ইমরান খানের আলোচিত ওসিআই কার্ড কী? ভারতে যাতায়াত-বসবাসে কী সুবিধা মেলে?

বিদেশে বসবাস করলেও যাদের ভারতে পরিবার, কাজ কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগ রয়েছে, তাদের অনেকেরই নিয়মিত ভারতে যাতায়াতের প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে সুবিধা দিতে পারে ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া (ওসিআই) কার্ড। এই কার্ডের মাধ্যমে যোগ্য বিদেশি নাগরিকেরা প্রতিবার নতুন করে ভিসার আবেদন না করেই ভারতে যাতায়াত করতে পারেন।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক অভিনেতা ইমরান খানের কাছেও রয়েছে ওসিআই কার্ড। এই কার্ডে কী কী সুবিধা পাওয়া যায়? কারা এর জন্য আবেদন করতে পারেন? আর কোন কোন ক্ষেত্রে রয়েছে বিধিনিষেধ?

ওসিআই কার্ড কী?

ওসিআই কার্ড হলো ভারত সরকারের দেওয়া একটি নথি, যা নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণকারী বিদেশি নাগরিকদের দেওয়া হয়। ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি এবং নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের সূত্রে যোগ্য বিদেশি নাগরিকেরা এই কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারেন।

মূলত এটি দীর্ঘমেয়াদি যাতায়াত ও বসবাসের সুবিধা দেয়। যোগ্য ব্যক্তিরা এই কার্ডের মাধ্যমে ভারতে আজীবন একাধিকবার প্রবেশের ভিসা-সুবিধা পান। ফলে প্রতিবার ভারতে যাওয়ার আগে নতুন করে ভিসার আবেদন করতে হয় না।

এ ছাড়া, প্রযোজ্য নিয়ম ও শর্ত মেনে ওসিআই কার্ডধারীরা ভারতে বসবাস ও কাজ করতে পারেন। তবে এই কার্ড ভারতীয় নাগরিকত্বের সমতুল্য নয়। এর সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

ওসিআই কার্ডের নাম শুনে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। এই কার্ড থাকলেই কেউ ভারতীয় নাগরিক হয়ে যান না। কার্ডধারীরা নিজেদের বিদেশি নাগরিকত্ব বজায় রাখতে পারেন। তবে তাদের বৈধ বিদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করেই ভ্রমণ করতে হয়।

ওসিআই কার্ডধারীদের ভারতে যাতায়াতের জন্য সাধারণত আলাদা করে ভিসার আবেদন করতে হয় না। তবে ভ্রমণের সময় সঙ্গে বৈধ বিদেশি পাসপোর্ট ও ওসিআই কার্ড দুটিই রাখতে হয়। কারণ, ওসিআই কার্ড পাসপোর্টের বিকল্প নয়।

কিছু ক্ষেত্রে ভারতে প্রবেশ বা নির্দিষ্ট কাজের জন্য অতিরিক্ত অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে। যেমন, গবেষণার কাজ করা কিংবা সুরক্ষিত ও সীমাবদ্ধ এলাকায় যাওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতি নিতে হতে পারে।

কারা ওসিআই কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারেন?

ভারতীয় বংশোদ্ভূত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওসিআই কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা তৈরি হয় না। আবেদনকারীকে ভারত সরকারের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হয়। সাধারণত, নিম্নলিখিত বিদেশি নাগরিকেরা এই কার্ডের জন্য যোগ্য হতে পারেন—

১। যারা আগে ভারতীয় নাগরিক ছিলেন, পরে বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন এবং সরকারি প্রকল্পের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেন।

২। যাদের বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা প্রপিতামহ-প্রপিতামহী বা প্রমাতামহ-প্রমাতামহী যোগ্য ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি ছিলেন।

৩। ভারতীয় নাগরিক বা যোগ্য আবেদনকারীর নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী নাবালক সন্তান।

৪। ভারতীয় নাগরিক বা ওসিআই কার্ডধারীর বিদেশি নাগরিকত্বসম্পন্ন স্বামী বা স্ত্রী। তবে বিয়েটি নিবন্ধিত হতে হবে এবং আবেদনের ঠিক আগের অন্তত দুই বছর ধরে বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় থাকতে হবে।

তবে ওসিআই কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধও রয়েছে। যারা নিজে অথবা যাদের বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা প্রপিতামহ-প্রপিতামহী বা প্রমাতামহ-প্রমাতামহী পাকিস্তান বা বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন, তারা সাধারণত এই কার্ড পাওয়ার যোগ্য নন। এ ছাড়াও, অন্যান্য নির্দিষ্ট কারণে আবেদনকারী অযোগ্য হতে পারেন।

আজীবন ভারতে যাতায়াতের সুবিধা

ওসিআই কার্ডের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, প্রতিবার নতুন করে ভিসার আবেদন না করেই বারবার ভারতে যাতায়াত করা যায়। তবে এই কার্ডে আরও কিছু সুযোগ-সুবিধাও রয়েছে।

প্রযোজ্য বিধিনিষেধ মেনে ওসিআই কার্ডধারীরা ভারতে বসবাস ও কাজ করতে পারেন। শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তারা নির্দিষ্ট কিছু সুবিধা পান। এ ছাড়া, দেশের অভ্যন্তরীণ বিমানভাড়া এবং জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘরে প্রবেশমূল্যের ক্ষেত্রে ভারতীয় নাগরিকদের সমতুল্য সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে ওসিআই কার্ডধারীরা ভারতে ভোট দিতে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে কিংবা সাংবিধানিক পদে আসীন হতে পারেন না। একইভাবে, আইনে নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম থাকলেও সাধারণভাবে তাদের কৃষিজমি, খামারবাড়ি ও প্ল্যান্টেশন সম্পত্তি কেনার অনুমতি নেই।

কোন কারণে বাতিল হতে পারে ওসিআই কার্ড?

নাগরিকত্বের সঙ্গে ওসিআই কার্ডের আরেকটি বড় পার্থক্য হলো, নির্দিষ্ট আইনি কারণে এই কার্ড বাতিল করা যেতে পারে। কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে জালিয়াতি বা আইনের নির্দিষ্ট বিধান লঙ্ঘনের মতো কারণে ভারত সরকার কার্ড বাতিল করতে পারে। তাই ওসিআই কার্ডকে স্থায়ী নাগরিকত্বের সমতুল্য বলে বিবেচনা করা যায় না।

কীভাবে আবেদন করবেন?

ভারত সরকারের ওসিআই পরিষেবার সরকারি পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে এই কার্ডের জন্য আবেদন করা যায়। আবেদনকারীদের বৈধ বিদেশি পাসপোর্ট, যোগ্যতার প্রমাণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক নথি জমা দিতে হয়। আবেদনকারীর নিজস্ব ভারতীয় বংশসূত্র, পারিবারিক পরিচয় নাকি বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে আবেদন করা হচ্ছে, তার ওপর প্রয়োজনীয় নথিপত্রের ধরন নির্ভর করে।

যোগ্য বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ বজায় রাখা এবং নিয়মিত যাতায়াতের ক্ষেত্রে ওসিআই কার্ড গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, এই কার্ড দীর্ঘমেয়াদি যাতায়াত ও বসবাসের কিছু সুবিধা দিলেও এটি ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রদান করে না।