ঋষিকেশে যোগচর্চা ও আয়ুর্বেদের ছোঁয়ায় অন্যরকম অবকাশযাপন

গঙ্গার তীরে রাত নামলেই ঋষিকেশের পরিবেশ যেন বদলে যায়। অন্ধকার নদীর বুকে তারার আলো মৃদু ঝিলমিল করে, চারপাশে ভেসে আসে ভজনের সুর। কোথাও গানের আসর, কোথাও নীরব ধ্যান। গঙ্গার ঘাটে বসে নদীর স্রোত, রাতের আকাশ আর বাতাসের স্পর্শ অনুভব করতে করতে ব্যস্ত জীবনের চিন্তা থেকে কিছুক্ষণের জন্য দূরে সরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে ঋষিকেশে পৌঁছানোও বেশ সহজ। সড়কপথে আরামদায়ক যাত্রার সঙ্গে পথে ধাবায় চায়ের বিরতি ভ্রমণকে আরও উপভোগ্য করে তোলে। তবে ঋষিকেশ শুধু সহজে পৌঁছানো যায় এমন একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়। ‘বিশ্বের যোগরাজধানী’ হিসাবে পরিচিত এই শহরের রয়েছে নিজস্ব আধ্যাত্মিক আবহ, যা দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

ঋষিকেশে বেড়াতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আর সেখানে সুস্থতা ও মানসিক প্রশান্তির উদ্দেশ্যে কিছুদিন কাটানোর অভিজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে পার্থক্য। সাধারণ বিলাসবহুল ছুটিতে যেখানে আরাম-আয়েশ, পছন্দের খাবার ও অবসর কাটানোই মুখ্য হয়ে ওঠে, সুস্থতা-কেন্দ্রিক ভ্রমণে গুরুত্ব পায় শরীর ও মনের যত্ন। ব্যস্ত ও দ্রুতগতির জীবন থেকে কিছুটা বিরতি নিয়ে গভীর শ্বাস নেওয়া, মনকে শান্ত করা, পরিমিত ও সাত্ত্বিক খাবার খাওয়া এবং যোগচর্চার মাধ্যমে নিজের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ তৈরি করার সুযোগ মেলে।

ঋষিকেশের তপোবনে অবস্থিত মহর্ষি আয়ুর্বেদ রিট্রিট এমনই একটি সুস্থতা-কেন্দ্রিক আবাসন। মহর্ষি আয়ুর্বেদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মহর্ষি মহেশ যোগীজি, যিনি বিশ্বব্যাপী অতীন্দ্রিয় ধ্যান আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত। দ্য বিটলস, দ্য বিচ বয়েজ ও শ্রী শ্রী রবিশঙ্করসহ বেশ কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

রিট্রিটটিতে যোগচর্চা, জ্যোতিষ পরামর্শ, সাত্ত্বিক খাবার এবং আয়ুর্বেদিক বিভিন্ন কার্যক্রমের পাশাপাশি গঙ্গার ঘাটেও সহজে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে আধ্যাত্মিকতা, সুস্থতা ও অবকাশযাপনের অভিজ্ঞতা একই জায়গায় পাওয়া যায়।

সেখানে থাকার সময় বৈদিক নাড়ি পরীক্ষার অভিজ্ঞতাও হয়। আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞরা নাড়ি পরীক্ষা করে শরীরের কার্যপ্রণালি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং সেই অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন নিয়ে পরামর্শ দেন। এর উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের দিকে মানুষকে উৎসাহিত করা।

রিট্রিটের আরেকটি আকর্ষণ হলো জ্যোতিষ পরামর্শ। মহর্ষি জ্যোতিষের বিশেষজ্ঞরা জন্মছকের মাধ্যমে ব্যক্তিত্ব ও জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। ভবিষ্যতের বিভিন্ন সময়ে কী ধরনের বিষয়ে সতর্ক থাকা যেতে পারে, সে সম্পর্কেও পরামর্শ দেওয়া হয়।

সাত্ত্বিক খাবারের আয়োজনও এই ভ্রমণের অন্যতম অংশ। দুপুর ও রাতের খাবারে ডাল, ভাত, রাগির রুটি, শুকনো ও ঝোলের সবজি, সালাদ, দই, ঘোল, গুলাব জামুন ও ক্ষীর। সকালের নাশতায় দক্ষিণ ভারতীয় বিভিন্ন পদ, পোহা, স্যান্ডউইচ, পরোটা ও তাজা ফল। হালকা অথচ পরিপূর্ণ এসব খাবার সুস্থতা-কেন্দ্রিক ভ্রমণের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বেশ মানানসই।

দ্বিতীয় দিনের শুরু হয় যোগচর্চার মধ্য দিয়ে। দীর্ঘদিন যোগব্যায়াম না করলেও সহজ কয়েকটি আসনের মাধ্যমে শরীরকে সক্রিয় করার সুযোগ মেলে। প্রশিক্ষকের নির্দেশনায় করা এসব আসন শরীরের জড়তা কমিয়ে সতেজতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হয়। শান্ত পরিবেশের কারণে যোগচর্চার অভিজ্ঞতাও হয়ে ওঠে ভিন্ন ধরনের।

যোগচর্চার পর গঙ্গার ঘাটে যাওয়ার সুযোগ আসে। রিট্রিট থেকে অল্প হাঁটা পথ পেরিয়েই পৌঁছে যাওয়া যায় ঘাটে। গঙ্গার ঠান্ডা জল, নদীর স্রোত এবং চারপাশের আধ্যাত্মিক পরিবেশ মিলে তৈরি করে এক প্রশান্ত আবহ।

এরপর রিট্রিটের মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় মহর্ষি যজ্ঞ ও রুদ্রাভিষেক। মন্ত্রোচ্চারণ ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শিবলিঙ্গে বিভিন্ন পবিত্র উপাচার নিবেদন করা হয়। পুরো আয়োজনের মধ্যেই থাকে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আবহ।

শরীর ও মনকে আরও স্বস্তি দিতে থাকে আয়ুর্বেদিক অভ্যঙ্গ মালিশ। চার হাতের সমন্বয়ে করা এই পূর্ণাঙ্গ শরীরের মালিশে উষ্ণ ভেষজ তেল ব্যবহার করা হয়। ধীরে ও ছন্দময়ভাবে শরীরে তেল মালিশের পর নেওয়া হয় বাষ্পস্নান। এর মাধ্যমে শরীরকে আরও আরাম দেওয়ার পাশাপাশি ত্বকের লোমকূপ উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা থাকে। মাথা ও শরীরের জন্য ব্যবহার করা হয় আলাদা ধরনের তেল।

রিট্রিটে আয়ুর্বেদিক রান্নার কর্মশালারও আয়োজন থাকে। সেখানে স্বাস্থ্যকর ও সুস্বাদু বিটরুট-কুইনোয়া কাটলেট তৈরির পদ্ধতি শেখানো হয়। ফলে সুস্থতা-কেন্দ্রিক ভ্রমণের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর রান্নার অভিজ্ঞতাও যুক্ত হয়।

সন্ধ্যা নামার পর শুরু হয় তবলা ও বাঁশির সংগীতানুষ্ঠান। বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, আর ছাদের কাচঘেরা কক্ষে ভেসে আসে সুরের মূর্ছনা। শান্ত পরিবেশে এই সংগীতানুষ্ঠান দিনভর নানা কার্যক্রমের পর এনে দেয় ভিন্ন ধরনের প্রশান্তি।

ঋষিকেশ ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ গঙ্গা আরতিও বাদ যায়নি। গঙ্গার তীরে প্রদীপ, প্রার্থনা ও ভক্তিগানের সমন্বয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান শহরের আধ্যাত্মিক পরিচয়ের অন্যতম অংশ।

ভ্রমণের শেষদিকে যাওয়া হয় বিখ্যাত বিটলস আশ্রমে। ঋষিকেশের ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এই স্থান ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় যোগ করে আরেকটি মাত্রা।

সব মিলিয়ে ঋষিকেশের অভিজ্ঞতা শুধু একটি সাধারণ পর্যটন ভ্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গঙ্গার ঘাট, যোগচর্চা, সাত্ত্বিক খাবার, আয়ুর্বেদিক পরিচর্যা, সংগীত, গঙ্গা আরতি ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ সবকিছু মিলিয়ে শহরটি পর্যটকদের জন্য তৈরি করে এক ভিন্ন ধরনের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। ব্যস্ত জীবনের বাইরে কয়েকটি দিন নিজের শরীর ও মনের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগই ঋষিকেশকে অন্য অনেক পর্যটন গন্তব্যের চেয়ে আলাদা করে তোলে।