পাথরের ভান্ডারে ইতিহাসের খোঁজ, পঞ্চগড়ের রকস মিউজিয়াম

পাথরেরও যে রয়েছে নানা রং, আকৃতি আর ইতিহাস, তা জানতে ঘুরে আসতে পারেন পঞ্চগড়ের রকস মিউজিয়াম থেকে। বাংলাদেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘর হিসাবে পরিচিত এই সংগ্রহশালায় রয়েছে নানা ধরনের পাথর, প্রাচীন ইমারতের ইট, পোড়ামাটির মূর্তি এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী। উত্তরবঙ্গের সীমান্তঘেঁষা জেলা পঞ্চগড়ে বেড়াতে গেলে এই ব্যতিক্রমী জাদুঘর হতে পারে আপনার ভ্রমণতালিকার অন্যতম আকর্ষণ।

পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসে অবস্থিত এই জাদুঘরটি ১৯৯৭ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলেন কলেজের অধ্যক্ষ নাজমুল হক। প্রকৃতি, ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রতি আগ্রহ থেকেই তাঁর এই উদ্যোগ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা পাথর ও অন্যান্য ঐতিহাসিক উপকরণ নিয়ে গড়ে উঠেছে এই বিশেষ সংগ্রহশালা।

রকস মিউজিয়ামে থাকা নানা রকম পাথর (ছবি: সংগৃহীত)

পাথরের সংগ্রহে প্রকৃতি ও ইতিহাসের ছাপ

রকস মিউজিয়ামের অন্যতম আকর্ষণ বিভিন্ন রং, আকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের পাথরের সংগ্রহ। এখানে সংরক্ষিত পাথরগুলির বৈচিত্র্য দর্শনার্থীদের প্রকৃতির গঠন ও ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেয়। হাজার বছরের পুরনো বলে বর্ণিত পাথরের পাশাপাশি রয়েছে প্রাচীন স্থাপনার ইট এবং পোড়ামাটির তৈরি বিভিন্ন মূর্তি। এসব নিদর্শন অতীতের নির্মাণশৈলী ও ঐতিহ্য সম্পর্কে কৌতূহল জাগায়।

শুধু পাথর নয়, জাদুঘরের জাতিতাত্ত্বিক সংগ্রহেও রয়েছে নানা উপকরণ। বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত জিনিসপত্রের মাধ্যমে তাঁদের জীবনযাপন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ফলে এই জাদুঘর কেবল পাথরের সংগ্রহশালা নয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতি জানারও একটি ব্যতিক্রমী জায়গা।

খোলা আকাশের নিচেও রয়েছে চমক

জাদুঘরের উন্মুক্ত অংশে রাখা রয়েছে বেশ কিছু বড় আকারের পাথর। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে শালগাছের কাঠ দিয়ে তৈরি দুটি পুরনো নৌকা। প্রতিটি নৌকার দৈর্ঘ্য প্রায় ২২ ফুট বলে জানা যায়। নৌকাগুলি প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো বলে বর্ণিত হলেও, সেগুলির বয়স ও ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে জাদুঘর কর্তৃপক্ষের তথ্য নেওয়া যেতে পারে।

পাথরের নৌকা (ছবি: সংগৃহীত)

বড় পাথর, পুরনো নৌকা ও ঐতিহাসিক উপকরণের এই সমাহার জাদুঘরটিকে অন্য সাধারণ দর্শনীয় স্থান থেকে আলাদা করেছে। ইতিহাস, ভূগোল, প্রত্নতত্ত্ব কিংবা লোকজ সংস্কৃতি নিয়ে আগ্রহী মানুষের পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও পরিবারের ছোটদের জন্যও এটি হতে পারে শিক্ষামূলক ভ্রমণের জায়গা।

কীভাবে যাবেন?

ঢাকা থেকে পঞ্চগড় যেতে বাস কিংবা ট্রেন বেছে নিতে পারেন। ঢাকার গাবতলী, শ্যামলী ও মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পঞ্চগড়গামী বাস চলাচল করে। নন-এসি বাসের ভাড়া প্রায় ৮০০ থেকে ১,১০০ টাকা এবং এসি বাসের ভাড়া ১,৩৫০ থেকে ১,৯০০ টাকার মধ্যে হতে পারে।

ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পঞ্চগড়গামী পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস বা দ্রুতযান এক্সপ্রেসের টিকিট নিতে পারেন। ট্রেনের শ্রেণি অনুযায়ী ভাড়া আলাদা।

পঞ্চগড় শহরে পৌঁছে বাস টার্মিনাল বা রেলস্টেশন থেকে স্থানীয় যানবাহনে পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসে যেতে পারবেন। পুরোনো ভ্রমণতথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় যাতায়াতে জনপ্রতি প্রায় ২০ থেকে ২৫ টাকা লাগতে পারে। জাদুঘরের প্রবেশমূল্য আগে ১০ টাকা।

কোথায় থাকবেন, কী খাবেন?

পঞ্চগড় শহরে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। সাধারণ হোটেলে প্রতি রাতের ভাড়া প্রায় ৫০০ থেকে ১,৫০০ টাকা। ছুটির দিন বা পর্যটনের মৌসুমে ভাড়া ও কক্ষের প্রাপ্যতা বদলাতে পারে। তাই আগে থেকে বুকিং করে নেওয়া সুবিধাজনক।

রকস মিউজিয়াম (ছবি: সংগৃহীত)

খাওয়াদাওয়ার জন্য শহরের স্থানীয় হোটেল ও রেস্তরাঁ বেছে নিতে পারেন। পঞ্চগড়ের স্থানীয় খাবারের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের পরিচিত খাবার ও মিষ্টির স্বাদও নিতে পারেন।

এক ভ্রমণে আরও যা দেখতে পারেন

রকস মিউজিয়াম ঘুরে সময় হাতে থাকলে পঞ্চগড়ের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানও দেখে নিতে পারেন। মহারাজার দিঘি, মির্জাপুর শাহী মসজিদ, ভিতরগড় দুর্গনগরী, গোলকধাম মন্দির, বার আউলিয়া মাজার শরিফ এবং তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্থান। বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টও ঘুরে দেখার পরিকল্পনা করতে পারেন, তবে সীমান্ত এলাকায় প্রবেশের নিয়ম ও নিরাপত্তাবিধি মেনে চলতে হবে।

পাথরের বৈচিত্র্য, প্রাচীন নিদর্শন, ঐতিহ্যবাহী নৌকা ও জাতিতাত্ত্বিক সংগ্রহ দেখার জন্য পঞ্চগড়ের রকস মিউজিয়াম হতে পারে ভিন্ন স্বাদের একটি ভ্রমণগন্তব্য। প্রকৃতি ও ইতিহাসকে কাছ থেকে জানতে চাইলে পঞ্চগড় ভ্রমণের তালিকায় এই জাদুঘরটি রাখতে পারেন।