মৈনপাটের পথে, পাহাড়-ঝরনা আর বৌদ্ধমঠে ভরা অনন্য ঠিকানা

কোথাও বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা ও হাতে পাঁচ-ছয় দিন সময় থাকলে বেরিয়ে পড়া যায় অচেনা কোনও গন্তব্যের উদ্দেশে। পাহাড়, ঝরনা, সবুজ অরণ্য আর বৌদ্ধ সংস্কৃতির স্বাদ একসঙ্গে পেতে চাইলে পাশের দেশ ভারতের ছত্তীসগঢ়ের মৈনপাট হতে পারে দারুণ পছন্দ। অনেকেই জায়গাটিকে ‘মিনি তিব্বত’ বলে চেনেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শান্ত পরিবেশের কারণে এই পাহাড়ি জনপদকে আবার ‘ছত্তীসগঢ়ের শিমলা’ও বলা হয়।

ছত্তীসগঢ়ের সরগুজা জেলায় অবস্থিত মৈনপাটের বিশেষত্ব পাহাড়ি দৃশ্য আর এখানকার তিব্বতি সংস্কৃতি, বৌদ্ধমঠ, ঝরনা ও অদ্ভুত কিছু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকার মতো এখানেও পাহাড়ের গায়ে রঙিন প্রার্থনার পতাকা চোখে পড়ে।

ছত্তিসগড়ের শিমলা (ছবি: সংগৃহীত)

পথে পড়বে রাঁচী, ঘুরে নিতে পারেন চান্ডিল জলাধারও

কলকাতা থেকে মৈনপাটের উদ্দেশে গাড়ি নিয়ে রওনা দিলে প্রথমে যেতে পারেন রাঁচীর দিকে। পথে পড়বে কোয়ালাঘাট, ডেবরা, খড়গপুর, বহরাগোড়া ও ঘাটশিলার মতো পরিচিত জায়গা। কলকাতা থেকে রাঁচীর দূরত্ব প্রায় ৪০০ কিলোমিটার। যাত্রাপথে একটু ঘুরে দেখতে চাইলে জামশেদপুরের কাছাকাছি চান্ডিল জলাধারে থামতে পারেন। পাহাড়ে ঘেরা বিশাল জলরাশি ও আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ সেখানে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ করে দেবে। জলাধারে নৌকাবিহারের ব্যবস্থাও থাকলে উপভোগ করতে পারেন সেই অভিজ্ঞতা।

চান্ডিল ঘুরে রাঁচী পৌঁছোতে বিকেল গড়িয়ে যেতে পারে। তাই সেদিন আর বেশি ঘোরাঘুরি না করে বিশ্রাম নেওয়াই ভালো। পরদিন রাঁচী ও তার আশপাশের জলপ্রপাতগুলি ঘুরে দেখতে পারেন। হুন্ড্রু, জোনহা ও সীতা জলপ্রপাতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে। তবে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা এবং কিছুটা হাঁটার প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। চাইলে দশম জলপ্রপাত কিংবা পত্রাতু উপত্যকাও ঘুরে দেখতে পারেন।

বৌদ্ধমঠ ও টাইগার পয়েন্ট জলপ্রপাত (ছবি: সংগৃহীত)

পাহাড়ি পথে মৈনপাটের দিকে

রাঁচী থেকে মৈনপাটের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলে পথের দৃশ্য ধীরে ধীরে বদলাতে থাকবে। জাতীয় সড়ক ধরে এগিয়ে নির্দিষ্ট সংযোগপথ দিয়ে মৈনপাটের দিকে যেতে হয়। রাঁচী থেকে গন্তব্যটির দূরত্ব আনুমানিক ৩০০ কিলোমিটারের কিছু বেশি হতে পারে। তবে যাত্রার আগে মানচিত্রে নির্দিষ্ট পথ ও রাস্তার বর্তমান অবস্থা দেখে নেওয়া ভালো। পাহাড়ি রাস্তায় পৌঁছোনোর পর সবুজে ঢাকা ঢাল, অরণ্য আর খোলা আকাশের দৃশ্য পথের ক্লান্তি অনেকটাই ভুলিয়ে দিতে পারে।

মৈনপাটে পৌঁছোতে বিকেল বা সন্ধ্যা হয়ে গেলে সেদিন আর দর্শনীয় স্থান ঘোরার পরিকল্পনা না করাই ভালো। পরদিন সকাল থেকে শুরু করা যেতে পারে বেড়ানো। এখানকার বেশ কিছু আকর্ষণ কাছাকাছি এলাকায় থাকলেও কোনও কোনও জায়গায় পৌঁছোতে হাঁটতে হতে পারে।

দশম জলপ্রপাত (ছবি: সংগৃহীত)

উল্টোপথে বয়ে চলে জলধারা!

মৈনপাটের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক জায়গাগুলির মধ্যে রয়েছে উল্টাপানি। ভিসারপানি গ্রামের কাছে এই জলধারাকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এখানে জলপ্রবাহের দিক দেখে মনে হয় জল যেন উঁচুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জায়গাটি ঘুরে দেখার সময় স্থানীয়দের কাছ থেকে এর প্রকৃতি ও ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে জেনে নিতে পারেন।

এরপর যেতে পারেন পরপটিয়া সূর্যাস্ত দেখার জায়গায়। পাহাড়ি পরিবেশে দিনের শেষ আলো উপভোগ করার জন্য এটি পরিচিত। আশপাশের ঝরনা ও পাহাড়ি পথও পর্যটকদের নজর কাড়ে। তবে সন্ধ্যার আগে ফেরার পথ ধরতে হবে, বিশেষত অপরিচিত পাহাড়ি এলাকায় নিজে গাড়ি চালালে।

মৈনপাটের আরেকটি আকর্ষণ জলজলি পয়েন্ট, যা ‘বাউন্সিং গ্রাউন্ড’ নামেও পরিচিত। এখানকার ভূমিরূপের বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে পর্যটকদের কৌতূহল রয়েছে। জায়গাটি ঘুরে দেখার সময় নির্দিষ্ট পথ মেনে চলা এবং স্থানীয় নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। চাইলে মাছলি পয়েন্ট বা ফিশ পয়েন্টেও যেতে পারেন।

বৌদ্ধমঠ, তিব্বতি খাবার ও ঝরনার হাতছানি

মৈনপাটের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তিব্বতি সংস্কৃতি। স্থানীয় বাজারে খাবার ও দৈনন্দিন জীবনের নানা অনুষঙ্গে সেই সংস্কৃতির ছাপ পাওয়া যায়। ঘুরে দেখতে পারেন ধাকপো শেপদুলিং বৌদ্ধমঠ। শান্ত পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানোর পাশাপাশি এখানকার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবহ অনুভব করা যাবে।

প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য রয়েছে টাইগার পয়েন্ট জলপ্রপাত। সবুজ পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা জলধারা এই জায়গার অন্যতম আকর্ষণ। নামটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঘের উপস্থিতি নিয়ে স্থানীয় লোককথা। তবে বন্যপ্রাণী দেখার নিশ্চয়তা নেই। আশপাশের পরিবেশ উপভোগ করার পাশাপাশি মৈনপাট থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত যোগীমারা গুহাও ঘুরে দেখতে পারেন।

কোথায় থাকবেন, কী ভাবে ফিরবেন?

মৈনপাটে পর্যটকদের থাকার জন্য বিভিন্ন রিসর্ট ও আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। পূজার ছুটিতে ভিড়ের সম্ভাবনা থাকায় আগেভাগে ঘর বুক করে নেওয়া সুবিধাজনক। থাকার জায়গা বেছে নেওয়ার সময় খাবারের ব্যবস্থা, গাড়ি রাখার জায়গা এবং দর্শনীয় স্থানগুলিতে যাতায়াতের সুবিধা যাচাই করে নিন।

মৈনপাটে এক দিন ও পরদিন সকালের সময় ঘোরাঘুরির জন্য রাখতে পারেন। দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে কলকাতার পথে রওনা দেওয়া যায়। ফেরার পথে চাইলে রাঁচী অথবা জামশেদপুরে রাত কাটিয়ে পরদিন বাকি পথ পাড়ি দিতে পারেন।

নিজের গাড়িতে এই সফরের পরিকল্পনা করলে জ্বালানি, টোল, চালকের বিশ্রাম এবং পাহাড়ি পথে গাড়ি চালানোর বিষয়গুলি মাথায় রাখা জরুরি। কলকাতা থেকে রাঁচী হয়ে মৈনপাটের এই যাত্রায় যেমন থাকবে দীর্ঘ সড়কপথের অভিজ্ঞতা, তেমনই মিলবে পাহাড়, জলপ্রপাত, অরণ্য ও ভিন্ন সংস্কৃতির স্বাদ।