ভাবুন তো, এমন একটি দ্বীপ যেখানে নেই কোনও সড়ক, দোকান কিংবা আশপাশের এলাকার সঙ্গে সংযোগকারী সেতু। জনসংখ্যাও মাত্র ছয়জন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আনতে হয় হেলিকপ্টারে। আর গ্রীষ্মে সেখানে ভিড় করেন পর্যটকেরা শুধু প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ও পাফিন পাখি দেখতে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এমনই এক দ্বীপ রয়েছে ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জে। নাম মাইকিনেস।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়ি ভূদৃশ্য আর শান্ত পরিবেশের জন্য মাইকিনেস যেন পৃথিবীর ব্যস্ত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন এক জগৎ। এখানে নেই কোনও ব্যস্ত সড়ক, দোকানের সারি কিংবা আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার চিহ্ন। কাছের দ্বীপ থেকে নৌকা বা হেলিকপ্টারে করে পৌঁছাতে হয় এই নিরিবিলি দ্বীপে। ফলে মাইকিনেসে যাওয়ার যাত্রাটিও হয়ে ওঠে ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই দ্বীপে বর্তমানে বসবাস করেন মাত্র ছয়জনের মতো মানুষ। এত কম মানুষের বসবাসের কারণে মাইকিনেসের জীবনযাপনও অন্যরকম। প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যও নিয়মিত হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সেখানে পৌঁছে দেওয়া হয়।
গ্রীষ্মকাল এলে অবশ্য দ্বীপটির চিত্র কিছুটা বদলে যায়। তখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা ছুটে আসেন পাফিন দেখতে। খাড়া পাহাড়ের কিনারায় দল বেঁধে থাকা এই সামুদ্রিক পাখি মাইকিনেসের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। বিশেষ করে প্রকৃতিপ্রেমী ও পাখিপ্রেমীদের কাছে দ্বীপটি হয়ে ওঠে স্বপ্নের এক গন্তব্য।
পাফিন দেখার সেরা সময়
মাইকিনেস ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে সময় বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। পাফিন দেখার জন্য মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়কে সবচেয়ে উপযুক্ত ধরা হয়। এই সময়ে নিকটবর্তী সোরভাগুর থেকে ফেরিতে করে দ্বীপটিতে যাওয়া যায়।
তবে মাইকিনেসহোলমুরের পাফিনের আবাসস্থলসমৃদ্ধ খাড়া পাহাড়ে পৌঁছানো এতটা সহজ নয়। সেখানে যেতে দর্শনার্থীদের একজন অনুমোদিত স্থানীয় গাইডের সহায়তা নিতে হয়। প্রায় ছয় থেকে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ হাঁটার পথে রয়েছে বেশ কিছু খাড়া ও সরু অংশ। ফলে পথটি উপভোগ করার পাশাপাশি সতর্কতাও জরুরি।
দ্বীপটির পরিবেশ ও পাখিদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে প্রতিদিন দর্শনার্থীর সংখ্যাও সীমিত রাখা হয়। সাধারণত দিনে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন পর্যটককে সেখানে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। গ্রীষ্মের ব্যস্ত মৌসুমে ফেরির আসন ও নির্ধারিত হাঁটার স্থান দ্রুত পূর্ণ হয়ে যেতে পারে। তাই আগেভাগে বুকিং করে নেওয়াই ভালো।
স্থানীয় গাইডের সঙ্গে নির্ধারিত হাঁটার ভ্রমণের খরচ প্রায় ৪০০ ডেনিশ ক্রোন। আর ফেরিতে এক পথে যেতে খরচ হয় প্রায় ১২৩ ডেনিশ ক্রোন।
পর্যটকদের চোখে মাইকিনেস
মাইকিনেসের ছবি ও ভ্রমণকাহিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর জায়গাটি নিয়ে ভ্রমণপ্রেমীদের আগ্রহও বেড়েছে। একজন ব্যবহারকারী মজা করে লিখেছেন, চকলেট থেকে এত দূরে থাকা তাঁর পক্ষে কঠিন হলেও জায়গাটি তিনি অবশ্যই ঘুরে দেখতে চান।
আরেকজন লিখেছেন, পাফিন দেখার চেয়ে আনন্দের আর কিছুই হতে পারে না। কারও চোখে মাইকিনেস ‘পৃথিবীর স্বর্গ’।
এক পর্যটক আবার নিজের পুরোনো অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। ২০১৬ সালের অক্টোবরে তিনি মাইকিনেসে একটি পরিবারের সঙ্গে ছিলেন। থাকার ব্যবস্থা নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় হেলিকপ্টারে করে সেখানে পৌঁছান তিনি। পুরো সপ্তাহান্তে দ্বীপটির একমাত্র পর্যটক ছিলেন। স্থানীয়দের সঙ্গে ভেড়া সামলানোর কাজে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি একাই হেঁটে বাতিঘর পর্যন্ত গিয়েছিলেন। তাঁর কাছে সেটি ছিল জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। তবে অক্টোবর হওয়ায় সে সময় পাফিন দেখার সুযোগ হয়নি।
আরেক পর্যটক জানিয়েছেন, হেলিকপ্টারে করে এমন দুর্গম জায়গায় পৌঁছানোর সুযোগই তাঁর কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। তার সঙ্গে পাফিন দেখার সুযোগ থাকায় মাইকিনেসের প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও বেড়েছে।
কেউ কেউ আবার দ্বীপটির সৌন্দর্য ও বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন দেখে সেখানে থাকার সুযোগ নিয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এক ব্যবহারকারীর ভাষায়, এমন জায়গায় বসবাসের সুযোগ পাওয়া একই সঙ্গে বিশেষ সৌভাগ্যের এবং অদ্ভুত সুন্দর অভিজ্ঞতা।
পাখিদের জন্য সংরক্ষিত পথ
মাইকিনেসের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল থাকার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীদের নির্ধারিত পথেই হাঁটতে বলা হয়। কারণ দ্বীপটির খাড়া পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে পাফিন পাখিরা বাসা বাঁধে এবং এসব এলাকা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।
নির্দিষ্ট পথ থেকে বিচ্যুত না হলে পাখিদের বিরক্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে এবং তাদের বাসা ও প্রজননস্থলও সুরক্ষিত থাকে। তাই মাইকিনেস ভ্রমণে শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করাই নয়, সেই প্রকৃতিকে রক্ষা করার দায়িত্বও পর্যটকদের নিতে হয়।
মাত্র ছয়জন মানুষের নিরিবিলি জীবন, হেলিকপ্টারে আসা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, পাহাড়ের কিনারায় পাফিনের আনাগোনা আর চারপাশের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে মাইকিনেস যেন ব্যস্ত পৃথিবীর বাইরে থাকা এক আশ্চর্য ঠিকানা। যারা প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে গিয়ে ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা খুঁজছেন, তাঁদের কাছে এই দুর্গম দ্বীপ নিঃসন্দেহে হয়ে উঠতে পারে এক স্মরণীয় গন্তব্য।