যেখানে পায়ের নিচে স্বচ্ছ কাচ, সামনে পাহাড়-সাগর!

উঁচু পাহাড়ের কিনারা থেকে নিচে তাকালেই গভীর খাদ, কোথাও আবার পায়ের নিচে নীল সমুদ্রের ঢেউ। চারপাশে সবুজ পাহাড়, বন কিংবা মেঘে ঢাকা উপত্যকা। আর এসবের মাঝখান দিয়ে হাঁটতে হবে স্বচ্ছ কাচের ওপর! সাহস থাকলে এমন ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা নিতে পারেন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি কাচের সেতু ও স্কাইওয়াকে। ছুটিতে নতুন ধরনের ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে তালিকায় রাখতে পারেন এসব রোমাঞ্চকর জায়গা।

কন্যাকুমারীর সাগরের ওপর কাচের সেতু (ছবি: সংগৃহীত)

কন্যাকুমারীর সাগরের ওপর কাচের সেতু

ভারতের দক্ষিণ প্রান্তের কন্যাকুমারীতে সাগরের ওপর তৈরি হয়েছে দৃষ্টিনন্দন কাচের সেতু। ধনুকের মতো বাঁকানো এই সেতুটি স্বামী বিবেকানন্দ স্মৃতিসৌধ ও তিরুভাল্লুভারের মূর্তিকে যুক্ত করেছে। সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৭ মিটার এবং প্রস্থ ১০ মিটার।

স্বচ্ছ কাচের ওপর দিয়ে হাঁটার সময় নিচে দেখা যায় সমুদ্রের নীল জল। একদিকে স্মৃতিসৌধ, অন্যদিকে বিশাল সমুদ্র দুইয়ের সৌন্দর্য একসঙ্গে উপভোগ করা যায় এখান থেকে। ট্রেনে কন্যাকুমারী স্টেশনে নেমে সহজেই পৌঁছানো যায়। বিমানপথে এলে কেরালার তিরুবনন্তপুরম বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে কন্যাকুমারী যাওয়া যায়।

বিশাখাপত্তনমে পাহাড়ের কিনারায় কাচের সেতু (ছবি: সংগৃহীত)

বিশাখাপত্তনমে পাহাড়ের কিনারায়

সমুদ্র আর পাহাড়ের অনন্য মেলবন্ধন দেখতে চাইলে যেতে পারেন অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমে। কৈলাসগিরির টাইটানিক ভিউপয়েন্টের কাছে তৈরি কাচের সেতুটি পর্যটকদের জন্য তৈরি করেছে ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা।

প্রায় ৫৫ মিটার দীর্ঘ সেতুটির বড় একটি অংশ ঝুলন্ত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশ উঁচুতে দাঁড়িয়ে কাচের নিচ দিয়ে দেখা যায় গভীর খাদ, আর সামনে বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর। ঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা মাথায় রেখে সেতুটির কাঠামো শক্তভাবে তৈরি করা হয়েছে। ট্রেন, বিমান কিংবা সড়কপথে বিশাখাপত্তনম পৌঁছানো যায়।

পেলিংয়ের কাচ-পথ (ছবি: সংগৃহীত)

পেলিংয়ে কাচের ওপর দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন

পাহাড়ের রাজ্যে কাচের সেতুতে হাঁটার অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে গন্তব্য হতে পারে সিকিমের পেলিং। ২০১৮ সালে তৈরি এই স্কাইওয়াকটি ভারতের প্রথম দিককার গ্লাস-বটম স্কাইওয়াকগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।

প্রায় ৫০ মিটার দীর্ঘ কাচের পথের নিচে রয়েছে গভীর খাদ। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে দেখা যায় বরফে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা। পাশাপাশি পাহাড়ের চূড়ায় থাকা বিশাল চেনরেজিগের মূর্তিও নজর কাড়ে। চারপাশের পাহাড়ি উপত্যকার দৃশ্য এই ভ্রমণকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

পেলিং যেতে নিউ জলপাইগুড়ি রেলস্টেশন বা বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে সড়কপথ ব্যবহার করা যায়। সিকিমের পাকিয়ং বিমানবন্দর দিয়েও যাওয়া সম্ভব।

রাজগীরে কাচের সেতু (ছবি: সংগৃহীত)

রাজগীরে কাচের সেতু, চারদিকে সবুজ পাহাড়

বিহারের রাজগীরের নেচার সাফারি পার্কেও রয়েছে কাচের সেতু। পাহাড় ও অরণ্যে ঘেরা এই পর্যটনকেন্দ্রে ইস্পাতের কাঠামোর ওপর তৈরি করা হয়েছে স্বচ্ছ কাচের পথ।

সেতুতে দাঁড়িয়ে নিচের সবুজ প্রকৃতি দেখা যায়। চারপাশের পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে কাচের পথের রোমাঞ্চ মিলে তৈরি হয় অন্যরকম অভিজ্ঞতা। নেচার সাফারি পার্কে প্রবেশের জন্য টিকিটের পাশাপাশি কাচের সেতু ব্যবহারের জন্য আলাদা টিকিটের প্রয়োজন হয়। রাজগীর ট্রেন ও সড়কপথ দুইভাবেই যাওয়া যায়।

ভাগামন কাচের সেতু (ছবি: সংগৃহীত)

ভাগামনে মেঘের রাজ্যে কাচের পথ

কেরালার ইদুক্কি ও কোট্টায়াম জেলার সীমান্তের পাহাড়ি শহর ভাগামন প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে পরিচিত একটি গন্তব্য। এখানকার কাচের সেতুটি তৈরি হয়েছে পাহাড়ের ওপর। সেতুটির একাংশ খাদে ঝুলে থাকায় হাঁটার সময় পাওয়া যায় রোমাঞ্চকর অনুভূতি।

প্রায় ৪০ মিটার দীর্ঘ এই ক্যান্টিলিভার কাচের সেতু থেকে পশ্চিমঘাটের পাহাড় দেখা যায়। কখনও মেঘে ঢেকে যায় পাহাড়, আবার কখনও সূর্যাস্তের আলোয় বদলে যায় পুরো দৃশ্য। কোচি, কোট্টায়াম বা থেক্কেডি থেকে সড়কপথে ভাগামন যাওয়া যায়।

ওয়েনাড়ে ৯০০ কন্ডীর কাচের সেতু (ছবি: সংগৃহীত)

ওয়েনাড়ে ৯০০ কন্ডীর কাচের সেতু

কেরালার ওয়েনাড়ের মেপ্পাদি থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ৯০০ কন্ডীর পর্যটনকেন্দ্র। বিশাল সবুজ বনাঞ্চল ও পাহাড়ি পরিবেশের মধ্যে তৈরি এই জায়গায় রয়েছে কাচের সেতু।

উঁচুতে দাঁড়িয়ে নিচের সবুজ বন আর দূরের পাহাড় দেখার সুযোগ মেলে এখানে। ওয়েনাড় থেকে সড়কপথে কল্লাডি পৌঁছে এরপর ইকো পার্কের দিকে যেতে হয়। কাচের সেতুতে পৌঁছানোর জন্য নির্দিষ্ট অংশে জিপ নিতে হতে পারে, আবার চাইলে হাঁটার পথও বেছে নেওয়া যায়।

কুর্গে কফিবাগানের মাঝে ‘পাপিজ ব্রিজ’

কর্নাটকের কুর্গের প্রধান শহর মাদিকেরীতেও রয়েছে কাচের সেতু। কফিবাগান আর সবুজ পাহাড়ি উপত্যকার মধ্যে তৈরি প্রায় ৩২ মিটার দীর্ঘ এই সেতুটি ‘পাপিজ ব্রিজ অব কুর্গ’ নামেও পরিচিত।

স্বচ্ছ কাচের ওপর দাঁড়িয়ে নিচের সবুজ উপত্যকা দেখলে মনে হতে পারে শূন্যে হাঁটছেন। কুর্গের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা যোগ করেছে নতুন মাত্রা। মাইসুরু থেকে সড়কপথে মাদিকেরী যাওয়া যায়। মাঙ্গালুরু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেও সড়কপথে কুর্গে পৌঁছানো সম্ভব।

যাওয়ার আগে যা মাথায় রাখবেন

কাচের সেতুতে ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট পর্যটনকেন্দ্রের প্রবেশমূল্য, খোলার সময় ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি জেনে নেওয়া ভালো। বৃষ্টি বা খারাপ আবহাওয়ার কারণে কোনো কোনো সেতুতে প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকতে পারে। উচ্চতা নিয়ে ভয় থাকলে প্রথমে ছোট সেতু দিয়ে অভিজ্ঞতা নেওয়া যেতে পারে।

তবে কাচের সেতুতে উঠলে নিরাপত্তার নিয়ম মেনে চলা জরুরি। নির্ধারিত সংখ্যার বেশি মানুষ একসঙ্গে সেতুতে ওঠা, দৌড়ানো বা রেলিংয়ের বাইরে ঝুঁকে ছবি তোলা এড়িয়ে চলুন। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের সঙ্গে একটু রোমাঞ্চ যোগ করতে চাইলে ভারতের এসব কাচের সেতু হতে পারে ছুটির ভ্রমণে ভিন্ন স্বাদের গন্তব্য।