ভিড় এড়িয়ে কলকাতা থেকে মূর্তি-ঝালং-বিন্দু ঘুরে আসুন

পূজার ছুটিতে দূরের কোনও জায়গায় যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে ঘুরে আসুন পাশের দেশ ভারতের ডুয়ার্সে। বাস, ট্রেন অথবা বিমানের কলকাতায় গিয়ে সেখান থেকে সড়ক পথে বেরিয়ে পড়লে এক সফরেই দেখা মিলবে ইতিহাস, নদী, জঙ্গল, পাহাড় আর সীমান্তঘেঁষা জনপদের স্বাদ। হাতে প্রায় এক সপ্তাহ থাকলে ধীরে-সুস্থে এই সফর সাজানো যায়।

কলকাতা থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথম বিরতি দিতে পারেন বহরমপুরে। শহরের ঐতিহাসিক স্থাপত্য ঘুরে পরের দিন এগিয়ে যাওয়া যায় উত্তরবঙ্গের দিকে। এরপর শিলিগুড়ি পেরিয়ে মূর্তি, লাটাগুড়ি, গরুমারা, চাপড়ামারি, ঝালং ও বিন্দু প্রকৃতির একের পর এক রূপ ধরা দেবে এই পথে।

মুর্শিদাবাদ (ছবি: সংগৃহীত)

সঙ্গে রাখুন মুর্শিদাবাদের ইতিহাস

কলকাতা থেকে ডুয়ার্সের পথে একটানা গাড়িতে শিলিগুড়ি পৌঁছনোর চেষ্টা না করাই ভালো। প্রায় ৬০০ কিলোমিটারের দীর্ঘ পথ এক দিনে পাড়ি দিলে ভ্রমণের আনন্দের চেয়ে ক্লান্তিই বেশি হতে পারে। তাই প্রথম দিন বহরমপুরে থামতে পারেন।

কলকাতা থেকে বহরমপুরের দূরত্ব প্রায় ২১০ কিলোমিটার। সময় লাগতে পারে চার ঘণ্টারও বেশি। বহরমপুর থেকে অল্প দূরেই লালবাগ। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এই জায়গা বিশেষ আকর্ষণীয়। মুর্শিদাবাদের একাধিক ঐতিহাসিক স্থাপত্য ঘুরে দেখতে পারেন।

এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হাজারদুয়ারি। ১৮৩৭ সালে নবাব নাজিম হুমায়ুন জাহের বাসের জন্য ব্রিটিশদের তৈরি এই প্রাসাদ ইতালীয় স্থাপত্যরীতির অনুকরণে নির্মিত। তিনতলা এই প্রাসাদে রয়েছে ১২০টি কক্ষ ও আটটি গ্যালারি। নামের সঙ্গে ‘হাজার’ থাকলেও আসল দরজার সংখ্যা ৯০০টি। বাকি ১০০ দরজা কৃত্রিম।

সময় হাতে থাকলে একই দিনে মদিনা মসজিদ, বড় ইমামবাড়া, কাটরা মসজিদ, নসীপুর রাজবাড়ি, জাহানকোষা কামান ও মোতিঝিল ঘুরে নিতে পারেন। কাঠগোলা প্রাসাদও রাখা যায় তালিকায়।

তারপর গন্তব্য উত্তরবঙ্গ

বহরমপুর থেকে শিলিগুড়ির রাস্তা প্রায় ৩৮০ কিলোমিটার। এই পথ পাড়ি দিতে ৯-১০ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। তাই মুর্শিদাবাদ ঘুরে এক রাত বিশ্রাম নিয়ে পরের দিন উত্তরবঙ্গের দিকে রওনা হওয়াই আরামদায়ক।

রাতের দিকে যাত্রা শুরু করলে ভোরের মধ্যে ফুলবাড়ি পৌঁছনো সম্ভব। সেখান থেকে বিন্নাগুড়ি, লাটাগুড়ি ও বাতাবাড়ি পেরিয়ে পৌঁছে যাবেন মূর্তিতে।

মূর্তি নদী (ছবি: সংগৃহীত)

মূর্তির নদীপাড়ে প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটান

ডুয়ার্সের অন্যতম পরিচিত গন্তব্য মূর্তি। পাহাড়ি নদী, ঘন সবুজ আর জঙ্গলের আবহ মিলিয়ে জায়গাটি কয়েক দিনের নিরিবিলি ছুটির জন্য আদর্শ। মূর্তি নদীর পাশে রয়েছে একাধিক সরকারি ও বেসরকারি থাকার ব্যবস্থা।

নদীর ধারে বসে সময় কাটানো থেকে শুরু করে জঙ্গলের পথে ঘোরাঘুরি দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই পাওয়া যায় এখানে। মূর্তিকে ঘাঁটি করে এক দিকে ঝালং-বিন্দু, অন্য দিকে লাটাগুড়ি ও গরুমারার দিকে যাওয়া যায়।

ডুয়ার্সের সাফারি পার্কে বন্যপ্রাণী (ছবি: সংগৃহীত)

জঙ্গলে সাফারি, চোখ রাখুন বন্যপ্রাণীর দিকে

ডুয়ার্সে গিয়ে জঙ্গলসাফারি না করলে সফর যেন কিছুটা অসম্পূর্ণই থেকে যায়। মূর্তি থেকে গরুমারা ও চাপড়ামারির অরণ্যে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

গরুমারার যাত্রাপ্রসাদ, চাপড়ামারি এবং রামসাই-মেদলা নজরমিনার থেকে অরণ্যের বিভিন্ন দৃশ্য দেখার সুযোগ মেলে। থাকার জায়গা ও সাফারির ধরন অনুযায়ী আগে থেকেই বুকিং ও প্রয়োজনীয় অনুমতির বিষয়টি জেনে নেওয়া ভালো।

ঝালং-বিন্দুতে নদী

ঝালং-বিন্দুতে নদী আর পাহাড়ের দেখা

ডুয়ার্স সফরে আরও একটি দিন রাখা যেতে পারে ঝালং ও বিন্দুর জন্য। খুনিয়া মোড় থেকে ঝালংয়ের পথে এগোতে গেলে রাস্তার দু’পাশে চাপড়ামারি অরণ্যের সবুজ দেখা যায়।

ঝালংয়ের প্রধান আকর্ষণ জলঢাকা নদী। বড় বড় পাথরের ফাঁক দিয়ে বয়ে চলা নদী, চারপাশের পাহাড়ি সবুজ আর পাখির ডাক মিলে তৈরি হয় অন্য রকম পরিবেশ।

ঝালং থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে বিন্দু। ভারত-ভুটান সীমান্তের এই জনপদটি দেশের শেষ প্রান্তের গ্রামগুলির অন্যতম। জলঢাকা নদীর উপর তৈরি বাঁধও এখানকার অন্যতম দর্শনীয় স্থান। অনুমতি থাকলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আশপাশও ঘুরে দেখা যায়।

কমলালেবুর মৌসুমে এই পথের সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। পাহাড়, নদী আর অরণ্যের মাঝে ধীর গতিতে সময় কাটাতে চাইলে ঝালংয়ের কাছে রাত কাটানোর পরিকল্পনাও করতে পারেন।

মালদহে ইতিহাসের ছোঁয়া (ছবি: সংগৃহীত)

ফেরার পথে মালদহে ইতিহাসের ছোঁয়া

ডুয়ার্সের জঙ্গল ও পাহাড় ঘোরার পর সরাসরি কলকাতায় না ফিরে ফেরার পথে মালদহে এক রাত কাটানো যায়। গৌড়ের প্রাচীন রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ ঘুরে দেখার সুযোগ থাকবে।

পিয়াসবাড়ির বিশাল দিঘি, রামকেলি, বারোদুয়ারি বা বড়সোনা মসজিদ, দাখিল দরওয়াজা, ফিরোজ মিনার, কদম রসুল মসজিদ ও চিকা মসজিদ ইতিহাসের নানা অধ্যায় ছড়িয়ে রয়েছে এই এলাকায়। এক দিনে সবকিছু ঘুরে দেখা কঠিন হতে পারে, তাই সময় অনুযায়ী কয়েকটি জায়গা বেছে নেওয়াই ভালো।

এর পর মালদহ থেকে জাতীয় সড়ক ধরে কলকাতার পথে ফিরতে পারেন।

সফর কত দিনের?

আরাম করে ঘুরতে চাইলে সাত দিনের মতো সময় হাতে রাখা ভালো। প্রথম দিন বহরমপুর ও মুর্শিদাবাদ, পরের দিন উত্তরবঙ্গের পথে যাত্রা এবং তার পরের দুই-তিন দিন মূর্তি, ঝালং-বিন্দু ও জঙ্গলসাফারির জন্য রাখা যেতে পারে। ফেরার পথে মালদহে এক রাত কাটিয়ে কলকাতায় ফেরা যায়।

কী ভাবে যাবেন?

কলকাতা থেকে মূর্তির দূরত্ব প্রায় ৬৫১ কিলোমিটার। পথে ১২, ২৭ ও ৭১৭ নম্বর জাতীয় সড়কের বিভিন্ন অংশ পড়বে। একটানা গাড়ি চালালে প্রায় ১৫ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। তবে পূজার ছুটিতে তাড়াহুড়ো না করে পথে পর্যাপ্ত বিরতি নিয়ে সফর করাই নিরাপদ ও আরামদায়ক।