্রুশ, আর সাইনবোর্ডে লেখা সিরিলিক অক্ষর।
আপনি কি বিশ্বাস করবেন, এই জায়গাটিই একসময় ছিল রুশ সাম্রাজ্যের দক্ষিণ প্রান্ত?
সান ফ্রান্সিসকো থেকে প্রায় ৯০ মাইল উত্তরে সোনোমার নির্জন উপকূলে রয়েছে ফোর্ট রস একসময়কার রুশ বসতি, যা ১৮১২ থেকে ১৮৪২ সাল পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়ের সাক্ষী।
রাশিয়া কীভাবে ক্যালিফোর্নিয়ায় এলো?
১৭শ’ শতকে রুশ অভিযাত্রী ও পশম ব্যবসায়ীরা সাইবেরিয়া পেরিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে পৌঁছে যায়। পরে আলাস্কায় গড়ে ওঠে রাশিয়ার উপনিবেশ।
কিন্তু আলাস্কার কঠিন আবহাওয়ায় কৃষিকাজ ছিল অত্যন্ত কঠিন। খাদ্যের সংকটে পড়তে থাকা রুশ বসতিগুলোর জন্য উষ্ণ অঞ্চলে একটি কৃষি ও বাণিজ্যকেন্দ্র দরকার হয়ে পড়ে। সেই প্রয়োজন থেকেই দক্ষিণে চোখ পড়ে ক্যালিফোর্নিয়ার দিকে।
১৮১২ সালে ২৫ জন রুশ এবং প্রায় ৮০ জন আলাস্কান শিকারি এসে সোনোমার উপকূলে গড়ে তোলেন ফোর্ট রস। সমুদ্রভোঁদড় শিকার, কৃষিকাজ, জাহাজ নির্মাণ ও বাণিজ্যের উদ্দেশে ধীরে ধীরে এটি একটি ব্যস্ত উপনিবেশে পরিণত হয়।
দুর্গের ভেতরে ছিল এক বহুজাতিক সমাজ
ফোর্ট রস শুধু রুশদের বসতি ছিল না। এখানে রুশ, আলেউত, কোডিয়াক, ফিনিশ, হাওয়াইয়ান এবং স্থানীয় কাশায়া পোমো ও কোস্ট মিওক জনগোষ্ঠীর মানুষ পাশাপাশি বসবাস করতেন।
১৮৩০-এর দশকে এখানকার জনসংখ্যা প্রায় ৪০০-তে পৌঁছেছিল। দুর্গের বাইরে ছিল গ্রাম, কর্মশালা, বেকারি, বাষ্পস্নানের ব্যবস্থা এবং প্রায় ৬০টি ভবন।
এখানেই তৈরি হয়েছিল ক্যালিফোর্নিয়ার প্রথম দিককার সমুদ্রযাত্রার উপযোগী জাহাজ। তৈরি হয়েছিল ইট, কাচ এবং বায়ুচালিত কলও।
আর একটি চমকপ্রদ তথ্য হলো, ১৮১৭ সালে বর্তমান সোনোমা কাউন্টিতে প্রথম আঙুরগাছ রোপণের কৃতিত্বও রুশদের। আজকের বিখ্যাত ক্যালিফোর্নিয়া ওয়াইন অঞ্চলের ইতিহাসে তাই এই ভুলে যাওয়া রুশ অধ্যায়েরও একটি জায়গা রয়েছে।
স্প্যানিশদের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, ছিল গোপন বাণিজ্য
তখন ক্যালিফোর্নিয়া ছিল স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের অধীনে। রুশরা দক্ষিণে এগিয়ে আসছে এ নিয়ে স্প্যানিশদের উদ্বেগও ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি কোনও বড় সংঘর্ষ হয়নি। বরং সীমান্তের দুই সাম্রাজ্যই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। রুশরা সমুদ্রভোঁদড়ের চামড়া ও বিভিন্ন পণ্য দিত, আর বিনিময়ে পেত খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
এই বাণিজ্যিক সম্পর্কই ফোর্ট রসকে ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
কেন হারিয়ে গেল রুশ ক্যালিফোর্নিয়া?
ফোর্ট রসের মূল উদ্দেশ্য ছিল আলাস্কার রুশ উপনিবেশগুলোতে খাদ্য সরবরাহ করা এবং লাভজনক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা। কিন্তু দুটো লক্ষ্যই শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি সফল হয়নি। অতিরিক্ত শিকারের ফলে সমুদ্রভোঁদড়ের সংখ্যা কমে যায়। কৃষিকাজও প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। কারণ উপকূলীয় কুয়াশা, ইঁদুরের উপদ্রব এবং অন্যান্য সমস্যায় উৎপাদন সীমিত ছিল।
১৮৩৯ সালে ব্রিটিশ হাডসন’স বে কোম্পানি রুশ আলাস্কায় খাদ্য সরবরাহ করতে শুরু করলে ক্যালিফোর্নিয়ায় রুশ বসতির প্রয়োজনীয়তা আরও কমে যায়।
১৮৪১ সালে ফোর্ট রসের ভবন ও সম্পদ সুইস অভিবাসী জন সাটার কিনে নেন। আর অবিশ্বাস্যভাবে, মাত্র কয়েক বছর পর সাটারের জমিতেই সোনার সন্ধান মেলে, যা শুরু করে দেয় ঐতিহাসিক ক্যালিফোর্নিয়া গোল্ড রুশ।
আজকের ফোর্ট রস কেমন?
আজকের ফোর্ট রস অনেকটাই নিঃসঙ্গ। সান ফ্রান্সিসকো থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার মনোরম ড্রাইভ। পথে গোল্ডেন গেটের কুয়াশা, সোনোমার আঙুরের বাগান, রেডউড বন আর প্রশান্ত মহাসাগরের নাটকীয় উপকূল। তারপর হঠাৎই দেখা যায় রুশ অর্থোডক্স চ্যাপেল, কাঠের স্টকেড আর পুরোনো দুর্গ।
প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে খাড়া পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়ালে চারপাশের নীরবতা যেন আপনাকে ২০০ বছর পেছনে নিয়ে যায়। ঢেউয়ের গর্জন, রেডউডের বন আর দূরের চ্যাপেলের ঘণ্টাধ্বনির মাঝে তখন সহজেই বোঝা যায়, কেন এই জায়গাটিকে অনেকে ‘ভুলে যাওয়া সাম্রাজ্য’ বলে।
আর ফোর্ট রসের গল্প শুধু রাশিয়ার গল্প নয়। এটি ক্যালিফোর্নিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠী, স্প্যানিশ ও মেক্সিকান শাসন, রুশ বাণিজ্য, আলাস্কার উপনিবেশ, আমেরিকার পশ্চিমমুখী বিস্তার সবকিছুকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়।
ক্যালিফোর্নিয়ার পথে গেলে তাই সান ফ্রান্সিসকো, নাপা বা সোনোমার পরিচিত পর্যটনস্থানের বাইরে একদিন সময় নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন এই বিস্মৃত রুশ উপনিবেশে। কারণ ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসে রাশিয়ার এই ছোট্ট অধ্যায়টি সত্যিই অবিশ্বাস্য আর হয়তো এতদিন আমরা সেটিকে অযথাই ভুলে ছিলাম।
সূত্র: বিবিসি