নৌকাটি যত এগোয়, খালের পানি তত নীরব হয়ে আসে। দুই পাশে সবুজের ঘনত্ব বাড়ে। রঙিন ‘ত্রাহিনেরা’ নৌকাগুলোও একসময় পেছনে পড়ে থাকে। চারপাশে তখন শুধু পানি, গাছপালা আর অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। তারপর নৌকাটি একটি বাঁক নেয়। আর ঠিক তখনই বদলে যায় পুরো দৃশ্য।
গাছের ডালে পাখির বদলে ঝুলছে শতশত পুতুল। একটির চোখ নেই, আরেকটির হাত-পা ভাঙা। কোনোটি মলিন, কোনোটি বৃষ্টিতে-রোদে ক্ষয়ে গেছে। কোথাও একটি, কোথাও পাশাপাশি কয়েকটি। গাছজুড়ে এমন শত শত পুতুল। এটাই মেক্সিকোর ‘ইসলা দে লাস মুনেকাস’ বা ‘পুতুলের দ্বীপ’।
মেক্সিকো সিটির দক্ষিণে জোচিমিলকোর খালপথের এই ছোট দ্বীপটি আজ বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের কাছে এক রহস্যময় স্থান। কিন্তু এই রহস্যের শুরু একটি পুতুল দিয়ে, নাকি একটি ডুবে যাওয়া কিশোরীর গল্প দিয়ে; সেটাই আজও স্পষ্ট নয়।
পানিতে ভেসে আসা একটি পুতুল
প্রচলিত গল্পের কেন্দ্রে আছেন ডন জুলিয়ান সান্তানা বাররেরা। ১৯৫০-এর দশকে তিনি জোচিমিলকোর খালের একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বসবাস করতেন। জায়গাটি ছিল ‘চিনাম্পা’; অ্যাজটেক যুগ থেকে চলে আসা ভাসমান কৃষিজমির একটি অংশ।
লোককথা বলছে, একদিন ওই এলাকার কাছাকাছি খালে এক কিশোরী ডুবে মারা যায়। সান্তানা দাবি করেছিলেন, মেয়েটির মৃত্যুর পর তিনি তার আত্মার উপস্থিতি অনুভব করতে থাকেন। এর কিছুদিন পর পানিতে ভাসতে থাকা একটি পুতুল দেখতে পান তিনি। তার বিশ্বাস হয়, পুতুলটি ওই কিশোরীর আত্মাকে শান্ত করতে সাহায্য করতে পারে। তাই সেটি তুলে এনে একটি গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেন। সেখান থেকেই শুরু।
অন্তত প্রচলিত গল্পটি এমনই। এরপর সান্তানা আশপাশের জায়গা, খাল ও আবর্জনা থেকে পুরোনো, ভাঙা পুতুল সংগ্রহ করতে থাকেন। প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও পুতুল নিতেন। তারপর সেগুলো ঝুলিয়ে দিতেন দ্বীপের গাছগুলোতে। একটি পুতুল ধীরে ধীরে হয়ে উঠলো শত শত পুতুল।
একটি থেকে শত শত
বছরের পর বছর ধরে পুতুল জমতে থাকে। তাদের অনেকেরই শরীর ক্ষয়ে যায়। কারও হাত নেই, কারও চোখ নেই। রোদ-বৃষ্টি আর সময়ের আঘাতে পুতুলগুলোর চেহারায় তৈরি হয় অস্বাভাবিক এক বিষণ্নতা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, সান্তানা মনে করতেন এসব পুতুল দ্বীপটিকে অশুভ কিছু থেকে রক্ষা করবে। পুতুলগুলো যেন তার কাছে এক ধরনের প্রতিরক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু কেন তিনি এতটা পুতুল সংগ্রহ করতেন?
এর নিশ্চিত উত্তর নেই। কেউ মনে করেন, ডুবে যাওয়া মেয়েটির আত্মাকে শান্ত করার বিশ্বাস থেকেই তার এই সংগ্রহের শুরু। কারও মতে, দীর্ঘদিনের নিঃসঙ্গতা ও গভীর বিশ্বাস ধীরে ধীরে তাকে এই কাজে আরও আচ্ছন্ন করে তোলে। আর এখানেই গল্পের সঙ্গে বাস্তবতার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। কিন্তু সেই মেয়েটি কোথায়?
পুতুলের দ্বীপের সবচেয়ে বড় রহস্য সম্ভবত এখানেই। সেই কিশোরী সত্যিই ডুবে মারা গিয়েছিল কি না, তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তার পরিচয়ও জানা যায় না। এমনকি নির্ভরযোগ্য পুলিশ রেকর্ডেও ওই মৃত্যুর নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, সান্তানার গল্পে যে মেয়েটিকে কেন্দ্র করে এত পুতুল ঝুলেছে, সে আদৌ বাস্তবে ছিল কি না; সেটিও নিশ্চিত নয়।
এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে এই গল্পকে মূলত প্রচলিত কাহিনি হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, সান্তানা নিজের অদ্ভুত আচরণের ব্যাখ্যা দিতে এই গল্প তৈরি করেছিলেন। আবার অন্যদের ধারণা, তিনি সত্যিই কোনো ঘটনার পর গভীরভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে ওই মেয়েটির আত্মা তাকে ঘিরে আছে। সত্যিটা কোথায়, তার নির্ভরযোগ্য উত্তর নেই।
যে দ্বীপে দিনের আলোও অন্ধকার মনে হয়
দ্বীপে যেতে হলে জোচিমিলকোর খালপথ ধরে নৌকায় যেতে হয়। সাধারণত রঙিন ‘ত্রাহিনেরা’ নৌকায় করে সেখানে পৌঁছান দর্শনার্থীরা। পথজুড়ে সবুজ প্রকৃতি, খাল আর ভাসমান কৃষিজমির দৃশ্য। সবকিছুই স্বাভাবিক। কিন্তু দ্বীপটি চোখে পড়ার পর সেই স্বাভাবিকতা যেন হঠাৎ বদলে যায়।
গাছের ডালে ঝুলতে থাকা অসংখ্য পুরোনো পুতুলের কারণে জায়গাটির আবহ হয়ে ওঠে অস্বস্তিকর। পর্যটকদের কেউ কেউ দাবি করেন, পুতুলগুলো নড়ে, চোখের পাতা ফেলে কিংবা ফিসফিস করে কথা বলে। তবে এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বাতাসে পুতুলের নড়াচড়া, আলো-ছায়ার পরিবর্তন, দীর্ঘদিনের ক্ষয়ে যাওয়া পুতুল এবং চারপাশের অস্বাভাবিক নীরবতা; এসবই দর্শনার্থীদের এমন অনুভূতি দিতে পারে। তবু গল্প থেমে থাকে না।
তারপর সান্তানারও মৃত্যু হলো
ডন জুলিয়ান সান্তানা বাররেরা বছরের পর বছর দ্বীপটির দেখভাল করেছেন। ২০০১ সালে তার মৃত্যু হয়। প্রচলিত গল্পের সবচেয়ে রহস্যময় অংশ এখানেই। বলা হয়, যে জায়গায় সেই কিশোরী ডুবে মারা গিয়েছিল বলে তিনি বিশ্বাস করতেন, তার কাছাকাছিই সান্তানার মৃত্যু হয়।
এরপর দ্বীপটি আরও বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে। একসময় পর্যটক ও কৌতূহলী মানুষের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে যায় জায়গাটি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষও পরে দ্বীপটি সংরক্ষণ করে। আজ সেখানে যাওয়া মানুষেরা শুধু পুতুল দেখতে যান না। তারা দেখতে যান একটি গল্পের বাস্তব চিহ্ন; যে গল্পের অনেকটাই নিশ্চিত নয়, কিন্তু যার দৃশ্যমান প্রমাণ গাছের ডালে ঝুলে আছে।
শেষ পর্যন্ত রহস্যটা কোথায়?
পুতুলগুলো সত্যি। দ্বীপটি সত্যি। ডন হুলিয়ান সান্তানা বাররেরাও সত্যি। কিন্তু সেই কিশোরী? তার মৃত্যুর নিশ্চিত প্রমাণ নেই। তার আত্মা? তারও কোনো প্রমাণ নেই। আর পুতুলগুলো সত্যিই রাতে নড়ে বা চোখ মেলে তাকায় কি না, তারও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাহলে এই দ্বীপের রহস্যটা কোথায়?
হয়তো রহস্যটা কোনো ভূতের গল্পে নয়। হয়তো রহস্যটা একজন মানুষের বিশ্বাসে; যে বিশ্বাস ধীরে ধীরে তার চারপাশের গাছগুলোকে পুতুলে ভরে দিয়েছিল। একটি পুতুল থেকে আরেকটি, তারপর শত শত পুতুল। সময়ের সঙ্গে সেই ব্যক্তিগত বিশ্বাসই হয়ে উঠেছে একটি দ্বীপের পরিচয়।
খালের নৌকাটি যখন আবার ধীরে ধীরে দ্বীপ থেকে দূরে সরে যায়, পেছনে পড়ে থাকে সেই গাছগুলো। দূরত্ব বাড়ে। পুতুলগুলো ছোট হতে থাকে। তবু তাদের ফাঁকা চোখ যেন থেকে যায়।
সূত্র: এবিসি নিউজ; ইসলা দে লাস মুনেকাস-সংক্রান্ত স্থানীয় ও প্রচলিত তথ্য।