নৈসর্গিক সৌন্দর্যের দেশ বাংলাদেশ। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন, বিস্তৃত হাওরাঞ্চল, বিশাল পার্বত্যাঞ্চল, মহাস্থানগড় ও পাহাড়পুরের হাজার বছরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে ৭০০ থেকে ৮০০ দর্শনীয় স্থান। সাগরের গর্জন, পাহাড়ের নীরবতা, হাওরের সৌন্দর্য কিংবা প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন; সব মিলিয়ে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের।
তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে পর্যটন খাত সেভাবে এগোতে পারছে না। বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করতে না পারার পাশাপাশি দেশীয় পর্যটকদেরও ধরে রাখতে পারছে না বাংলাদেশ। বরং অবসর কাটাতে দেশের পর্যটকরা বিদেশে চলে যাচ্ছেন। অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, মানসম্মত সড়কের অভাব, নিরাপত্তা দুর্বলতা, বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা, দক্ষ জনবলের অভাব, বাজেটের ঘাটতি এবং প্রচারের অভাবকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এমন বাস্তবতায় আজ রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব পর্যটন দিবস’। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’। দিবসটি উপলক্ষে ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনাকে সামনে রেখে সপ্তাহজুড়ে নানা কর্মসূচি নিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। আজ থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত শোভাযাত্রা, সাইকেল র্যালি, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সিটি ট্যুর, পর্যটনসংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে মতবিনিময়, প্রদর্শনী ও আলোচনা সভা হবে। এবারই প্রথম ১৩টি ক্যাটাগরিতে দেওয়া হবে বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে উদীয়মান শিল্পগুলোর একটি পর্যটন শিল্প। দেশের মোট জিডিপির ৪ দশমিক ৪ শতাংশ আসে এই শিল্প থেকে। পর্যটন শিল্পকে উন্নত করে দেশের বেকারত্ব দূর করার পাশাপাশি প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা, সঠিক পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়নের অভাবসহ নানা কারণে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
অবকাঠামো ও যোগাযোগের দুর্বলতা
খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান, পর্যটন কাঠামোর দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম। এশিয়ার মধ্যে শুধু পাকিস্তান ছাড়া বাকি সব দেশ থেকেই পিছিয়ে বাংলাদেশ। দেশের পর্যটন শিল্পের অবকাঠামোগত দুর্বলতাই এর অন্যতম প্রধান কারণ।
সড়কপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলেও দীর্ঘ যানজটের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। পর্যাপ্ত হোটেলের সুব্যবস্থা নেই। পর্যটনকেন্দ্রগুলোও অবহেলিত। এসবের সুপরিকল্পিত আধুনিকায়ন ও শুল্কমুক্ত বিপণির অভাবও পর্যটন খাতের বড় বাধা।
দেশীয় বিমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও পর্যটন খাতের পিছিয়ে থাকার একটি কারণ। বিদেশি পর্যটকদের কাছে একটি দেশকে তুলে ধরতে দেশীয় এয়ারলাইন্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করলেও এশিয়ার বাইরে শুধু লন্ডনে ফ্লাইট পরিচালনা করে। ফলে অন্য দেশের পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশে আসার পরিবহন ব্যয় তুলনামূলক বেশি। বিমান ব্যবস্থার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১১১তম, যা এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে পেছনে।
প্রচার ও নিরাপত্তার ঘাটতি
বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের পর্যটনের পরিচিতিও কম। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল, বিবিসি, সিএনএন, ডিসকভারি ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সমাজ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তুলে ধরা হলেও বাংলাদেশের পর্যটনের তেমন প্রচার নেই।
বিদেশি পর্যটকদের কাছে নিরাপত্তাও বড় বিষয়। অস্থিতিশীলতা, চুরি, ছিনতাই, হত্যা, রাহাজানি ও সহিংসতা থেকে পর্যটকদের রক্ষা করা এবং নির্বিঘ্নে চলাফেরার নিশ্চয়তা দেওয়া প্রয়োজন। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে তাদের আকৃষ্ট করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া দক্ষ ও মার্জিত জনবলের অভাব এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থার ঘাটতিও রয়েছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না বলেও সংশ্লিষ্টরা জানান।
পর্যটকদের জন্য বাড়তি খরচও বড় প্রতিবন্ধকতা। পর্যটন শিল্পে উন্নত কিছু দেশের তুলনায় বাংলাদেশের পর্যটন ব্যয় অনেক বেশি। কিন্তু সেই অনুপাতে সুযোগ-সুবিধা কম। বাড়তি যাতায়াত খরচ এবং মানের তুলনায় হোটেলগুলোর উচ্চমূল্যের কারণে পর্যটকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অন্য দেশগুলোতে এর চেয়ে কম ব্যয়ে ভালো সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়।
পশ্চিমা পর্যটক কম কেন
বাংলাদেশে পর্যটকদের বেশিরভাগই আসে ভারত থেকে। মাত্র ৫ শতাংশ পর্যটক যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলেও তাদের বেশিরভাগই প্রবাসী বাঙালি। বিশ্বব্যাপী পর্যটন বাজারের ৫৩ শতাংশ আসে আমেরিকা ও ইউরোপ থেকে, যা থেকে বাংলাদেশ অনেকটাই বঞ্চিত। এশিয়ার বাইরে থেকে আসা পর্যটকের হার বিভিন্ন দেশে ২০ শতাংশ থেকে ৭১ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা মাত্র ৭ শতাংশ।
কক্সবাজারের রিসোর্ট মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ব্যবসায়ী কাজী রাসেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পর্যটনে বড় সমস্যা সমন্বয়ের অভাব। একটি পর্যটন এলাকায় সরকারের ট্যুরিজম বোর্ড, পর্যটন করপোরেশন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, সিটি করপোরেশন বা নগর কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার কাজ রয়েছে। কিন্তু কারও সঙ্গে কারও সমন্বয় নেই।
কক্সবাজারকেন্দ্রিক পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত রয়েছে। এর যথাযথ ব্যবহারের সুযোগ করা হলে শহরকেন্দ্রিক ট্যুরিস্টের চাপ কমবে। আর কক্সবাজার বিমানবন্দর আধুনিকায়নের কাজ এখন দৃশ্যমান। এ বিমানবন্দরের কাজ শেষ হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সমাগম আরও বাড়বে। এক্ষেত্রে বিদেশি পর্যটকদের জন্য সৈকতে নামার আলাদা জায়গা করে দিলে বিদেশি ট্যুরিস্ট আরও বাড়বে।’
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি শিবলুল আজম কোরেশী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশি পর্যটকরা পর্যটনস্থানগুলোতে যাচ্ছেন। তাদের কারণেই পর্যটনস্থানগুলোতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান টিকে আছে।
তিনি বলেন, ‘আসলে আমাদের এ ক্ষেত্রে কোথায় ব্যর্থতা আছে আমরা কিন্তু জানি। সভা-সেমিনারে সেগুলো আলোচনা হয়। কিন্তু বাস্তবায়নের জন্য সেইভাবে কাজ করা হয় না। নতুন সরকার এসেছে। পর্যটনকে গুরুত্ব দিয়ে তারা যদি সেই সমস্যাগুলো সমাধান করে, তবে বিদেশি পর্যটকরা আমাদের দেশে আসবে।’
বাংলাদেশ হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির যুগ্ম মহাসচিব ফিরোজ আলম সুমন বলেন, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা এই খাতকে সবসময় সম্ভাবনাময় বলে থাকলেও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সঠিকভাবে কাজ করছি না।
তিনি বলেন, ‘এ খাতের সঙ্গে জড়িত সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থাকে এক হয়ে কাজ করলেই এ খাতের উন্নয়ন সম্ভব।’
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিদ্যমান পর্যটন ব্যবস্থাপনায় অনেক সমস্যা আছে। পর্যটন এলাকাগুলোতে কোনো ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করা যায়নি। কত পর্যটক যাবে, তারও কোনো পরিসংখ্যান নেই। যেখানে এক হাজার পর্যটক যাওয়ার মতো ব্যবস্থা আছে, সেখানে ২০ হাজার যাচ্ছে। এটিই সবচেয়ে বড় সংকট।’
তিনি বলেন, পর্যটন এলাকাগুলোতে পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধাও কম। খাবার ও থাকার ব্যবস্থা অনেক ব্যয়বহুল, যা পৃথিবীর অন্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এটিও অন্যতম বড় সমস্যা।
পর্যটন এলাকায় যাতায়াতের রাস্তাঘাট খুব মানসম্মত নয় উল্লেখ করে মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, পর্যটকরা ভ্রমণে যেতে যেতে কোমরে ব্যথা অনুভব করেন। পৃথিবীর অনেক দেশে এমনটা হয় না। উন্নত দেশে হাজার মাইল ভ্রমণ করলেও তা টের পাওয়া যায় না।