রাজশাহী মানেই শুধু পদ্মার পাড়, সবুজ প্রকৃতি কিংবা আমের মিষ্টি ঘ্রাণ নয়। এই শহরের মাটির গভীরে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। আর সেই ইতিহাসকে খুব কাছ থেকে জানতে হলে ভ্রমণ করতে হবে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে। প্রাচীন প্রত্ননিদর্শন, পাথরের মূর্তি ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের বিশাল সংগ্রহের কারণে এটি রাজশাহীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান।
১৯১০ সালে কুমার শরৎ রায়ের উদ্যোগে ‘বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়। বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস, প্রত্নসম্পদ ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ এবং গবেষণার উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে জাদুঘরটি ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালায় পরিণত হয়। ১৯৬৪ সাল থেকে এর পরিচালনার দায়িত্ব নেয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে জাদুঘরটি গবেষক, ইতিহাসপ্রেমী ও সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য জ্ঞান ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলোর একটি হলো এর বিশাল পাথরের মূর্তি সংগ্রহ। এখানে প্রায় তিন হাজার পাথরের মূর্তি রয়েছে বলে জানা যায়। এত বিপুল সংখ্যক পাথরের মূর্তির সংগ্রহ দেশের অন্য কোনও জাদুঘরে নেই।
এসব মূর্তির দিকে তাকালে প্রাচীন বাংলার শিল্পীদের দক্ষতা ও নান্দনিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। পাথরে খোদাই করা প্রতিটি অবয়ব যেন কয়েকশ কিংবা কয়েক হাজার বছর আগের মানুষের জীবন, বিশ্বাস, ধর্মীয় আচার ও শিল্পচর্চার গল্প বলে।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি ও প্রাচীন শিল্পকর্ম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্রহ্মা, দুর্গাসিংহ বাহিনী, গণেশ, মা ও শিশু এবং খাদিরবনী তারাসহ নানা প্রত্ননিদর্শন।
এসব নিদর্শন শুধু দর্শনীয় বস্তু নয়, এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির নানা অধ্যায়। প্রত্নতত্ত্বের প্রতি আগ্রহী দর্শনার্থীরা এসব নিদর্শনের মাধ্যমে বরেন্দ্র অঞ্চলের অতীত সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ পান।
জাদুঘরে প্রবেশ করলেই আধুনিক শহরের কোলাহল থেকে যেন অন্য এক সময়ে চলে যাওয়া যায়। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন নিদর্শন আর পাথরে খোদাই করা মূর্তিগুলো দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরে বাংলার অতীতের এক সমৃদ্ধ চিত্র।
বিশেষ করে যারা ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, স্থাপত্য ও প্রাচীন শিল্পকলায় আগ্রহী, তাদের জন্য বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর হতে পারে বিশেষ আকর্ষণের জায়গা। শিক্ষার্থী ও গবেষকদের কাছেও এর গুরুত্ব অনেক।
রাজশাহী ভ্রমণের পরিকল্পনায় বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরকে রাখতে পারেন তালিকার ওপরের দিকেই। কারণ একটি জাদুঘর ঘুরে দেখার পাশাপাশি এখানে পাওয়া যায় বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে কাছ থেকে জানার সুযোগ।
রাজশাহীর অন্যান্য দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার পাশাপাশি কয়েক ঘণ্টা সময় নিয়ে এই জাদুঘরে গেলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় যোগ হবে ভিন্ন মাত্রা। ছবি তোলার পাশাপাশি প্রাচীন নিদর্শনগুলো সম্পর্কে জানার মাধ্যমে ভ্রমণটি হয়ে উঠতে পারে আরও অর্থবহ।
রাজশাহীকে যারা শুধু একটি শহর হিসেবে দেখতে চান না, বরং এর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গল্প জানতে চান, তাদের জন্য বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর অবশ্যই ঘুরে দেখার মতো জায়গা।
প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সংরক্ষিত এসব প্রত্নসম্পদ আজও নীরবে বলে যাচ্ছে বরেন্দ্রভূমির সুদীর্ঘ ইতিহাসের কথা। তাই রাজশাহী ভ্রমণে ইতিহাসের সেই নীরব গল্প শুনতে একবার ঘুরে আসতেই পারেন বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর থেকে।