বিদেশ ভ্রমণে খরচ কমাতে পর্যটকের বুদ্ধিদীপ্ত টিপস

বিদেশ ভ্রমণ এখন অনেকের কাছেই স্বপ্নপূরণের পাশাপাশি নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। তবে নতুন কোনও দেশে ঘুরতে যাওয়ার আগে সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে ভ্রমণের বাজেট অল্প সময়েই বেড়ে যেতে পারে। বিমান টিকিট, থাকার ব্যবস্থা, খাবার, ঘোরাঘুরি থেকে শুরু করে কেনাকাটা সব ক্ষেত্রেই কিছু কৌশল মেনে চললে একই ভ্রমণে খরচ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

একক ভ্রমণকারী ও ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা জয়ন্ত শর্মা এমনই কিছু ভ্রমণ কৌশল শেয়ার করেছেন, যেগুলো নিয়ে সাধারণত খুব বেশি আলোচনা হয় না। তার পরামর্শ অনুযায়ী, শুধু সস্তা বিমান টিকিট খোঁজাই নয়, ভ্রমণের আগে ও ভ্রমণের সময় ছোট ছোট সিদ্ধান্তের মাধ্যমেও উল্লেখযোগ্য অর্থ সাশ্রয় করা যায়।

বিমান টিকিটে সাশ্রয়ের কৌশল

ভ্রমণের খরচ কমানোর ক্ষেত্রে প্রথমেই আসে বিমান টিকিট। জয়ন্তের পরামর্শ, টিকিট খোঁজার সময় একাধিক মাধ্যম ব্যবহার করে ভাড়া তুলনা করা উচিত। তিনি স্কাইস্ক্যানার ও গুগল ফ্লাইটস একসঙ্গে ব্যবহার করার কথা বলেছেন।

তার মতে, মঙ্গলবার ও বুধবার অনেক সময় তুলনামূলক কম দামে টিকিট পাওয়া যেতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনও দিনেই সব সময় ভাড়া কম থাকবে, এমন নয়। তাই ভ্রমণের তারিখে কিছুটা নমনীয়তা থাকলে বিভিন্ন দিনের ভাড়া তুলনা করে টিকিট বুক করা ভালো।

এ ছাড়া শেষ মুহূর্তের বুকিংয়ের পরিবর্তে অন্তত ছয় থেকে আট সপ্তাহ আগে টিকিট কাটার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এতে তুলনামূলক ভালো দামে টিকিট পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিদেশে কার্ড ব্যবহারে সতর্কতা

বিদেশ ভ্রমণে মুদ্রা বিনিময়ের খরচও মোট বাজেটে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। জয়ন্ত সাধারণ ব্যাংক কার্ডের পরিবর্তে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের জন্য বিশেষায়িত কার্ড ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, ওয়াইজ বা রেভলুটের মতো সেবার কার্ড ব্যবহার করলে মুদ্রা রূপান্তরের অতিরিক্ত খরচ কমানো সম্ভব হতে পারে।

তবে বিদেশে যাওয়ার আগে কার্ডের মুদ্রা রূপান্তর হার, লেনদেনের খরচ ও অন্যান্য শর্ত ভালোভাবে জেনে নেওয়া জরুরি।

একা গেলে হোটেলের বদলে হোস্টেল

এককভাবে ভ্রমণকারী বা ব্যাকপ্যাকারদের জন্য হোটেলের পরিবর্তে হোস্টেল বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জয়ন্ত। তার মতে, এতে শুধু থাকার খরচ কমে না, বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।

জাপান ও সুইজারল্যান্ডের মতো তুলনামূলক ব্যয়বহুল দেশেও হোটেলের পরিবর্তে হোস্টেল বেছে নিলে থাকার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তবে হোস্টেল বেছে নেওয়ার আগে অবস্থান, নিরাপত্তা, সুযোগ-সুবিধা ও পর্যটকদের মতামত দেখে নেওয়া ভালো।

কেনাকাটায় মিলতে পারে করছাড়

বিদেশ ভ্রমণে কেনাকাটার সময় পর্যটকদের জন্য থাকা করছাড়ের সুবিধা নেওয়ার কথাও বলেছেন জয়ন্ত। উদাহরণ হিসেবে তিনি জাপানের কথা উল্লেখ করেছেন।

তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জাপানে কোনো পর্যটক ১১ হাজার ইয়েনের জুতা কিনলে দামের একটি অংশ কর হিসেবে যুক্ত থাকতে পারে। তবে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে এবং পাসপোর্ট দেখালে অনেক দোকানে পর্যটকদের জন্য করছাড়ের সুবিধা পাওয়া যায়। ফলে একই পণ্য তুলনামূলক কম দামে কেনা সম্ভব হতে পারে।

তবে করছাড়ের নিয়ম ও প্রক্রিয়া দোকান এবং সময় অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই কেনাকাটার আগে সংশ্লিষ্ট দোকানের নিয়ম জেনে নেওয়াই ভালো।

কেনাকাটার চেয়ে অভিজ্ঞতায় গুরুত্ব

জয়ন্তের পরামর্শ, ভ্রমণে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় না করে সেই অর্থ নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য রাখা যেতে পারে। নতুন জায়গা ঘুরে দেখা, স্থানীয় সংস্কৃতি জানা কিংবা ভিন্ন ধরনের খাবার ও কার্যক্রম উপভোগের মতো বিষয় ভ্রমণকে আরও স্মরণীয় করে তুলতে পারে।

বিমানবন্দরে মুদ্রা বিনিময়ে সতর্কতা

বিদেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরের মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্র থেকেই বড় অঙ্কের অর্থ ভাঙিয়ে না নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। তার মতে, বিমানবন্দরের বিনিময় হার অনেক সময় শহরের অন্যান্য মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্রের তুলনায় কম সুবিধাজনক হতে পারে।

তাই বড় অঙ্কের অর্থ বিনিময়ের আগে শহরের বিভিন্ন স্থানের বিনিময় হার তুলনা করে নেওয়া ভালো। প্রয়োজন হলে প্রথমে অল্প পরিমাণ অর্থ বিনিময় করে পরে তুলনামূলক ভালো হারে বাকি অর্থ ভাঙানো যেতে পারে।

ভ্রমণের তারিখে সামান্য পরিবর্তনেও সাশ্রয়

ভ্রমণের তারিখে সামান্য নমনীয়তা থাকলেও খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। জয়ন্তের মতে, নির্ধারিত দিনের এক দিন আগে বা পরে বিমান ধরলে অনেক সময় গন্তব্য পরিবর্তন করার চেয়েও বেশি অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব।

তাই টিকিট কাটার আগে কাছাকাছি কয়েকটি তারিখের ভাড়া তুলনা করে দেখা যেতে পারে।

বাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস সঙ্গে নিন

বিদেশে গিয়ে বাড়িতে ফেলে আসা প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হলে অনেক সময় বেশি অর্থ খরচ হয়। তাই ভ্রমণের আগে প্রয়োজনীয় পোশাক, ওষুধ, ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী এবং অন্যান্য দরকারি জিনিসের একটি তালিকা তৈরি করে নেওয়া ভালো।

সামান্য প্রস্তুতিই ভ্রমণের সময় অপ্রত্যাশিত কেনাকাটা ও বাড়তি খরচ কমাতে পারে।

ছোট খরচও বড় হয়ে উঠতে পারে

ভ্রমণের বাজেট তৈরি করার সময় বড় খরচগুলোর পাশাপাশি ছোট ছোট ফিও হিসাবের মধ্যে রাখা জরুরি। টাকা তোলার ফি, কার্ডে মুদ্রা রূপান্তরের খরচ, অতিরিক্ত লাগেজের ফি কিংবা অন্যান্য পরিষেবা-সংক্রান্ত চার্জ আলাদাভাবে কম মনে হলেও সব মিলিয়ে তা বড় অঙ্কে পরিণত হতে পারে।

তাই বিদেশ ভ্রমণের আগে শুধু বিমান টিকিট ও হোটেলের খরচ হিসাব করলেই হবে না। যাত্রার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্ভাব্য সব খরচের একটি তালিকা তৈরি করে বাজেট করা হলে ভ্রমণ অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত রাখা সম্ভব।

জয়ন্তের পরামর্শের মূল কথা হলো, ভ্রমণে সাশ্রয় মানেই কম খরচে সবকিছু করা নয়। বরং আগে থেকে পরিকল্পনা করা, বিভিন্ন বিকল্পের দাম তুলনা করা এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়িয়ে চলার মাধ্যমেই ভ্রমণের বাজেটের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।